ঢাকা ০২:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ৬৪ জেলায় সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রমের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের Logo অন্যায় করে কেউ পার পাবে না; ডা. শফিকুর রহমান Logo বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও সহিংসতা হ্রাস পেয়েছে Logo শান্তি-সম্প্রীতির বন্ধনে শান্তিপূর্ণ,সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার : প্রধানমন্ত্রী Logo নাটোরে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত ১৪ Logo মেয়েদের আইপিএলের নিলামে নেই বাংলাদেশের কেউ Logo এআইকে দেওয়া তথ্য ডার্ক ওয়েবে আছে কি না জানুন Logo কখন গোসল করা ভালো সকালে নাকি রাতে? Logo ৭ সেকেন্ডে ৫ রাউন্ড গুলি, বাড়লো সালমান খানের নিরাপত্তা Logo অজ্ঞতাবশত বিতর্ক মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়

ইবনে খালদুনের রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা

  • সহুল আহমদ
  • আপডেট সময় ০৩:২৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • 363

চৌদ্দ শতকের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইবনে খালদুনের নামের সঙ্গে ইতিহাসবেত্তা, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সুফি এবং সর্বোপরি একজন দার্শনিক সব উপাধি জড়িয়ে আছে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৩৩২ সালে আফ্রিকার তিউনিসে।
১৩৪৮ সালে উত্তর আফ্রিকায় ভয়াবহ প্লেগ মহামারী শুরু হলে পিতা-ভাইসহ বহু বন্ধুবান্ধব হারান। এ মহামারী ও ধ্বংসস্তূপ ইবনে খালদুনের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়, যার প্রভাব বিভিন্নভাবে তার কাজে ছড়িয়ে পড়ে। খালদুন তার জীবনে তৎকালীন বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। উত্তর আফ্রিকায় সিংহাসন নিয়ে যে লড়াই সেখানে খালদুন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে নিজেকে হাজির করেছিলেন। তার এ রোমাঞ্চকর জীবন থেকে কিছুদিন বিরাম নিয়ে ১৩৭৫ সালে পশ্চিম আলজেরিয়ার ক্বালাত বানু সালামে বিখ্যাত মুকাদ্দিমা গ্রন্থ লেখা শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের শিকার হয়ে ১৩৮৩ সালে মিসরের কায়রো গমন করেন। সেখানেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৪০৬ সালে খালদুন ইন্তেকাল করেন।
মুকাদ্দিমা ও ইতিহাসবিদদের ভুল
মুকাদ্দিমা হচ্ছে ইবনে খালদুনের সবচেয়ে মশহুর গ্রন্থ। নানা ভাষায় অনূদিত এ গ্রন্থের ওপরই বলা যায় খালদুনের যাবতীয় সুখ্যাতি নির্ভরশীল। মূলত তার বিশালকায় ইতিহাসের কিতাব ‘ইবার’র ভূমিকা হচ্ছে এ মুকাদ্দিমা। এটাকে তার তাত্ত্বিক প্রস্তাব বলা যেতে পারে: তিনি যে দীর্ঘ ইতিহাস লিখতে যাচ্ছেন, সেটার গুরুত্ব কী, কেনইবা সেটা অন্যদের চেয়ে আলাদা, আগের কাজগুলোর দুর্বলতা কী—মূলত এসব নিয়েই তিনি বাৎচিত করেছেন। মোটাদাগে ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত ই দীর্ঘ তাত্ত্বিক প্রস্তাবে তিনি মানবসমাজ, রাষ্ট্র, খেলাফত, সাম্রাজ্য, যাযাবরীয় সমাজ, নগরভিত্তিক সমাজ, বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত কলাকৌশল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
মুকাদ্দিমার শুরুতেই খালদুন প্রশ্ন তুলেছেন, ইতিহাসবিদরা কেন ভুল করেন। এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে মুখবন্ধে তিনি ইতিহাসের দুটো স্তরের কথা বলেন: উপরিভাগ ও অন্তর্নিহিত অর্থ। তিনি যা বলেন তা সংক্ষেপে হচ্ছে এমন, উপরিভাগে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা, ডাইনেস্টি ও সুদূর অতীতের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ থাকে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কর্মকা- সম্পর্কে জ্ঞাত করা এবং আমজনতাকে বিনোদন দেয়া। এটা দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বিষয় ও বস্তু সবকিছু নিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে; কীভাবে রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব ঘটছে ও কীভাবে তার পতন ঘটছে। অন্যদিকে ইতিহাসের অন্তর্নিহিত অর্থের ভেতর ঘটনার পূর্বাপর, কারণ, বিকাশ ও বিনাশের মৌলিক উপাদান ও সত্য খোঁজার তাগিদ থাকে। একটা ঘটনা ঘটার পেছনে কারণ কী? কোন কোন বাস্তবিক পরিস্থিতি ঘটনার জন্ম দিয়েছে? এর আসল উদ্দেশ্য কী? ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার এ দুই স্তরের সঙ্গে সহজেই মার্ক্সীয় পরিভাষার ‘উপরিকাঠামো’ (superstructure) ও ‘ভিত্তিকাঠামো’র (base /or substructure) মিল খুঁজে পাওয়া যায়; এবং কোনো কোনো খালদুন-গবেষক খালদুনকে মার্ক্সের পূর্বসূরি হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। আবার অনেকে খালদুনের এমন ভাবনার ওপর তার সুফিবাদী দর্শনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। অ্যালেন ফ্রমহের্জ তার ইতিহাস দর্শনের গঠনে সুফিবাদের ভূমিকার ওপর জোরারোপ করেছেন। তার মতে, ইতিহাসের অন্তর্নিহিত সত্য অনুসন্ধানের সঙ্গে সুফিবাদী দর্শন সমান্তরাল। খালদুনের ইতিহাসের দুই স্তরকে সুফিবাদী ভাষায় বলা যায়, জাহেরি ও বাতেনি স্তর। সুফিবাদই ঐতিহাসিক ঘটনার জাহেরি অবস্থানকে ছাড়িয়ে ঘটনাগুলোর বাতেনি অবস্থানের দিকে নজর দিতে উৎসাহ দিয়েছিল। খালদুন এটাও বলেন, ঐতিহ্য/প্রথার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস মানুষের স্বভাবজাত এবং এটা ইতিহাসবিদ্যার জন্য মোটেও ফায়দাকর নয়।
ইতিহাসবিদরা কেন ভুল করেন—এ প্রশ্নের উত্তরে খালদুন মোট সাত ধরনের ভুলের কথা বলেন। এক. কোনো একটা মত বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক মনোভাব ইতিহাসবিদকে ভুল পথে পরিচালিত করে। দুই. ইসলামের ইতিহাসে ধারা বর্ণনাকারীর গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল। বিশেষ করে হাদিসের শুদ্ধতা নির্ধারণে এটা খুব কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। খালদুনের দ্বিতীয় আপত্তি হচ্ছে এটা নিয়েই: এদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও ভুলের একটা কারণ। তিন. ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেখবর থাকা। চার. ভ্রান্ত পূর্বানুমানের ভিত্তিতে সত্যে পৌঁছার চেষ্টা করা। পাঁচ. বাস্তবতার সঙ্গে পরিস্থিতি কীভাবে খাপ খাচ্ছে সে বিষয়ে অজ্ঞ থাকা। ছয়. শাসকগোষ্ঠী ও উচ্চাসনের পদাধিকারদের খুশি করার মনোবাসনা। সাত. মানবসমাজের অবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে বেখবর থাকা। অর্থাৎ মোটাদাগে পক্ষপাতিত্ব, সহজে কোনো কিছুকে সত্য বলে মেনে নেয়ার ঝোঁক এবং অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে ধরতে ব্যর্থ হওয়াটাই ইতিহাসবিদকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে। ফলে খালদুনের সমাজ সম্পর্কে অধ্যয়নও ইতিহাসের সত্য খুঁজে বের করার বাসনা থেকে।
সামাজিক জীবন, রাষ্ট্র ও আসাবিয়া সমাজের দরকার কী? তৎকালের অন্য দার্শনিকদের মতো মুসলিম দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকরাও সমাজের জরুরতকে স্বীকার করতেন। মানুষ একা একা যথেষ্ট নয়, সবাইকে নিয়েই তাকে বসবাস করতে হয়। মানুষের প্রকৃতিই হচ্ছে সমাজে বেঁচে থাকার জন্য একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হয়, একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হয়। তবে যদিওবা মানুষের সহযোগিতার জরুরতকে স্বীকার করা হতো, এটাও দাবি করা হতো যে কিছুটা বিধিনিষেধ না থাকলে সহযোগিতার বিষয়টিও ঘটত না। মানুষ প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন, বর্বর এবং তীব্র বাসনা দ্বারা তাড়িত। একা একা ছেড়ে দিলে মানুষ নির্মমভাবে কেবল নিজের স্বার্থের পেছনেই ছুটবে। হবসের মতো পশ্চিমের চিন্তকরা যেভাবে মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থাকে কদর্য ও নিষ্ঠুর বলে বিবেচনা করতেন, তার সঙ্গে তৎকালের মুসলিম চিন্তকদের চিন্তার মিল খুঁজে পান গবেষকরা। এমন অবস্থা থেকে আইন/ল