ইসলাম মানুষকে হাত পেতে চলার পরিবর্তে নিজের শ্রম, মেধা ও বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবন গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছে। এজন্য ইসলাম অত্যন্ত সুন্দর নীতিমালাও বর্ণনা করেছে।
সেগুলো হলো—
১. পরিশ্রম এবং উদ্যোগী হওয়া
ইসলামে অলসতা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং পরিশ্রমকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে মানুষের জন্য বাসযোগ্য ও জীবিকা অর্জনের উপযোগী করে দিয়েছেন। তাই মানুষের কর্তব্য হলো বৈধ উপায়ে কাজ করা, দক্ষতা অর্জন করা এবং জীবিকার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সহজ করে দিয়েছেন।
অতএব তোমরা এর পথে-প্রান্তরে চলাফেরা করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো। আর তাঁর কাছেই পুনরুত্থান।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পদ উপার্জনে উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘কেউ কখনো নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য ভক্ষণ করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের উপার্জন থেকেই আহার করতেন।
’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
২. প্রয়োজনে কর্মস্থল পরিবর্তন করা
অনেক সময় উন্নত জীবিকা, নিরাপদ পরিবেশ বা দ্বীন রক্ষার জন্য নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়। ইসলামের ইতিহাসে মহান হিজরত তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, যা শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতাই নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনেরও ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১০০)
৩. আল্লাহপ্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সম্পদ মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
কৃষি, শিল্প, খনিজ, বন, নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ব্যক্তি ও জাতিকে স্বাবলম্বী করে তোলে। তবে অপব্যবহার বা ধ্বংস নয়; বরং সংরক্ষণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৯)
৪. সাশ্রয়ী ব্যয় ও অপচয় বর্জন করা
স্বাবলম্বী জীবনের অন্যতম ভিত্তি হলো আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয় করা। ইসলাম অপচয়কে শয়তানের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছে। আয় যতই হোক, অপচয় মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও, পান করো; কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
৫. সঞ্চয় ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ করা
ইসলাম মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করে। বৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করা এবং তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা ব্যক্তি ও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করে। কৃষি, ব্যবসা, শিল্প কিংবা অন্য কোনো হালাল উদ্যোগে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কোরআনে ইউসুফ (আ.)-এর মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণের যে পরিকল্পনা বর্ণিত হয়েছে, তা দূরদর্শী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৭–৪৯)
৬. হালাল উপার্জনের প্রতি অবিচল থাকা
ইসলামে হালাল উপার্জন ইবাদতের অংশ। সুদ, ঘুস, জুয়া, প্রতারণা, মজুদদারি, শ্রমিকের অধিকার নষ্ট করা কিংবা অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আমার দেওয়া হালাল ও পবিত্র রিজিক থেকে আহার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭২)
৭. জাকাত ও সদকার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি সম্পদের সুষম বণ্টনের কার্যকর ব্যবস্থা। নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর সাধারণভাবে আড়াই শতাংশ (২.৫%) জাকাত ফরজ হয়। তবে সব সম্পদের ক্ষেত্রে হার এক নয়; কৃষিপণ্য, খনিজ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে শরিয়তে ভিন্ন বিধান রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠিয়ে বলেন, ‘তাদের ধনীদের কাছ থেকে জাকাত গ্রহণ করবে এবং তা তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৯৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯)
৮. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো
ইসলাম আত্মকেন্দ্রিক অর্থনীতি সমর্থন করে না। স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, দরিদ্র ও মুসাফিরের অধিকার আদায় করাও ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও, দরিদ্র ও মুসাফিরকেও।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিক বৃদ্ধি পায় এবং আয়ুতে বরকত দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৬৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭)
সংবাদ শিরোনাম
দারিদ্র্য কাটিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার আট উপায়
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ১০:১৩:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
- 62
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























