ঢাকা ০৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কালীগঞ্জ পৌর এলাকার ১০ কিলোমিটার মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, বেপরোয়া বাস ও অবৈধ পার্কিংয়ে আতঙ্ক Logo আবুল কালাম এম.পির আন্তরিক প্রচেষ্টায় লাকসামে উন্নয়নের বিপ্লব: ৭ মাসে সাড়ে ৩৩ কোটি টাকায় ৪৯ প্রকল্প বাস্তবায়ন Logo বদলগাছীতে সহোদর দুই বোনকে বিয়ে করলেন টিকটকার মাসুদ Logo চাঁদপুরের প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে তোলা হবে একটি করে পাঠাগার-জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান Logo গ্রাম্য আদালতকে উপেক্ষা করে ঘর নির্মাণের অভিযোগ Logo কলমাকান্দায় কাঠের সেতু সংস্কার, উদ্বোধন করল শিক্ষার্থীরা Logo রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তন না হলে তারেক রহমানও শেখ হাসিনার পথে হাঁটবেন-আহবায়ক নাহিদ ইসলাম Logo গণ-অধিকার পরিষদের ৫ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য রেলি ও আলোচনা সভা Logo লালমোহনে স্পিকারের অনুদানের চেক পেলেন ১৯০টি অসহায় ও দুস্থ পরিবার Logo মাতামুহুরীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব: ভারী ট্রাকে পিষ্ট হয়ে ভেঙে চৌচির ১৫ কিমি সড়ক হুমকিতে বেতুয়াবাজার ব্রিজ ও নদীর গাইড ওয়াল, প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

পরিবার বিচ্ছিন্ন ৯ তরুণের এসএসসি জয়

পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা নয় তরুণ এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কারও বয়স তখন মাত্র ছয়। কেউ হারিয়েছেন বাবাকে, কেউ মাকে। আবার কারও জীবনে বাবা-মা দুজনেরই কোনো স্মৃতি নেই। কেউ হারিয়ে গেছেন পরিবারের কাছ থেকে। কেউ দারিদ্র্যের কারণে ঠাঁই নিয়েছেন অনাথ আশ্রমে। আপনজনের স্নেহ-ভালোবাসা, পাড়া-প্রতিবেশীর পরিচিত মুখ কোনোটিই তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠেনি।
তবে জীবন তাদের থামিয়ে দিতে পারেনি। অনিশ্চিত শৈশব পেরিয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা নয় বালক। তাদের কারও চোখে পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন। কারও স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভালো মানুষ হওয়ার। এসএসসি পাসের আনন্দের মধ্যেও তাই কোথাও যেন মিশে আছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
উত্তীর্ণ নয়জন হলেন, সাকিব হাওলাদার, সুমন মিয়া, আল-আমিন, সাকিব, নিরব ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, মেহেদি হাসান, আনিছুর ইসলাম ও আলিউল ইসলাম। তারা সবাই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। অনাথ, ছিন্নমূল, বঞ্চিত ও হারিয়ে যাওয়া পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৬০ জন শিশু রয়েছে।
শিশু নগরীতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি বড় ভবনের মাঝখানে বিশাল খেলার মাঠ। মাঠজুড়ে শিশুদের ছোটাছুটি। কারও হাতে বই, কেউ খেলছে। এরই মধ্যে সদ্য এসএসসি পাস করা নয় বালকের মুখে ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস।
সুমন মিয়া ছয় বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যান। এরপর একটি সেন্টারে থাকার পর ২০১৫ সালে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আসেন। দীর্ঘ ১০ বছর এখানে কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর।
সুমন বলেন, ছয় বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে যাই। কোথা থেকে হারিয়েছি, সেটাও মনে নেই। পরে একটি সেন্টারে ছিলাম। সেখান থেকে মালেক স্যারের মাধ্যমে ২০১৫ সালে এখানে আসি। এখানে ১০ বছর পড়াশোনা করার পর এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। খুব ভালো লাগছে।
কথা বলার একপর্যায়ে পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতে সুমনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। বলেন, হয়ত পরিবার তার সঙ্গে থাকলে তারাও অনেক খুশি হতো। তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে তাও জানেন না সুমন। তার পরিবারের কোনো ঠিকানাও নেই।
নিরব হাসানও প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে আছে। এখান থেকে পড়াশোনা করে পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছেন।
নিরব বলেন, ‘‘আমি ১০ বছর ধরে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আছি। এখান থেকে পড়াশোনা করে এসএসসি পাস করেছি। আমি খুব খুশি।’’
ভবিষ্যতে কী হতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে তার সহজ উত্তর, বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হতে চান।
আনিছুর ইসলামের ছোটবেলাতেই বাবা মারা যায়। সংসারের অভাবের কারণে তার মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে আহছানিয়া মিশনের কথা জানতে পেরে তাকে এখানে ভর্তি করান।
আনিছুর বলেন, ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান। মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে এই মিশনের কথা জানতে পেরে তাকে এখানে পাঠান, যেন ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেন এবং মানুষের মতো মানুষ হতে পারেন। প্রায় ১১ বছর ধরে এখানে আছেন। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ৪.০০ পয়েন্ট পেয়েছেন আনিছুর।
মেহেদি হাসানের বাবাও মারা যান ছোটবেলায়। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচ বহন করা তার মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। পরে মেহেদিকে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে নিয়ে আসেন তিনি।