জরুরি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এসব রোধ করার জন্য এক ধরনের কর্তৃত্ব বা অথরিটি প্রয়োজন। এটা অনিবার্য। তবে খালদুনের মধ্যে এর কিছুটা বিপরীত ভাবনাও দেখতে পাব। খালদুন মনে করতেন, মানুষ যত প্রকৃতির কাছে থাকে, ততদিন সে খাঁটি থাকে, তার উচ্চ চরিত্রের অধিকারী থাকে, শহুরে জীবন যাপন তাকে উল্টো নষ্ট করে। খালদুনও যখন সমাজ পাঠে প্রবেশ করেন তখন তারও দুটো পূর্বানুমান ছিল। প্রথমত, তিনি মানবসমাজকে দরকারি বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। মানুষের সাহচর্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের মিলেমিশে বসবাসের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি এটা সহযোগিতার প্রতি তাদের সহজাত প্রবণতা থেকেও আসে। দ্বিতীয়ত, খালদুন মনে করতেন মানুষ ও সমাজ ভৌত পরিবেশ ও ভূগোল দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে মানুষ যেহেতু পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং তাদের চিন্তা করার সক্ষমতা বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশল ও জীবনধারণের নানা উপায় উদ্ভাবন ঘটায়, সেহেতু একেক পরিবেশ একেক ধরনের জীবনধারণের উপায় তৈরি করে। খালদুন এই মোড অব লিভিংয়ের ভিত্তিতে দুই ধরনের সামাজিক জীবনের ধারণা হাজির করেছিলেন: উমরান বাদাউই, মানে গ্রামীণ ও সহজ সংস্কৃতি এবং উমরান হাদারি, মানে শহুরে ও জটিল সংস্কৃতি। এই দুটো ধারণা দিয়ে তিনি যাযাবর (নোমাডিক) জীবন ও সেডেন্টারি বা স্থায়ীভাবে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারীদের জীবনযাপনের পার্থক্যকে নির্দেশ করেন। উমরান বাদাউই দিয়ে মোটাদাগে যাযাবর, আধা-যাযাবর, বেদুইন, শহর থেকে দূরে পাহাড়-পর্বতে বসবাসকারীদের বোঝানো হয়েছে, অন্যদিকে উমরান হাদারি দিয়ে শহুরে, আধা-শহুরে বা নগরবাসীর জীবনযাপন ও সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়েছিল। তার কাছে এ দুই জীবনের মধ্যে একধরনের ধারাবাহিকতা আছে। যেহেতু শহরগুলোর বাসিন্দারা বেদুইন সমাজ থেকে আসা, সেহেতু যাযাবর বা বেদুইন সমাজ হচ্ছে শহুরে জীবনের অগ্রদূত।
সমাজের উপর্যুক্ত দুই রূপের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে ইবনে খালদুনের পুরো ইতিহাস ও সমাজচিন্তাজুড়ে বিরাজ করছে। এ দুই সমাজ সম্পর্কে তার পূর্বানুমানগুলো অন্যান্য সিদ্ধান্তে পৌঁছার প্রধান সিঁড়ি। আমাদের কাছে এগুলো তার রাষ্ট্র ও সমাজভাবনার মূলসূত্র। খালদুনের মতে, সেডেন্টারি বা শহুরে বাসিন্দাদের তুলনায় যাযাবর বা বেদুইনরা নৈতিকভাবে ভালো। কেননা আত্মার জন্ম হয় প্রাকৃতিক অবস্থায়, কিন্তু সামাজিকায়নের মাধ্যমে ভালো-মন্দ আয়ত্ত করে। বেদুইনরা তুলনামূলকভাবে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি বসবাস করেন। প্রয়োজনের বেশি তারা কিছু ব্যবহার করেন না। তাদের আত্মা কম কলুষিত। বেদুইনদের কঠিন পরিস্থিতিতে বসবাস করতে হয়, ফলে তারা যেমন মানসিক, শারীরিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী ও দৃঢ? হন তেমনি উন্নত চরিত্রেরও অধিকারী হন। অন্যদিকে শহুরে বাসিন্দারা বিলাসী ও দুনিয়াবি চাকচিক্যের মধ্যে বসবাস করার ফলে তাদের আত্মা খুব তাড়াতাড়ি কলুষিত হয়ে পড়ে। তাদের সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকায় তাদের জিন্দেগি তুলনামূলকভাবে সহজ। এ কারণে বেদুইনদের তুলনায় তারা ভীরু ও কম সাহসী। তারা নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতে পারেন না, সুরক্ষার জন্য উচ্চ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন পড়ে। এদের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সহজে বশ করা যায়। অন্যদিকে বেদুইনরা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরাই করেন।
