পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা খাল। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ, কোথাও ৩০০ থেকে ৩৫০ ফুট প্রসস্ত এই খাল ঘিরেই গড়ে উঠেছে দুই পাড়ের অন্তত ১০টি গ্রামের কৃষিনির্ভর জীবন ও অর্থনীতি। খালের মিঠাপানি ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধান ও সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন হাজারো কৃষক। কিন্তু তিনটি স্লুসগেট দিয়ে নদীর লোনা পানি প্রবেশের আশঙ্কায় এখন তাঁদের সেই সাফল্য অনিশ্চয়তার মুখে। খালের মিঠাপানি লোনা হয়ে গেলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর গড়ে ওঠা কৃষিকাজ, বিপর্যস্ত হতে পারে কয়েক হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা। স্থানীয় কৃষকদের তথ্যমতে, পাখিমারা খালের ওপর নির্ভরশীল কুমিরমারা, মজিদপুর, এলেমপুর, ইসলামপুর, নেয়ামতপুর, গামইরতলা, নাওভাঙা, পাখিমারা, পূর্ব সোনাতলা, বাইনতলা, মোস্তফাপুর (আংশিক) গ্রামের কৃষকেরা। এসব গ্রামের অন্তত চার হাজার কৃষক পরিবার ধানের পাশাপাশি সারা বছর বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করে। খালের মিঠাপানি তাঁদের কৃষিকাজের প্রধান অবলম্বন। মিঠাপানিতে বদলেছে কৃষকের জীবন ঃ প্রায় তিন দশক ধরে পাখিমারা খালের পানি ব্যবহার করে কৃষিকাজের প্রসার ঘটেছে এই অঞ্চলে। একসময় যাঁরা দিনমজুর কিংবা হাইল্যা-কামলা হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন নিজের জমিতে চাষাবাদ করে গড়ে তুলেছেন স্বাবলম্বী পরিবার। ধান ও সবজি চাষের আয় তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। বদলে দিয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। পরিণত হয়েছেন গেরস্ত পরিবারে। ধানের পাশাপাশি সারা বছর বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করেন এসব গ্রামের কৃষকেরা। উৎপাদিত সবজি স্থানীয় পাখিমারা বাজারে বিক্রি হয়। এখানকার কৃষকেরা বছরে শত শত টন সবজি এলাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করেন। কলাপাড়া উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ সবজির চাহিদা পুরন হয় এখানকার উদপাদিত শাক-সবজিতে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি এই কৃষি উৎপাদন এলাকার মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কৃষকদের কাছে পাখিমারা খাল শুধু পানির উৎস নয়; এটি তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমম গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি। খালের মিঠাপানি তাঁদের জমিতে ফসল ফলায়, পরিবারের খাবার জোগায় এবং সবজি বিক্রির অর্থে সন্তানদের লেখাপড়াসহ দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পথ তৈরি করেন। তিন স্লুইস দিয়ে লোনা পানি প্রবেশের আশঙ্কা ঃ কৃষকদের অভিযোগ, পাখিমারা খালের সঙ্গে সংযুক্ত তিনটি স্লুইস দিয়ে নদীর লবণাক্ত পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। এই পানি খালে ঢুকলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মিঠাপানির মজুদ নষ্ট হতে পারে। তাতে সবজি ও বোরো ধানের আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। এ ছাড়া আগাম চাষ করা শীতকালীন সবজির ক্ষেতও নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কৃষক সুলতান গাজী জানান, পাখিমারা খালের সঙ্গে সংযুক্ত যুগির খাল, নিজকাটা ও নবীপুর স্লুইসের সামনে বেড়িবাঁধের বাইরে প্রতিবছর অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকানো হয়। এ ব্যবস্থার ফলে কৃষকেরা পাখিমারার খালের মিঠাপানি ধরে রেখে চাষাবাদ করতে পারেন। তবে চলতি বছর এখনো লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কৃষক আবুল কালাম জানান, এ বছর এখন পর্যন্ত অর্থের সংস্থান না হওয়ায় কৃষকেরা নিজেরাও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের আবেদন জানিয়েছেন। তবে আশ^াস পেয়েছেন বলে জানালেন এই প্রবীণ কৃষক। বাঁধ না হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা কৃষকদের দাবি, প্রতি বছরের মতো এবারও স্লুইসগেটের সামনে বেড়িবাঁধের বাইরে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে লোনা পানির প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে তাঁদের কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বিশেষ করে সবজি ও বোরো ধানের আবাদ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অধিকাংশ কৃষকের ভাষ্য, ‘লোনা পানির প্রবেশ ঠেকানো না গেলে অন্তত তিন হাজার কৃষক পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁদের দীর্ঘদিনের কৃষিনির্ভর জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়বে। কৃষি উৎপাদন বন্ধ হলে কোটি কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হবেন তাঁরা। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে সবজি সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।’ পাখিমারা খালের মিঠাপানি রক্ষা তাই শুধু কৃষকদের ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয় নয়; এটি ১০ গ্রামের কৃষি, অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। কৃষকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা করবে, যাতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ ঠেকিয়ে তাঁদের ফসল ও জীবিকা রক্ষা করা যায়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আরাফাত হোসেন জানান, তারা কৃষকের এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি সমাধান করা হবে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, ওখানকার কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ কৃষি উৎপাদন ও শত শত কৃষকের জীবন-জীবিকার স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করবেন।
সংবাদ শিরোনাম
অস্থায়ী বাঁধ দেয়ার দাবি কলাপাড়ায় হুমকির মুখে পাখিমারা খাল ঘিরে গড়ে ওঠা ১০ গ্রামের জীবন-অর্থনীতি
-
এনামুল হক (কলাপাড়া) পটুয়াখালী - আপডেট সময় ০৩:০৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- 2
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















