বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্ত বরাবরে প্রবাহিত মহানন্দা নদী। এ নদীর তীরে অবস্থিত তেতুঁলিয়া ডাক বাংলো। ডাক বাংলোটি একটি পিকনিক স্পষ্ট। পিকনিক কর্নারটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত, যার দৃষ্টি নন্দন দৃশ্যপট সবাইকে মুগ্ধ করে। তেতুঁলিয়া ডাক বাংলো হতে হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চনজঙ্গার মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য সহজেই উপভোগযোগ্য। বর্ষাকালে মহানন্দা নদী পানিতে ভরপুর থাকে। সে সময় মনোরম দৃশ্য আরো মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠে। শীতকালে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দ উপভোগ করার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসে অনেক পর্যটক।
কুয়াশা আর মেঘে ঢাকা আকাশ না থাকলেই উত্তরাকাশে ভেসে উঠে কাঞ্চনজঙ্গা। এটি হিমালয় পর্বতমালার একটি পর্বত শৃঙ্গ। মাউন্ট এভারেস্টের পরেই ভারতের উঁচু পর্বত শৃঙ্গ। যার উচ্চতা ৩ হাজার ৬শ’ ৩০ মিটার। প্রতি বছর এ পর্বত শৃঙ্গ দর্শনে তেতুঁলিয়ায় পর্যটকের ভিড় জমে উঠে। পর্যটকরা কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃষ্টিনন্দন আভা দেখে উল্লাসে মেতে উঠে। অনুভূতি, অনুভবে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যপট বদলে যায়। ক্ষণে ক্ষণে রূপ লাবণ্যের বদল ঘটে। বিকাশ ঘটে অপরূপ সৌন্দর্যের রূপ মাধুরী। সূর্যের তাপ বাড়ার সাথে সাথে নব বধূর ঘোমটা টেনে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বাহ! কী অপরূপ দৃশ্য। কাঞ্চনজঙ্ঘা রাজকীয় চূড়া ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। হিমালয় পর্বতের এই অংশটিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমালয় বলা হয়, যা তেতুঁলিয়া থেকে একবারে কাছে হলেও সবার দেখার সৌভাগ্য হয় না। তেতুঁলিয়া থেকে পর্বতের দূরত্ব ১৬০ কিলোমিটার। পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থান ও জায়গা থেকে এর চূড়া দেখা যায়। পর্যটক ও দর্শকরা পর্বত শৃঙ্গের মনো মুগ্ধকর, অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করে। যে দৃশ্য দেখে, সবার দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়। প্রতি বছর অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভেসে উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ বাহারি দৃশ্য। পর্যটক ও প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ ছুটে আসে তেতুঁলিয়ায়।
পঞ্চগড় একটি বৈচিত্র্যময়, বিনোদন, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যবাহী, ইতিহাসসমৃদ্ধ ও চিত্তাকর্ষক জায়গা। এ জেলায় মহানন্দা, করতোয়া, ডাহুক, তালমাসহ প্রায় ৩৩ট নদী প্রবাহিত। এসব নদী থেকে প্রতিদিন মানুষজন উন্নত মানের বালি ও নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে। এসব দৃশ্য পর্যটকদের দারুণভাবে কাছে টানে। বিভিন্ন জায়গায় নদী ও মাটির নিচ থেকে তুলা পাথর বিক্রির জন্য জমা করে রাখা হয়। পাথর দেখে মনে হয়, পাথরের পাহাড়। হরেক রকম বর্ণিল পাথর দেখে মনপ্রাণ ভরে উঠে। সবার মন ছুঁয়ে যায়। পঞ্চগড়ে ১৯৯০ সাল থেকে সমতল পতিত ভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ করা হচ্ছে। সাধারণত উঁচু ভূমিতে চা চাষ হয়। কিন্তু সমতল ভূমিতে চা চাষাবাদ বাংলাদেশের এ এলাকাতেই প্রথম শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে উজ্জল সম্ভাবনার হাতছানি। পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে সবুজ চা পাতার মায়াবী ছায়ায় চাওয়াই ও করতোয়া নদী প্রবাহিত। এসব নদীর তীরে রয়েছে সরকারি বন। সরকারি বনে রয়েছে সুন্দর সুন্দর গাছপালা, যা হাইকিং করার জন্য জনপ্রিয় জায়গা। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে সর্ব উত্তরে বাংলাবান্ধা। দেশের মানচিত্রের সর্ব উত্তরের স্থান হলো বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট। জিরো পয়েন্টে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর। মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয়েছে বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর। যা আজও পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন হয়নি। এটিই দেশের একমাত্র স্থলবন্দর, যেটি বাংলাদেশ, ভারত নেপাল ও ভুটান- চারটি দেশকে পণ্য সামগ্রী আদান প্রদানের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে সপ্তাহে ছয় দিন বিকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী জয়েন্ট রিট্রি টসেরিমনি বা যৌথ বিরতিতে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে, যা পর্যটক ও দর্শককে আকৃষ্ট করে। বাংলাবান্ধা দেশের উত্তরের প্রবেশদ্বার। তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যে অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
পঞ্চগড় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। এক সময় কামরূপের প্রাচীন রাজ্যের অংশ ছিল। শুধু তাই নয়, ছিল মোগল সা¤্রাজ্যের অংশ, যা ১৬ শতকে প্রথম নথিভুক্ত করা হয়েছিল। মোগলরা সে সময় এ অঞ্চলে ভিতরগড়, হোসাইনগড়, মিরগড়, বদেশ^রীগড়, হোসেনগড়সহ বেশ কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেছিল। এ ছাড়াও তেতুঁলিয়া ডাক বাংলো, আটোয়ারী কেল্লা, বারো আউলিয়ার মাজার, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, গোলকধাম মন্দির, পঞ্চগড় রক্স মিউজিয়ামসহ অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলাটি পর্যটকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করেছে। এখন নতুনভাবে পিকনিক স্পট, আবাসিক হোটেল, মোটেল নির্মাণসহ পুরাতন স্থাপনা সংস্কার ও দৃষ্টিন্দন করার প্রয়োজন। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, পঞ্চগড় নুরুন আলা নুর কামিল মাদ্রাসা, পঞ্চগড় বাজার, পঞ্চগড়।