ইবনে খালদুনের মতে, আইনের ওপর অতিনির্ভরশীলতা সেডেন্টারি বা শহুরে বাসিন্দাদের আরেকটি সমস্যা। এ সমাজের প্রকৃতিই এমন যে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ওপর সংখ্যালঘু আধিপত্য বিস্তার করে। যখন এ আধিপত্যের সঙ্গে ভীতি ও জুলুম যুক্ত হয়, তখন এটা সাধারণ মানুষের বীরত্ব ও প্রতিরোধের দৃঢ?তাকে ধ্বংস করে দেয়। শাস্তি হিসেবে আইন প্রয়োগ জনগোষ্ঠীর সাহসিকতাকে কমিয়ে দেয়, কেননা এটা বেইজ্জতি ঘটায়। যে আইনগুলো মানুষকে শিক্ষা ও নির্দেশনা দেয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোও অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষের সাহসিকতাকে হ্রাস করতে পারে, কারণ মানুষ নিজস্ব সক্ষমতার চেয়ে ওই আইনকানুনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ খালদুন বারবার এর সঙ্গে সাহসিকতার দিকে ইঙ্গিত করেন। নৈতিকতা ও সাহসিকতার জন্য খালদুন শহুরে বাসিন্দাদের তুলনায় বেদুইনদের তারিফ করেন। এমনকি বেদুইনদের গোষ্ঠী সংহতি প্রবল।
এ গোষ্ঠী সংহতি বা আসাবিয়া হচ্ছে খালদুনের সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনার দ্বিতীয় কিন্তু সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। মুকাদ্দিমার একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে আসাবিয়া: মরুভূমির কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে বেদুইন বা যাযাবর গোত্রগুলোর ভেতর যে সংহতি গড়ে ওঠে। মধ্যযুগের আরবি অভিধান অনুযায়ী, আসাবিয়া মানে হচ্ছে ‘একটি শক্ত বন্ধন যা কয়েকজন ব্যক্তিকে সমস্বার্থ বা মতের ভিত্তিতে একত্র করেছে’। খালদুন-গবেষক রবার্ট আরউইন বলেন, ‘মরুভূমির বাসিন্দারা যে ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন সেটাকেই খালদুন আসাবিয়া বিবেচনা করেছিলেন।’ যাযাবরদের মধ্যকার পরস্পর-নির্ভরশীলতার কথা আরো অনেকে বলেছেন। বেদুইনরা গোত্রভিত্তিক সমাজে বসবাস করতেন। সে সমাজে সবাই কোনো না কোনোভাবে আত্মীয় বা রক্তের বন্ধন দ্বারা আবদ্ধ। যেকোনো প্রয়োজনে ব্যক্তি তার গোত্রের পাশেই দাঁড়ায়, ব্যক্তির পাশেও গোত্র দাঁড়ায়। গোত্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ব্যক্তি-আনুগত্যের চেয়ে বেশি থাকে। মরুভূমিতে আসলে এ কাঠামোর বাইরে কোনো ব্যক্তি নিরাপত্তা নেই। খালদুন একজন এথনোগ্রাফারের মতো মরুভূমির বাসিন্দাদের ভেতরকার এ সংহতিকে খেয়াল করেছেন এবং বলা যায়, একে তত্ত্বায়নও করেছেন।
ইবনে খালদুনের কাছে আসাবিয়া হচ্ছে সাধারণ হেতু ও নিয়তির বোধ, কুটুম্বিতার ওপর নির্ভরশীল আনুগত্যের বাঁধন; তবে কুটুম্বিতাই একমাত্র নয়। আসাবিয়া শক্তিশালী হবে নাকি দুর্বল হবে সেটা যেমন প্রধানত নির্ভর করে কুটুম্বিতার ওপর, তেমনি ধর্মও শক্তিশালী সংহতি তৈরি করতে পারে। আবার আসাবিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের মতো দিকগুলো জড়িত রয়েছে।
ইবনে খালদুনের চিন্তায় আরেকটি গুরুত্বভাবনা হচ্ছে রাজকীয় কর্তৃত্ব বা মুলক; আমরা একে রাষ্ট্রও বলতে পারি। লিডারশিপের সঙ্গে মুলকের পার্থক্য রয়েছে। নেতা বা লিডার তার শাসন মানার জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন না, কিন্তু যিনি মুলক প্রতিষ্ঠা করবেন তার সেই সক্ষমতা আছে। তার সেই সক্ষমতা আসবে আসাবিয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ রাজকীয় কর্তৃত্ব অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে নেতাকে তার অনুসারীরা মেনে চলবে; এ মেনে নেয়ার বিষয়টি ঘটে আসাবিয়ার কারণে।
ইবনে খালদুনের কাছে আসাবিয়া কোনো স্থিতিশীল ঘটনা নয়, বরং এটা গতিশীল। এটা কোনো একটি যাযাবর বা বেদুইন গোষ্ঠীকে ক্ষমতা বা মুলক প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়। সেদিক থেকে আসাবিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য বা অভিমুখ হচ্ছে ফধষিধয বা রাজ্য কিংবা ডাইনেস্টি বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আসাবিয়া ধারণার সঙ্গে উপর্যুক্ত দুই সামাজিক জীবনের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে; অথবা আমরা বলতে পারি, আসাবিয়ার কারণেই এক সমাজ থেকে আরেক সমাজের উত্তরণ/অবনমন ঘটে।