মেহেদি বলেন, ‘‘বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিল। তখন মা সংসার চালাতে পারছিলেন না, আমাকে পড়াশোনাও করাতে পারছিলেন না। পরে এখানে নিয়ে আসেন। স্যাররা পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া ও থাকার সব ব্যবস্থা করেছেন। এখানে থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি। সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে ভালো ফল করেছি।’’
মেহেদি জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি শিশু নগরীতে আছেন।
আল-আমিন ইসলাম সাত বছর বয়সে হারিয়ে যান। এরপর আর খুঁজে পাননি বাবা-মাকে। এসএসসি পাসের আনন্দের দিনেও সেই শূন্যতার কথা মনে পড়ে তার।
আল-আমিন বলেন, ‘‘আজকের ফলাফল শুধু আনন্দের নয়, এর সঙ্গে একটা কষ্টও আছে। যদি আজ আমার বাবা-মা আমার পাশে থাকতেন, তাহলে ভালো লাগত। অন্যদের বাবা-মা সন্তানদের পরীক্ষা দেওয়ার সময় পাশে থাকেন, ফলাফল হলে খুশি হন। আমিও তো তাদের ছেলে। আমি পাস করেছি তারা যদি জানতে পারত, তারাও নিশ্চয়ই খুশি হতো।’’
ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্নও স্পষ্ট। আল-আমিন বলেন, ‘‘বড় হয়ে একজন সুনাগরিক হতে চাই। সৎভাবে চলতে চাই। যে কাজই করি, তাতে কোনো দুই নম্বরি থাকবে না। সবসময় সত্যের পথে চলব।’’
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন, ফেরিঘাট, নদীভাঙনকবলিত এলাকা ও হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিশুদের এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়। যাদের বাবা-মা নেই কিংবা যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, তাদের শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, তারা শিশুদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলছেন। এবারের ফলাফলও ভালো হয়েছে। এভাবে শিশুরা এখানে সুরক্ষিতভাবে বেড়ে উঠছে।
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় বলেন, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতিম ও পথশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। গত পাঁচ বছরে তাদের এখান থেকে ৪৮ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। অনেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবারও ভালো ফল হয়েছে।
শিশুদের ভালো ফলের পেছনে নিয়মিত পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ ও স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। বলেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। এখানে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে। তাদের নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়।
দীপক কুমার রায় জানান, ২০২১ সাল পর্যন্ত দাতা সংস্থার অর্থায়নে শিশু নগরীর কার্যক্রম চললেও বর্তমানে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের লালন-পালন ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই শিশুদের আরও ভালোভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তারা চান, এখান থেকে বের হয়ে তারা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে সমাজে ফিরে যাবে এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কালীগঞ্জ পৌর এলাকার ১০ কিলোমিটার মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, বেপরোয়া বাস ও অবৈধ পার্কিংয়ে আতঙ্ক

পরিবার বিচ্ছিন্ন ৯ তরুণের এসএসসি জয়

আপডেট সময় ১২:৩৪:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা নয় তরুণ এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কারও বয়স তখন মাত্র ছয়। কেউ হারিয়েছেন বাবাকে, কেউ মাকে। আবার কারও জীবনে বাবা-মা দুজনেরই কোনো স্মৃতি নেই। কেউ হারিয়ে গেছেন পরিবারের কাছ থেকে। কেউ দারিদ্র্যের কারণে ঠাঁই নিয়েছেন অনাথ আশ্রমে। আপনজনের স্নেহ-ভালোবাসা, পাড়া-প্রতিবেশীর পরিচিত মুখ কোনোটিই তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠেনি।
তবে জীবন তাদের থামিয়ে দিতে পারেনি। অনিশ্চিত শৈশব পেরিয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা নয় বালক। তাদের কারও চোখে পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন। কারও স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভালো মানুষ হওয়ার। এসএসসি পাসের আনন্দের মধ্যেও তাই কোথাও যেন মিশে আছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
উত্তীর্ণ নয়জন হলেন, সাকিব হাওলাদার, সুমন মিয়া, আল-আমিন, সাকিব, নিরব ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, মেহেদি হাসান, আনিছুর ইসলাম ও আলিউল ইসলাম। তারা সবাই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। অনাথ, ছিন্নমূল, বঞ্চিত ও হারিয়ে যাওয়া পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৬০ জন শিশু রয়েছে।
শিশু নগরীতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি বড় ভবনের মাঝখানে বিশাল খেলার মাঠ। মাঠজুড়ে শিশুদের ছোটাছুটি। কারও হাতে বই, কেউ খেলছে। এরই মধ্যে সদ্য এসএসসি পাস করা নয় বালকের মুখে ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস।
সুমন মিয়া ছয় বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যান। এরপর একটি সেন্টারে থাকার পর ২০১৫ সালে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আসেন। দীর্ঘ ১০ বছর এখানে কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর।
