বাংলাদেশের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) মাটি ও পানির সর্বশেষ ২০০৯ সালের জরিপের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল অঞ্চলে লবণাক্ততার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বরগুনা।
এ জেলার ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৮০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৯৫ হাজার ৬২০ হেক্টর জমি লবণাক্ত। এসব জমিতে লবণের পরিমাণ সময় বিশেষে ১৬ থেকে ২৮ দশমিক ৫ ডেসিসিমেন পার মিটার (ডিএস/এম) পর্যন্ত। চাষাবাদের জমিতে লবণ সহনশীলতার সর্বোচ্চ মাত্রা ৪ থেকে ৮ ডিএস/এম জানিয়েছেন বরিশাল আঞ্চলিক মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এফ এম মামুন।
এ সকল কারণে এই ধরনের জমি বছরের অধিকাংশ সময় কৃষি কাজের বাইরে পতিত ছিল। বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলিমুর রহমান জানান, একবার কোনো জমি লবণাক্ত হয়ে পড়লে তা যত ব্যবস্থাপনা করা হোক না কেন তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। তাই লবন সহিষ্ণু জাত চাষাবাদের মাধ্যমে জমির ব্যবহার করতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছর ধরে বরগুনার লবনাক্ত পরিত্যাক্ত জমিতে গম, ডাল পাট, সূর্ষমুখীর আবাদ করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বরগুনাসহ উপকূল অঞ্চলে শুধু বৃষ্টির মৌসুমে বছরে একটি মাত্র ফসল, আমন ধান হতো। ২০০৭ সালের সিডরের আগে উপকূলজুড়ে একফসলি জমি ছিল। এই ধান কৃষকেরা ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে কেটে ঘরে তুলতেন। এরপর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অপঘাতে শুষ্ক মৌসুমে জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে পতিত থাকতো। এছাড়াও সেচযোগ্য পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৪ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় সাত মাস কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হয় না।
এই বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চলের লবণাক্ত পতিত জমিতে ফসল ফলানোর লক্ষে ২০১৭ সাল থেকে এসব জমিতে বাড়তি ফসল উৎপাদন করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন কৃষি গবেষকরা। গম জাতীয় ফসলে অল্প পানি সেচ দিয়েই ভালো ফসল উৎপাদন সম্ভব বলে তারা নিশ্চিত হন। কারণ ফসল হিসেবে গম প্রকৃতিগতভাবেই কিছুটা লবণসহিষ্ণু। তাই রিলে পদ্ধতিতে গম ও মুগ ফসলের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন গবেষকেরা। গম ও মুগের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকরা লবণসহিষ্ণু জাতের পাট ও সূর্ষমুখীর আবাদে সফলতা পেয়েছেন।
এরই মধ্যে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে আঁশ জাতীয় ‘কেনাফ’। জেলার লবণাক্ত জমিতে পাটের বিকল্প হিসেবে আঁশ জাতীয় ফসল ‘কেনাফ’ নতুন আশা জাগাতে পারে বলে কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন। নতুন এই ফসলের আবাদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। বছরের অধিকাংশ সময় পতিত থাকা উপকূলের বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরের প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর লবণাক্ত জমিকে বহু ফসলি করার লক্ষে কেনাফ আবাদের উদ্যোগ নিয়েছে তারা।
পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, কেনাফের উৎস আফ্রিকায়। হুবহু পাটের মতোই, তবে পাট নয়। পাটের চেয়ে ফলন বেশি। লবণাক্ততা, খরা এবং অনাবৃষ্টি মোকাবিলা করেই কেনাফ বেড়ে উঠতে পারে। এর ফলে এটি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বপন উপযোগী। কেনাফের ক্ষেত্রে পাটের চেয়ে জমিতে নিড়ানি ও পরিচর্যা কম লাগে। এটির রোগবালাই প্রতিরোধক্ষমতাও বেশি। পটুয়াখালীর পাট গবেষণা উপকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ আফলাতুন কবির জানান, কেনাফের আবাদ সম্প্রসারিত হলে পতিত জমি চাষের আওতায় আসবে।
বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসাণ অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিচালক এসএম বদরুল আলম জানিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। পিঠাপিঠি ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উপকূলীয় এলাকার কৃষি ও জনজীবন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিজ্ঞানীরা। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে উপকূল এলাকায় ঘন ঘন দুর্যোগ, কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাত কম হওয়া, উজানের পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় উপকূলের নদ-নদীতে উজানের প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভয়াবহ লবণাক্ততা ছড়িয়েছে। তবে আশার কথা সেই নোনা জমিতেই কৃষকরা গম, ডাল পাট, সূর্ষমুখী আবাদ করছেন। তিনি আরও জানান, ব্যবহার ও বাজার পেলে কেনাফ চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়তে পারে।