যাযাবর বা বেদুইনদের মধ্যে এ গোষ্ঠী সংহতি বা আসাবিয়া শক্তিশালী থাকে। তাদের মধ্যকার যে একতা ও পরস্পর-নির্ভরশীলতা, সেটা ওই সংহতির কারণেই। যে নেতা যথেষ্ট শক্তি ও ক্ষমতাবান গোত্রের আসাবিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি একটি মুলক তৈরি করে ফেলতে পারেন। বেদুইনদের দৃঢ? নৈতিকতা, সাহসিকতার সঙ্গে আসাবিয়ার যুক্ততা তাদের সামরিক সুবিধা প্রদান করেছিল। ফলে শক্তিশালী আসাবিয়া সংবলিত বেদুইনরা অলস শহুরে ‘সিভিলাইজেশন’ বা সভ্যতাকে দখল করে নতুন মুলক বা কর্তৃত্ব স্থাপন করে। কিন্তু কয়েক বছর পর শক্তিশালী বেদুইনরা শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, অলস হয়ে পড়েন, তাদের সামরিক, রাজনৈতিক ও চারিত্রিক দৃঢতা হারিয়ে যায়। তাদের আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। সহজ নাগরিক জীবন তাদের অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। বেদুইন থাকা অবস্থায় তারা যেভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে পারতেন, এখন আর সেটা করতে পারেন না। ফলে প্রতিরক্ষার জন্য নির্ভর করতে হয় ভাড়াটে সৈনিকের ওপর। এ সৈনিকদের বেতন-ভাতার জন্য এমন কর আরোপ করা হয় যা জনগণের জন্য জুলুম হয়ে ওঠে। মুলককে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপচয়কারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং পুরো শাসন ব্যবস্থা নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রায় তিন-চার প্রজন্ম বা ১০০-১২০ বছরের মাথায় তারা আরেকটি শক্তিশালী আসাবিয়া সংবলিত বেদুইন শক্তির কাছে পরাজিত হন। উত্থান-পতনের এ চক্র এভাবেই চলতে থাকে। ইবনে খালদুনের বিখ্যাত চক্রাকার ইতিহাস-তত্ত্বের এটাই গোড়ার কথা। খালদুন এই যে মডেল বা উত্থান-পতনের তত্ত্ব দিয়েছিলেন সেটাকে ইসলামের প্রথম যুগের শাসনামল, মধ্যযুগের উত্তর আফ্রিকার ইতিহাস, একাদশ-দ্বাদশ শতকের আলমোরাভিদদের উত্থান-পতনে প্রয়োগ করা যায়। আসাবিয়ার অবক্ষয় দুভাবে ঘটতে পারে। প্রথমত, ক্ষমতা গ্রহণের বা মুলক প্রতিষ্ঠার এক প্রজন্মের পরই দেখা যায় আগের সেই বেদুইন সমাজে শহুরে সংস্কৃতি ঢুকে পড়ছে, একদিকে বিলাসিতা অন্যদিকে আলস্য তাদের ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্যে এক ধরনের হায়ার্কি দেখা দেয়, বিভিন্ন দপ্তরের বিভিন্ন পদে একেকজন আসীন হন। আগে যেখানে সবাই একত্রে গৌরবের অংশীদার থাকতেন, এখন কেবল রাজাই সেই গৌরবের অধিকারী হন। এভাবে ধীরে ধীরে সংহতি কমতে থাকে এবং তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মে একেবারে শূন্যের কোটায় চলে যায়। অর্থাৎ ইবনে খালদুন বিলাসিতাকে আসাবিয়ার অবক্ষয়ের গুরুতর কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন। দ্বিতীয়ত, রাজা বা ক্ষমতাসীন গোত্রপ্রধান যখন নিজের পরিবার ও গোত্রের লোকদের সম্ভাব্য গদি দখলকারী বিবেচনা করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দপ্তর থেকে সরিয়ে নেন, তখন তিনি আসলে জনগণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাসিল করেন। কিন্তু গোত্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব ভাগাভাগি না করে কেবল নিজের নামেই রাজকীয় কর্তৃত্ব কায়েম করেন। তিনি তখন নিজেদের লোকদের ওপর ভরসা না করে অন্যান্য গোত্রের লোকদের ভাড়া করেন। ফলে একধরনের পৃষ্ঠপোষক-খরিদ্দার সম্পর্ক তৈরি হয়। কুটুম্বিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় শক্তিশালী আসাবিয়ার আরেকটি বেদুইন গোত্র সেটা দখল করে নতুন রাজ্যের পত্তন ঘটায়।
