ঢাকা ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব

একটি ভালো বই কখনো শুধু কাগজের কিছু পৃষ্ঠা নয়; এটি মানুষের চিন্তার জানালা, জ্ঞানের দরজা এবং সভ্যতার স্মৃতির ভা-ার। একটি বই কখনো মানুষকে ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়, কখনো অজানাকে জানার সুযোগ করে দেয়, আবার কখনো নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনতে শেখায়। তাই বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হয়, তার চিন্তা ও মননও তত সমৃদ্ধ হয়।
গতকাল ৯ আগস্ট ছিল বিশ্ব বইপ্রেমী দিবস। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব স্মরণ করার এই দিনে ইসলামের শিক্ষা আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যার সূচনাই হয়েছে ‘পড়ো’ নির্দেশের মাধ্যমে।
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাজিল হওয়া প্রথম ওহির প্রথম শব্দ ছিল—‘ইকরা’, অর্থাৎ ‘পড়ো’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের প্রথম ওহি কল্পনা করা কঠিন, যার সূচনায় এসেছে—‘পড়ো’। অথচ ইসলামের প্রথম নির্দেশই ছিল, ‘পড়ো’ শব্দের মাধ্যমে।
এরপর বলা হয়েছে, ‘যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ৪–৫)
এখানে ‘কলম’ ও ‘শিক্ষা’র কথা পাশাপাশি এসেছে। এর মাধ্যমে জ্ঞান সংরক্ষণ, লিপিবদ্ধকরণ ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বও স্পষ্ট হয়।
বই জ্ঞান সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম
মানুষের স্মৃতি সীমিত, কিন্তু লেখা জ্ঞানকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
একজন আলেম চলে যান, কিন্তু তাঁর লেখা বই বহু প্রজন্মকে জ্ঞান দিতে থাকে। একজন ইতিহাসবিদ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর গ্রন্থ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকে। একজন চিন্তাবিদ মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর বই তাঁর চিন্তাকে মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রাখে।
ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান সংরক্ষণের এই ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সাহাবায়ে কেরাম হাদিস লিখে রাখতেন, পরবর্তী যুগে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ ও ইতিহাসবিদরা বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁদের মেহনতের ফলেই আজ আমরা কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ইসলামের ইতিহাসের বিশাল জ্ঞানভা-ারের কাছে পৌঁছাতে পারছি। তাইতো আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তর উন্নীত করবেন।’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ১১)
তাই বই পড়ার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা চাকরি পাওয়া হওয়া উচিত নয়। বই আমাদের এমন জ্ঞান দিক, যা আমাদের মানুষ হিসেবে উন্নত করে, আল্লাহর পরিচয় গভীর করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৩৭)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
ভালো বই নির্বাচনে সতর্কতা জরুরি
বই পড়লেই মানুষ জ্ঞানী হয় না; সঠিক বই পড়লেই মানুষ প্রকৃত জ্ঞানী হয়। একজন মুসলিমের পাঠতালিকায় সর্বাগ্রে থাকা উচিত আল-কোরআন। এরপর সহিহ হাদিস, নবীজির জীবনচরিত, সাহাবায়ে কেরামের জীবন, আকিদা, ফিকহ, ইতিহাস, নৈতিকতা, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণমূলক জ্ঞান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৪)
বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত
বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সামনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও ও অসংখ্য ডিজিটাল কনটেন্ট। তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ে মানুষ অনেক সময় প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রল করার পর মনে হয় অনেক কিছু দেখেছি, কিন্তু দিনশেষে কী শিখেছি—তার উত্তর অনেক সময় থাকে না। অন্যদিকে একটি ভালো বই ধীরে পড়তে শেখায়, চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং কোনো বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই প্রযুক্তিকে বর্জন নয়; বরং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং বই পড়ার অভ্যাস—দুটোকেই জীবনের অংশ করা দরকার। ছাপা বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল গ্রন্থাগারও জ্ঞানার্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
