বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (জঝঋ) মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ১৮০ দেশের কার কী অবস্থান তোলে ধরে। যথারীতি এবারো আরএসএফ ২০২৬ সালের প্রতিবেদন তুলে ধরেছে। এতে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ১ ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশে গণমাধ্যম পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১৬ ধাপ এগিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম হয়েছিল। এবার বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের আমলে বিশ্ব গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা আগামী বছরের রিপোর্টে আমরা দেখতে পাব। আশা করি, বর্তমান সরকার গণমাধ্যম পরিস্থিতির উন্নয়নে এমন কার্যক্রম গ্রহণ করবে, যাতে আগামী রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থানের আরো উন্নতি হয়।বাংলাদেশ সংবাদ
আমরা জানি, বিগত স্বৈর ও ফ্যাসিবাদী সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে গণমাধ্যম প্রচ- রোষানলের শিকার হয়েছিল। ওই সময় স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হারিয়ে গিয়েছিল। ভয়ের সংস্কৃতির কারণে সেলফ সেন্সরশিপে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগে ২০২৪ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬৫তম স্থানে চলে গিয়েছিল, যা ২০০৮ সালে ছিল ১৩৬তম।
স্বাধীন গণমাধ্যম সম্পর্কে কয়েকজন মনীষীর কিছু উক্তি তুলে ধরছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছেন, বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হলে আমরা নির্বাক বা নীরব হয়ে যেতে পারি, যেভাবে ভেড়ার পালকে জবাইয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। আমেরিকান খ্যাতিমান সাংবাদিক ওয়াল্টার ক্রনকাইট বলেছেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের জন্যই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটিই আসলে গণতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা টমাস জেফারসন বলেছেন, সকলের একমাত্র নিরাপত্তা মুক্ত-সংবাদপত্র। লেখক মার্ক টোয়েন বলেছেন, গণমাধ্যম হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের শত্রু, জনগণের বন্ধু, একটি দেশের স্বাধীনতা রক্ষাকারী।
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ এবং গণতন্ত্রের চতুর্থস্তম্ভ হিসেবে দেখা হয়। এই স্তম্ভটি তখনই মজবুত থাকে, যখন তা একদিকে যেমন ক্ষমতাবানদের প্রভাবমুক্ত বা স্বাধীন থাকে, অন্যদিকে জনস্বার্থ রক্ষায় সমানভাবে দায়িত্বশীল থাকে। একটি সুস্থ জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে স্বাধীন গণমাধ্যম শুধু তথ্যই সরবরাহ করে না; বরং ক্ষমতার দর্পণে সত্যের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে। যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীন নয়, সেখানে জবাবদিহি মৃত; আর যেখানে গণমাধ্যম দায়িত্বজ্ঞানহীন, সেখানে গণতন্ত্র বিপন্ন।
সুশাসনের মূল শর্তই হলো জবাবদিহি। আর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান কারিগর হলো একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। যে সমাজে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ পায় এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সঠিক তথ্য তুলে ধরে, সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম, অপশাসন শিকড় গাড়তে পারে না। মূলত স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই হলো একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার রক্ষাকবচ।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধপ্রবাহের পাশাপাশি অপতথ্য (উরংরহভড়ৎসধঃরড়হ) এবং গুজব (জঁসধৎ) অন্যতম সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম অনেক সময় চাঞ্চল্যকর বা ভুল খবর বা ‘অপতথ্য’কে দ্রুত ভাইরাল করে দেয়, যা সত্য যাচাই হওয়ার আগেই মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
ফেসবুক, টুইটার (এক্স), টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোয় যে কেউ কোনো সেন্সরশিপ ছাড়াই তথ্য প্রকাশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ‘এনগেজমেন্ট’ বা লাইক-শেয়ার, যা অপতথ্য ছড়াতে সহায়ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমগুলো সাধারণত চাঞ্চল্যকর বা আবেগি কনটেন্ট বেশি প্রচার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য তথ্যের চেয়ে মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য অনেক দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছায়।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে খুব সহজেই ‘ডিপফেক’ ভিডিও-অডিও বা ফটোকার্ড তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা খালি চোখে চেনা প্রায় অসম্ভব। অনেক গোষ্ঠী নিজেদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গুজব বা ভুয়া খবর ছড়িয়ে থাকে। এছাড়া ঈষরপশনধরঃ বা ভিউ তাড়ানোর মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের নেশাও একটি বড় কারণ। এ ক্ষেত্রে বিপুল তথ্যের ভিড়ে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল, তা যাচাই করার মতো দক্ষতা বা ধৈর্য সাধারণ ব্যবহারকারীদের থাকে না।সংবাদ বিশ্লেষণ সেবা