খালদুন রাজকীয় কর্তৃত্ব বা করহমংযরঢ়-কে সহজাত ও অনিবার্য বলে মনে করতেন। এর পেছনে প্রধান যুক্তি হচ্ছে মানুষকে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ-ফ্যাসাদ মেটানোর জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাউকে প্রয়োজন হয়। যার শক্তিশালী আসাবিয়া রয়েছে তিনি সেটা করতে পারবেন। আমরা দেখেছি, রাজকীয় কর্তৃত্ব বা তৎকালীন অথরিটির সঙ্গে আসাবিয়ার সম্পর্কটি জটিল। একদিকে আসাবিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে মুলক বা রাষ্ট্র স্থাপন করা, অন্যদিকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে সেটা জনগণের আসাবিয়াকে নষ্ট করে ফেলে। তার মতে, রাজকীয় কর্তৃত্ব মানেই হচ্ছে ক্ষমতাবলে বা শক্তিবলে শাসন; ওয়েবারের রাষ্ট্রের সংজ্ঞার মতোই। যখন জনগণের আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে তখন কর্তাব্যক্তিরা সহজে শাসন করতে পারেন। তদপুরি আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়লে দিনশেষে খোদ রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মিল-অমিল-প্রভাব খালদুনের চিন্তায় মোড অব লিভিংয়ের ভিত্তিতে সমাজকে ভাগ করা, গোষ্ঠী সংহতি এবং ইতিহাসের চক্রীয় মডেল সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। খালদুন-পরবর্তী বহু চিন্তক খালদুন দ্বারা যেমন প্রভাবিত হয়েছিলেন, তেমনি খালদুনের চিন্তার এ উপাদানগুলোকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক জমানাতেও অনেকে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন নিয়ে যখন ইতিহাস লিখেছেন তখন তারা খালদুনের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের চক্রাকার মডেলকে গ্রহণ করেছেন। যেমন চক্রাকার তত্ত্বের হদিস পাওয়া যায় ওসওয়াল্ড স্পেংলারের দ্য ডিক্লাইন অব দ্য ওয়েস্ট গ্রন্থে। খালদুনের মতো স্প্লেংলারও শহুরে জীবনযাপন ও সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ ছিলেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি খালদুন দ্বারা প্রচ- প্রভাবিত ছিলেন। খালদুনের সন্ধান পেয়ে টয়েনবি রীতিমতো পুলকিত বোধ করেছিলেন। নৈরাশ্যবাদকে ইতিহাসের চক্রীয় তত্ত্বগুলোর একটি বৈশিষ্ট্যই বলে মনে করা হয়। খালদুন গবেষকরা বলেন, অবশ্য খালদুনের যুগ-বৈশিষ্ট্য। খালদুন যে পরিস্থিতিতে লেখালেখি করছিলেন, তখন একদিকে চলছিল রাজবংশগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতা, অন্যদিকে মহামারীতে স্বজন হারানোর ধাক্কা। আরবদের গৌরবময় দিনগুলো তখন শেষ হওয়ার পথে। চতুর্দশ শতাব্দীর আরব দুনিয়ার কোনো বাসিন্দার লেখালেখিতে নৈরাশ্যবাদী উপাদান বা ‘যায় দিন ভালো’ ধরনের মনোভঙ্গি থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল বলে ধরে নেয়া হয়। ইবনে খালদুনের সঙ্গে পনেরো শতকের ইতালীয় দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির তুলনা করা হয়। খালদুনকে যেমন এক জটিল রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল, ম্যাকিয়াভেলিকেও করতে হয়েছিল। দুজনকে তৎকালীন রাজ্যের কূটনৈতিক মিশনে অংশ নিতে হয়েছিল। মুকাদ্দিমার মতো দ্য প্রিন্সে ইতিহাস ছিল কেন্দ্রীয় গুরুত্বের জায়গায়। রাজনীতির জন্য ইতিহাসের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়েছিল। মুকাদ্দিমার মতো দ্য প্রিন্সও বিষণ্ন ও নৈরাশ্যবাদী কাজ। তবে দুজনের মধ্যে অমিলও প্রচুর। ম্যাকিয়াভেলির কাছে ইতিহাস অধ্যয়ন রাজ্যপরিচালনার জন্য দিকনির্দেশনা প্রদানের নিমিত্তে, খালদুন ইতিহাসের বাতেনি রূপ ধরতে চেয়েছিলেন। ম্যাকিয়াভেলি শাসনের মনস্তত্ত্ব, গৌরবের সন্ধান এবং উচ্চ রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়ে আগ্রহী হলেও খালদুন এসব নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। দ্য প্রিন্সে-এ ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার বিষয়ে ‘সুযোগ’-এর ওপর জোর দেয়া হয়েছিল। ম্যাকিয়াভেলির কাছে শাসনের প্রয়োজনে অনৈতিক আচরণ করার যৌক্তিকতা ছিল, কিন্তু খালদুন এক্ষেত্রে প্রচ- নৈতিকবাদী।
সহুল আহমদ: গবেষক ও লেখক

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ৬৪ জেলায় সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রমের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের

ইবনে খালদুনের রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা

আপডেট সময় ০৩:২৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

