নিজের অসহায় জীবনের কথা তার গানে গানে ফুটে ওঠে। কখনো সে দরাজ গলায় গেয়ে উঠে, ‘তুমি মানুষ হইয়া জন্ম নিয়া কি করিলা’,‘জীবন মানেই তো যন্ত্রনা’ অথবা মানুষ ধর মানুষ ভজ-শোন বলিরে পাগল মন আবার কখনো হাসন রাজা, বাউল শাহ আব্দুল করিমের গান গেয়ে আসরকে মাতিয়ে রাখেন তিনি। নাম তাঁর মো. আরজ আলী(৫৭)। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বাকলজোড়া ইউনিয়নের বালিচান্দা গ্রামে বসবাস করেন। জন্মের আড়াই বছর বয়সে বাবা কে হারান, মায়ের কাছে কোন রকম মানুষ হলেও কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাকে হারিয়েছেন। তাই জন্মের পর থেকেই কারো সহায়তা পায়নি তিনি। ছোট বেলায় আঘাতের কারনে তার ডান কম শোনেন। আরজ আলী সহজ সরল স¦ভাবের হওয়ায় কোন কাজেই মন বসাতে পারেননি। ওই এলাকার প্রখ্যাত নবী বাউলের শিষ্যত্ব বরণ করে হাতে তুলে নেন একতারা। শুরু হয় নতুন জীবন। সুরের মাঝে খুজে পেতে চান শ্রস্টার নির্দেশনা। এক হাতে খঞ্জনী অন্য হাতে একতারা টেনে টেনে গান গেয়ে বেড়ান উপজেলার নানা প্রান্তে। অসাধারণ তার গায়কী। বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা চত্বরে গান করতে করতে বৃস্টিতে ভিজে যান আরজ আলী। দৌড়ে এসে দাঁড়ান এক বারান্দায়। তার সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলাম। তাঁর জীবনে নানা কথা তুলে ধরেন যুগান্তরের কাছে। গান কোথায় শিখেছেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আমি বেলহা দেইখ্যা, আমারে ছুডুত্যে হগলেই বলছে, আমারে দিয়া কুছতা অইতো না, আমার ভিক্কা হরা ছাড়া উহায় নাই, হের পরতে কস্ট লাগছে, আমি ভিক্কা হরতাম না, হেরপর উস্তাদ নবী বাউলের টাইন গান ধরছি, অহন গান নিয়া চালাই আমার জীবন। আমি রাস্তাার গায়ক” আমি ভালাই আছি। গান করতে কেমন লাগে এমন প্রশ্ন করলে আরজ আলী বলেন, “নবীর দিক্ষা-করিওনা ভিক্ষা, নবীজি ভিক্ষা পছন্দ করতেন না। তাই ভিক্ষা না করে গান করার সিন্ধান্ত নেই। মানুষ গান শুনে খুশিই হয়। কেউবা দু’চার টাকা দেন-তাই দিয়েই জীবন চালাই। কিছু একটা করার জন্য অনেকের কাছে গেছি কেউই সহায়তা করেন নাই। তাই রাস্তায় রাস্তায় গান গেয়ে বেড়াই। একদিন রাস্তায় গান না করলে পরদিন আমার সংসার চলে না।” সরকারের কাছে কোন চাওয়া আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একটা অসহায় বা বয়স্ক ভাতার কার্ড আর একটা সরকারি ঘর দিলে ভালা অইতো, আমার খুব ইচ্ছা ছিল টেলিহিসনে গান করবার, জীবনে একবার সুযুগ পাইলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়া আমার লেহা একটা গান গাইতাম। জীবনের বাকিটা সময় কিভাবে কাটাতে চান প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “দেখেন কেউ কি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে জীবন কাটাতে চায়? সবাইতো দামি গাড়ি-বাড়ি চায় আর আমি চাই একটু ভালোভাবে বাঁচতে।” তিনি আরো বলেন, “আমার মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, ১ ছেলে পরের বাড়ীতে দিনমজুরীর কাজ করে। তাদের জীবনও অনেক কষ্টের, স্ত্রী ও ছেলেকে কে নিয়ে সুখে থাকতে চাই। কেউ ভিক্ষুক হয়ে জন্মায় না। আমার বাকি জীবনটা গান গেয়েই কাটাতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরজ আলী আবেদন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে টেলিভিশনে একটা গান করতে চান। মানুষকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে বললে তিনি বলেন, “মানুষ হয়ে জন্ম নিছ-তাই মানুষের জন্য কিছু কর”।