গুজব সাধারণত মানুষের ধর্মীয় বা আবেগীয় অনুভূতিকে স্পর্শ করে তৈরি করা হয়। ফলে মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে এগুলো দ্রুত শেয়ার করে। এর ফলে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো নানা ঘটনা ঘটছে। অপতথ্য, গুজব ও প্রোপাগান্ডা বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত। এই ‘অপতথ্য’ শুধু একটি শব্দ নয়, বিশ্বজুড়ে স্বাধীন গণমাধ্যমের অস্তিত্বের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের জন্য ‘অপতথ্য ও ভুল তথ্য’ বিশ্বের এক নম্বর স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ অনলাইনে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালে অপতথ্য প্রচারের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যার অর্ধেকের বেশি ছড়ানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে ছবি ও ভিডিও কারসাজির মাধ্যমে।
সরকারের তথ্য অধিদফতরের গবেষণা উইংয়ের তথ্যে দেখা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে অন্তত ১৮টি ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে, যা গুজব বা অপতথ্য এবং একেবারেই ভিত্তিহীন খবরের ঘটনা। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, অপতথ্য শুধু গুজবই নয়; বরং এটি জননিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মূল ধারার সাংবাদিকতা তথা স্বাধীন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য এক বৈশ্বিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। এক ক্লিকেই এখন খবর পৌঁছায় কোটি মানুষের কাছে। কিন্তু এই গতির যুগে তথ্যের নির্ভুলতা সংকটের মুখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ারে ভেসে আসা ‘ভাইরাল’ সংস্কৃতি আর সুপরিকল্পিত অপতথ্য বর্তমান মূল ধারার গণমাধ্যমকে এক অতল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তথ্যের এই গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করাই হওয়া উচিত গণমাধ্যমের প্রধান লক্ষ্য।
আগেই উল্লেখ করেছি, গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে বর্তমান সময়ের ‘অপতথ্য’ বা মিসইনফরমেশন এখন সেই দর্পণে এক কুয়াশাচ্ছন্ন প্রলেপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অপতথ্যের মহাসমুদ্রে সাঁতরে সত্যকে অক্ষত রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। সত্য সাংবাদিকতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গণমাধ্যমের জন্য এটি এক কঠিন পরীক্ষা।
অপতথ্য, ভুয়া খবর বা অপপ্রচারের ঝুঁকি এড়াতে হলে যাচাই করা তথ্য পরিবেশন করা এখন সময়ের দাবি। সঠিক তথ্য দিয়েই গুজব বা অপতথ্য রুখতে হবে। এ ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রধান শক্তি হলো সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ খবর। সত্য তথ্য ও নিরপেক্ষ তথ্য উপস্থাপন করলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়, যা পরোক্ষভাবে স্বাধীন গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
অপতথ্য বা গুজবরোধে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত সতর্কতার সমন্বয় সবচেয়ে কার্যকর। এ ধরনের অপতথ্য, গুজব বা চাঞ্চল্যকর খবর দেখলে শেয়ার করার আগে এর উৎস জানতে হবে, খবরের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। তথ্যটি এ ক্ষেত্রে মূল ধারার গণমাধ্যম বা স্বীকৃত ওয়েবসাইটের তথ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে। ইন্টারনেটে পাওয়া ছবি বা ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ প্ল্যাটফর্মগুলোর সাহায্য নেয়া যায়। ছবি বা ভিডিওর সত্যতা জানতে গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ বা ‘ওহ ারফ’-এর মতো টুল ব্যবহার করা যায়। এআই দ্বারা তৈরি ভুয়া ছবি বা ‘ডিপফেক’ চেনার জন্য স্কিন টোন বা চোখের পলক ফেরার অস্বাভাবিক খেয়াল করতে হবে। কোনো তথ্য আবেগি বা উসকানিমূলক মনে হলে তা তৎক্ষণাৎ শেয়ার না করে এর সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সন্দেহজনক খবরের সত্যতা জানতে ঝহড়ঢ়বং, ঋধপঃপযবধশ, ড়ৎম বা দেশীয় নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্মগুলোর সাহায্য নিতে হবে। অপতথ্য বা গুজব মোকাবিলায় সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স বা কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। মিডিয়া হাউজগুলোয় নিজস্ব উদ্যোগেই ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ বিভাগ বা উইং থাকা খুব জরুরি, যা সত্য খবর পরিবেশনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে।
লেখক : প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, তথ্য অধিদফতর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
সংবাদ শিরোনাম
অপতথ্য সঠিক তথ্য দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে
-
সৈয়দ আবদাল আহমদ - আপডেট সময় ০১:৪৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- 5
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