চৌদ্দ শতকের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইবনে খালদুনের নামের সঙ্গে ইতিহাসবেত্তা, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সুফি এবং সর্বোপরি একজন দার্শনিক সব উপাধি জড়িয়ে আছে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৩৩২ সালে আফ্রিকার তিউনিসে।
১৩৪৮ সালে উত্তর আফ্রিকায় ভয়াবহ প্লেগ মহামারী শুরু হলে পিতা-ভাইসহ বহু বন্ধুবান্ধব হারান। এ মহামারী ও ধ্বংসস্তূপ ইবনে খালদুনের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়, যার প্রভাব বিভিন্নভাবে তার কাজে ছড়িয়ে পড়ে। খালদুন তার জীবনে তৎকালীন বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। উত্তর আফ্রিকায় সিংহাসন নিয়ে যে লড়াই সেখানে খালদুন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে নিজেকে হাজির করেছিলেন। তার এ রোমাঞ্চকর জীবন থেকে কিছুদিন বিরাম নিয়ে ১৩৭৫ সালে পশ্চিম আলজেরিয়ার ক্বালাত বানু সালামে বিখ্যাত মুকাদ্দিমা গ্রন্থ লেখা শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের শিকার হয়ে ১৩৮৩ সালে মিসরের কায়রো গমন করেন। সেখানেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৪০৬ সালে খালদুন ইন্তেকাল করেন।
মুকাদ্দিমা ও ইতিহাসবিদদের ভুল
মুকাদ্দিমা হচ্ছে ইবনে খালদুনের সবচেয়ে মশহুর গ্রন্থ। নানা ভাষায় অনূদিত এ গ্রন্থের ওপরই বলা যায় খালদুনের যাবতীয় সুখ্যাতি নির্ভরশীল। মূলত তার বিশালকায় ইতিহাসের কিতাব ‘ইবার’র ভূমিকা হচ্ছে এ মুকাদ্দিমা। এটাকে তার তাত্ত্বিক প্রস্তাব বলা যেতে পারে: তিনি যে দীর্ঘ ইতিহাস লিখতে যাচ্ছেন, সেটার গুরুত্ব কী, কেনইবা সেটা অন্যদের চেয়ে আলাদা, আগের কাজগুলোর দুর্বলতা কী—মূলত এসব নিয়েই তিনি বাৎচিত করেছেন। মোটাদাগে ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত ই দীর্ঘ তাত্ত্বিক প্রস্তাবে তিনি মানবসমাজ, রাষ্ট্র, খেলাফত, সাম্রাজ্য, যাযাবরীয় সমাজ, নগরভিত্তিক সমাজ, বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত কলাকৌশল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
মুকাদ্দিমার শুরুতেই খালদুন প্রশ্ন তুলেছেন, ইতিহাসবিদরা কেন ভুল করেন। এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে মুখবন্ধে তিনি ইতিহাসের দুটো স্তরের কথা বলেন: উপরিভাগ ও অন্তর্নিহিত অর্থ। তিনি যা বলেন তা সংক্ষেপে হচ্ছে এমন, উপরিভাগে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা, ডাইনেস্টি ও সুদূর অতীতের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ থাকে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কর্মকা- সম্পর্কে জ্ঞাত করা এবং আমজনতাকে বিনোদন দেয়া। এটা দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বিষয় ও বস্তু সবকিছু নিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে; কীভাবে রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব ঘটছে ও কীভাবে তার পতন ঘটছে। অন্যদিকে ইতিহাসের অন্তর্নিহিত অর্থের ভেতর ঘটনার পূর্বাপর, কারণ, বিকাশ ও বিনাশের মৌলিক উপাদান ও সত্য খোঁজার তাগিদ থাকে। একটা ঘটনা ঘটার পেছনে কারণ কী? কোন কোন বাস্তবিক পরিস্থিতি ঘটনার জন্ম দিয়েছে? এর আসল উদ্দেশ্য কী? ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার এ দুই স্তরের সঙ্গে সহজেই মার্ক্সীয় পরিভাষার ‘উপরিকাঠামো’ (superstructure) ও ‘ভিত্তিকাঠামো’র (base /or substructure) মিল খুঁজে পাওয়া যায়; এবং কোনো কোনো খালদুন-গবেষক খালদুনকে মার্ক্সের পূর্বসূরি হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। আবার অনেকে খালদুনের এমন ভাবনার ওপর তার সুফিবাদী দর্শনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। অ্যালেন ফ্রমহের্জ তার ইতিহাস দর্শনের গঠনে সুফিবাদের ভূমিকার ওপর জোরারোপ করেছেন। তার মতে, ইতিহাসের অন্তর্নিহিত সত্য অনুসন্ধানের সঙ্গে সুফিবাদী দর্শন সমান্তরাল। খালদুনের ইতিহাসের দুই স্তরকে সুফিবাদী ভাষায় বলা যায়, জাহেরি ও বাতেনি স্তর। সুফিবাদই ঐতিহাসিক ঘটনার জাহেরি অবস্থানকে ছাড়িয়ে ঘটনাগুলোর বাতেনি অবস্থানের দিকে নজর দিতে উৎসাহ দিয়েছিল। খালদুন এটাও বলেন, ঐতিহ্য/প্রথার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস মানুষের স্বভাবজাত এবং এটা ইতিহাসবিদ্যার জন্য মোটেও ফায়দাকর নয়।
