ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। এ মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে মহান ব্যক্তিত্ব, আল্লাহর প্রিয় হাবিব ও শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশেষ করে তাঁর জন্মের মাস হিসেবে রবিউল আউয়াল মুসলিম হৃদয়ে বিশেষ আবেগ ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে। একই মাসে তাঁর ইন্তেকালও সংঘটিত হয়—ফলে এ মাস আনন্দ, ভালোবাসা, শিক্ষা ও আত্মজিজ্ঞাসার মাস।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই মনে রাখা জরুরি—রবিউল আউয়ালের নির্দিষ্ট কোনো দিনকে শরিয়ত স্বতন্ত্র ইবাদত বা বিশেষ ফজিলতের মাস হিসেবে নির্ধারণ করেনি। তাই এ মাসের মর্যাদা বোঝার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন যেমন পরিহার করতে হবে, তেমনি মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের সুযোগ হিসেবেও মাসটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর রহমত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
রবিউল আউয়ালের বিশেষত্বের প্রধান কারণ হলো—এ মাসের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও ইন্তেকালের স্মৃতি জড়িত। তবে তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে।
সহিহ হাদিসে নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিন আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
নবীপ্রেম ঈমানের দাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের ঈমানের অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদেরই একজন রাসুল পাঠিয়েছেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)
রাসুল (সা.)-এর আগমন ছিল মানবজাতির জন্য বিরাট এক আল্লাহর নিয়ামত।
তিনি মানুষকে শিরকের অন্ধকার থেকে তাওহিদের আলোয়, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে, জুলুম থেকে ন্যায়ের পথে এবং পাপের জীবন থেকে তাকওয়ার পথে আহ্বান করেছেন। তাই নবীপ্রেম শুধু আবেগের বিষয় নয়; তাঁর নির্দেশ মানা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর চরিত্র নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করাই সত্যিকারের নবীপ্রেম। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)
আমরা তাঁর নাম শুনে দরুদ পড়ব, তাঁর জীবন পড়ব, তাঁর চরিত্র জানব, তাঁর সুন্নাহ শিখব এবং পরিবার-সমাজ-ব্যবসা-রাজনীতি-শিক্ষা—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করব। কারণ নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সত্যতা প্রকাশ পায় কাজে। আল্লাহ তাআলা নিজেই মুমিনদের রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠাও এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)
সুতরাং রবিউল আউয়ালকে উপলক্ষ করে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা, রাসুল (সা.)-এর ওপর সালাম পেশ করা এবং তাঁর জীবন ও শিক্ষা অধ্যয়ন করা জরুরি। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা : কলম, আয়াত : ৪)
রবিউল আউয়ালে আমাদের করণীয়
এ মাসকে কেন্দ্র করে এমন কোনো নির্দিষ্ট ইবাদতকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ আমল মনে করা উচিত নয়, যার প্রমাণ কোরআন-সুন্নাহয় নেই। বরং সারা বছর যেসব নেক আমল করা সুন্নাহসম্মত, সেগুলো এ মাসে আরও যতেœর সঙ্গে করা যেতে পারে। যেমন—
১. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
২. রাসুল (সা.)-এর জীবনী ও শামায়েল অধ্যয়ন করা।
৩. তাঁর সুন্নাহ শেখা ও বাস্তবায়ন করা।
৪. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা।
৫. নফল ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির বৃদ্ধি করা।
৬. সোমবার নফল রোজা রাখা।
৭. পরিবার ও সন্তানদের নবী (সা.)-এর জীবন ও চরিত্র শিক্ষা দেওয়া।
৮. তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
আসুন, এ মাসে আমরা একটি অঙ্গীকার করি—রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শুধু মুখে ভালোবাসব না; বরং তাঁর সুন্নাহকে জীবনের পথ বানাব। তাঁর চরিত্র অনুসরণ করব, তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করব, তাঁর জীবন অধ্যয়ন করব এবং পরিবার-সমাজে তাঁর আদর্শ ছড়িয়ে দেব।
কারণ সত্যিকারের নবীপ্রেম হলো—মুহাম্মদ (সা.)-কে ভালোবাসা, তাঁর পথকে ভালোবাসা এবং তাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যিকারের আশেক ও সুন্নাহর অনুসারী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
রবিউল আউয়াল : নবীপ্রেম ও আত্মশুদ্ধির মাস
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০৯:৩৫:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- 66
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