সুমন বলেন, ছয় বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে যাই। কোথা থেকে হারিয়েছি, সেটাও মনে নেই। পরে একটি সেন্টারে ছিলাম। সেখান থেকে মালেক স্যারের মাধ্যমে ২০১৫ সালে এখানে আসি। এখানে ১০ বছর পড়াশোনা করার পর এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। খুব ভালো লাগছে।
কথা বলার একপর্যায়ে পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতে সুমনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। বলেন, হয়ত পরিবার তার সঙ্গে থাকলে তারাও অনেক খুশি হতো। তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে তাও জানেন না সুমন। তার পরিবারের কোনো ঠিকানাও নেই।
নিরব হাসানও প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে আছে। এখান থেকে পড়াশোনা করে পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছেন।
নিরব বলেন, ‘‘আমি ১০ বছর ধরে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আছি। এখান থেকে পড়াশোনা করে এসএসসি পাস করেছি। আমি খুব খুশি।’’
ভবিষ্যতে কী হতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে তার সহজ উত্তর, বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হতে চান।
আনিছুর ইসলামের ছোটবেলাতেই বাবা মারা যায়। সংসারের অভাবের কারণে তার মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে আহছানিয়া মিশনের কথা জানতে পেরে তাকে এখানে ভর্তি করান।
আনিছুর বলেন, ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান। মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে এই মিশনের কথা জানতে পেরে তাকে এখানে পাঠান, যেন ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেন এবং মানুষের মতো মানুষ হতে পারেন। প্রায় ১১ বছর ধরে এখানে আছেন। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ৪.০০ পয়েন্ট পেয়েছেন আনিছুর।
মেহেদি হাসানের বাবাও মারা যান ছোটবেলায়। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচ বহন করা তার মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। পরে মেহেদিকে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে নিয়ে আসেন তিনি।
মেহেদি বলেন, ‘‘বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিল। তখন মা সংসার চালাতে পারছিলেন না, আমাকে পড়াশোনাও করাতে পারছিলেন না। পরে এখানে নিয়ে আসেন। স্যাররা পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া ও থাকার সব ব্যবস্থা করেছেন। এখানে থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি। সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে ভালো ফল করেছি।’’
মেহেদি জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি শিশু নগরীতে আছেন।
আল-আমিন ইসলাম সাত বছর বয়সে হারিয়ে যান। এরপর আর খুঁজে পাননি বাবা-মাকে। এসএসসি পাসের আনন্দের দিনেও সেই শূন্যতার কথা মনে পড়ে তার।
আল-আমিন বলেন, ‘‘আজকের ফলাফল শুধু আনন্দের নয়, এর সঙ্গে একটা কষ্টও আছে। যদি আজ আমার বাবা-মা আমার পাশে থাকতেন, তাহলে ভালো লাগত। অন্যদের বাবা-মা সন্তানদের পরীক্ষা দেওয়ার সময় পাশে থাকেন, ফলাফল হলে খুশি হন। আমিও তো তাদের ছেলে। আমি পাস করেছি তারা যদি জানতে পারত, তারাও নিশ্চয়ই খুশি হতো।’’
ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্নও স্পষ্ট। আল-আমিন বলেন, ‘‘বড় হয়ে একজন সুনাগরিক হতে চাই। সৎভাবে চলতে চাই। যে কাজই করি, তাতে কোনো দুই নম্বরি থাকবে না। সবসময় সত্যের পথে চলব।’’
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন, ফেরিঘাট, নদীভাঙনকবলিত এলাকা ও হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিশুদের এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়। যাদের বাবা-মা নেই কিংবা যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, তাদের শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, তারা শিশুদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলছেন। এবারের ফলাফলও ভালো হয়েছে। এভাবে শিশুরা এখানে সুরক্ষিতভাবে বেড়ে উঠছে।
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় বলেন, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতিম ও পথশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। গত পাঁচ বছরে তাদের এখান থেকে ৪৮ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। অনেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবারও ভালো ফল হয়েছে।
শিশুদের ভালো ফলের পেছনে নিয়মিত পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ ও স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। বলেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। এখানে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে। তাদের নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়।
দীপক কুমার রায় জানান, ২০২১ সাল পর্যন্ত দাতা সংস্থার অর্থায়নে শিশু নগরীর কার্যক্রম চললেও বর্তমানে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের লালন-পালন ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই শিশুদের আরও ভালোভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তারা চান, এখান থেকে বের হয়ে তারা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে সমাজে ফিরে যাবে এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।