একটি শিশুর হাতে শুধু মোবাইল তুলে দিয়ে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। তাকে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাতে হবে। বাড়িতে ছোট একটি বইয়ের তাক থাকতে পারে। শিশুকে বয়স অনুযায়ী গল্প, ইতিহাস, নৈতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ইসলামী জ্ঞানভিত্তিক বই পড়ার সুযোগ দিতে হবে। বাবা-মা নিজেরা বই পড়লে সন্তানও বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে। কারণ সন্তানকে শুধু ‘বই পড়ো’ বললে হবে না; বই পড়ার একটি পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করা জরুরি
ইসলামে জ্ঞানের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়; বরং জ্ঞান অনুযায়ী জীবন গঠন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।’ (সুরা : সাফ, আয়াত : ৩)
অতএব, আমরা শত শত বই পড়লাম, অসংখ্য তথ্য জানলাম, কিন্তু যদি চরিত্রে তার প্রভাব না পড়ে, তাহলে সেই জ্ঞান আমাদের প্রকৃত কল্যাণ কতটা করবে—তা ভেবে দেখা জরুরি। একটি ভালো বই যেন আমাদের আরো বিনয়ী করে, সত্যবাদী করে, দায়িত্বশীল করে এবং সৃষ্টির প্রতি কল্যাণকামী করে—এটাই হওয়া উচিত পাঠাভ্যাসের মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব বইপ্রেমী দিবসে আমরা একটি ছোট অঙ্গীকার করতে পারি—প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বই পড়ব। হয়তো শুরু হবে মাত্র ১৫ মিনিট দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে তা ৩০ মিনিট বা এক ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। মাসে একটি বই, পরে দুই বা তিনটি বই—এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর পাঠাভ্যাস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠচক্র, মসজিদ-মাদরাসায় ইসলামী বই পাঠের আসর, পাড়ায় ছোট লাইব্রেরি এবং পরিবারে নিয়মিত বই পড়ার সময়—এসব উদ্যোগ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বই এমন এক বন্ধু, যে আমাদের কাছে কিছু দাবি করে না; বরং প্রতিবার তার পৃষ্ঠা খুললে আমাদের কিছু না কিছু দিয়ে যায়। সে আমাদের অতীতের সঙ্গে পরিচয় করায়, বর্তমানকে বুঝতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতের পথ দেখায়। তাই আসুন, বিশ্ব বইপ্রেমী দিবসে বইকে শুধু তাকের অলংকার না বানিয়ে জীবনের সঙ্গী করি। প্রতিদিন কিছু সময় বইয়ের জন্য রাখি, সন্তানদের হাতে বই তুলে দিই, ভালো বই উপহার দিই এবং জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করি।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব

আপডেট সময় ০৯:৪২:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

একটি ভালো বই কখনো শুধু কাগজের কিছু পৃষ্ঠা নয়; এটি মানুষের চিন্তার জানালা, জ্ঞানের দরজা এবং সভ্যতার স্মৃতির ভা-ার। একটি বই কখনো মানুষকে ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়, কখনো অজানাকে জানার সুযোগ করে দেয়, আবার কখনো নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনতে শেখায়। তাই বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হয়, তার চিন্তা ও মননও তত সমৃদ্ধ হয়।
গতকাল ৯ আগস্ট ছিল বিশ্ব বইপ্রেমী দিবস। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব স্মরণ করার এই দিনে ইসলামের শিক্ষা আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যার সূচনাই হয়েছে ‘পড়ো’ নির্দেশের মাধ্যমে।
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাজিল হওয়া প্রথম ওহির প্রথম শব্দ ছিল—‘ইকরা’, অর্থাৎ ‘পড়ো’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের প্রথম ওহি কল্পনা করা কঠিন, যার সূচনায় এসেছে—‘পড়ো’। অথচ ইসলামের প্রথম নির্দেশই ছিল, ‘পড়ো’ শব্দের মাধ্যমে।
এরপর বলা হয়েছে, ‘যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ৪–৫)
এখানে ‘কলম’ ও ‘শিক্ষা’র কথা পাশাপাশি এসেছে। এর মাধ্যমে জ্ঞান সংরক্ষণ, লিপিবদ্ধকরণ ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বও স্পষ্ট হয়।
বই জ্ঞান সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম
মানুষের স্মৃতি সীমিত, কিন্তু লেখা জ্ঞানকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
একজন আলেম চলে যান, কিন্তু তাঁর লেখা বই বহু প্রজন্মকে জ্ঞান দিতে থাকে। একজন ইতিহাসবিদ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর গ্রন্থ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকে। একজন চিন্তাবিদ মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর বই তাঁর চিন্তাকে মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রাখে।
ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান সংরক্ষণের এই ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সাহাবায়ে কেরাম হাদিস লিখে রাখতেন, পরবর্তী যুগে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ ও ইতিহাসবিদরা বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁদের মেহনতের ফলেই আজ আমরা কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ইসলামের ইতিহাসের বিশাল জ্ঞানভা-ারের কাছে পৌঁছাতে পারছি। তাইতো আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তর উন্নীত করবেন।’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ১১)
তাই বই পড়ার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা চাকরি পাওয়া হওয়া উচিত নয়। বই আমাদের এমন জ্ঞান দিক, যা আমাদের মানুষ হিসেবে উন্নত করে, আল্লাহর পরিচয় গভীর করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৩৭)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
ভালো বই নির্বাচনে সতর্কতা জরুরি
বই পড়লেই মানুষ জ্ঞানী হয় না; সঠিক বই পড়লেই মানুষ প্রকৃত জ্ঞানী হয়। একজন মুসলিমের পাঠতালিকায় সর্বাগ্রে থাকা উচিত আল-কোরআন। এরপর সহিহ হাদিস, নবীজির জীবনচরিত, সাহাবায়ে কেরামের জীবন, আকিদা, ফিকহ, ইতিহাস, নৈতিকতা, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণমূলক জ্ঞান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৪)
বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত
বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সামনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও ও অসংখ্য ডিজিটাল কনটেন্ট। তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ে মানুষ অনেক সময় প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রল করার পর মনে হয় অনেক কিছু দেখেছি, কিন্তু দিনশেষে কী শিখেছি—তার উত্তর অনেক সময় থাকে না। অন্যদিকে একটি ভালো বই ধীরে পড়তে শেখায়, চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং কোনো বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই প্রযুক্তিকে বর্জন নয়; বরং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং বই পড়ার অভ্যাস—দুটোকেই জীবনের অংশ করা দরকার। ছাপা বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল গ্রন্থাগারও জ্ঞানার্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
একটি শিশুর হাতে শুধু মোবাইল তুলে দিয়ে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। তাকে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাতে হবে। বাড়িতে ছোট একটি বইয়ের তাক থাকতে পারে। শিশুকে বয়স অনুযায়ী গল্প, ইতিহাস, নৈতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ইসলামী জ্ঞানভিত্তিক বই পড়ার সুযোগ দিতে হবে। বাবা-মা নিজেরা বই পড়লে সন্তানও বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে। কারণ সন্তানকে শুধু ‘বই পড়ো’ বললে হবে না; বই পড়ার একটি পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করা জরুরি
ইসলামে জ্ঞানের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়; বরং জ্ঞান অনুযায়ী জীবন গঠন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।’ (সুরা : সাফ, আয়াত : ৩)
অতএব, আমরা শত শত বই পড়লাম, অসংখ্য তথ্য জানলাম, কিন্তু যদি চরিত্রে তার প্রভাব না পড়ে, তাহলে সেই জ্ঞান আমাদের প্রকৃত কল্যাণ কতটা করবে—তা ভেবে দেখা জরুরি। একটি ভালো বই যেন আমাদের আরো বিনয়ী করে, সত্যবাদী করে, দায়িত্বশীল করে এবং সৃষ্টির প্রতি কল্যাণকামী করে—এটাই হওয়া উচিত পাঠাভ্যাসের মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব বইপ্রেমী দিবসে আমরা একটি ছোট অঙ্গীকার করতে পারি—প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বই পড়ব। হয়তো শুরু হবে মাত্র ১৫ মিনিট দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে তা ৩০ মিনিট বা এক ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। মাসে একটি বই, পরে দুই বা তিনটি বই—এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর পাঠাভ্যাস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠচক্র, মসজিদ-মাদরাসায় ইসলামী বই পাঠের আসর, পাড়ায় ছোট লাইব্রেরি এবং পরিবারে নিয়মিত বই পড়ার সময়—এসব উদ্যোগ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বই এমন এক বন্ধু, যে আমাদের কাছে কিছু দাবি করে না; বরং প্রতিবার তার পৃষ্ঠা খুললে আমাদের কিছু না কিছু দিয়ে যায়। সে আমাদের অতীতের সঙ্গে পরিচয় করায়, বর্তমানকে বুঝতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতের পথ দেখায়। তাই আসুন, বিশ্ব বইপ্রেমী দিবসে বইকে শুধু তাকের অলংকার না বানিয়ে জীবনের সঙ্গী করি। প্রতিদিন কিছু সময় বইয়ের জন্য রাখি, সন্তানদের হাতে বই তুলে দিই, ভালো বই উপহার দিই এবং জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করি।