ইতিহাসবিদরা কেন ভুল করেন—এ প্রশ্নের উত্তরে খালদুন মোট সাত ধরনের ভুলের কথা বলেন। এক. কোনো একটা মত বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক মনোভাব ইতিহাসবিদকে ভুল পথে পরিচালিত করে। দুই. ইসলামের ইতিহাসে ধারা বর্ণনাকারীর গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল। বিশেষ করে হাদিসের শুদ্ধতা নির্ধারণে এটা খুব কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। খালদুনের দ্বিতীয় আপত্তি হচ্ছে এটা নিয়েই: এদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও ভুলের একটা কারণ। তিন. ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেখবর থাকা। চার. ভ্রান্ত পূর্বানুমানের ভিত্তিতে সত্যে পৌঁছার চেষ্টা করা। পাঁচ. বাস্তবতার সঙ্গে পরিস্থিতি কীভাবে খাপ খাচ্ছে সে বিষয়ে অজ্ঞ থাকা। ছয়. শাসকগোষ্ঠী ও উচ্চাসনের পদাধিকারদের খুশি করার মনোবাসনা। সাত. মানবসমাজের অবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে বেখবর থাকা। অর্থাৎ মোটাদাগে পক্ষপাতিত্ব, সহজে কোনো কিছুকে সত্য বলে মেনে নেয়ার ঝোঁক এবং অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে ধরতে ব্যর্থ হওয়াটাই ইতিহাসবিদকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে। ফলে খালদুনের সমাজ সম্পর্কে অধ্যয়নও ইতিহাসের সত্য খুঁজে বের করার বাসনা থেকে।
সামাজিক জীবন, রাষ্ট্র ও আসাবিয়া সমাজের দরকার কী? তৎকালের অন্য দার্শনিকদের মতো মুসলিম দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকরাও সমাজের জরুরতকে স্বীকার করতেন। মানুষ একা একা যথেষ্ট নয়, সবাইকে নিয়েই তাকে বসবাস করতে হয়। মানুষের প্রকৃতিই হচ্ছে সমাজে বেঁচে থাকার জন্য একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হয়, একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হয়। তবে যদিওবা মানুষের সহযোগিতার জরুরতকে স্বীকার করা হতো, এটাও দাবি করা হতো যে কিছুটা বিধিনিষেধ না থাকলে সহযোগিতার বিষয়টিও ঘটত না। মানুষ প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন, বর্বর এবং তীব্র বাসনা দ্বারা তাড়িত। একা একা ছেড়ে দিলে মানুষ নির্মমভাবে কেবল নিজের স্বার্থের পেছনেই ছুটবে। হবসের মতো পশ্চিমের চিন্তকরা যেভাবে মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থাকে কদর্য ও নিষ্ঠুর বলে বিবেচনা করতেন, তার সঙ্গে তৎকালের মুসলিম চিন্তকদের চিন্তার মিল খুঁজে পান গবেষকরা। এমন অবস্থা থেকে আইন/ল জরুরি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এসব রোধ করার জন্য এক ধরনের কর্তৃত্ব বা অথরিটি প্রয়োজন। এটা অনিবার্য। তবে খালদুনের মধ্যে এর কিছুটা বিপরীত ভাবনাও দেখতে পাব। খালদুন মনে করতেন, মানুষ যত প্রকৃতির কাছে থাকে, ততদিন সে খাঁটি থাকে, তার উচ্চ চরিত্রের অধিকারী থাকে, শহুরে জীবন যাপন তাকে উল্টো নষ্ট করে। খালদুনও যখন সমাজ পাঠে প্রবেশ করেন তখন তারও দুটো পূর্বানুমান ছিল। প্রথমত, তিনি মানবসমাজকে দরকারি বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। মানুষের সাহচর্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের মিলেমিশে বসবাসের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি এটা সহযোগিতার প্রতি তাদের সহজাত প্রবণতা থেকেও আসে। দ্বিতীয়ত, খালদুন মনে করতেন মানুষ ও সমাজ ভৌত পরিবেশ ও ভূগোল দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে মানুষ যেহেতু পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং তাদের চিন্তা করার সক্ষমতা বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশল ও জীবনধারণের নানা উপায় উদ্ভাবন ঘটায়, সেহেতু একেক পরিবেশ একেক ধরনের জীবনধারণের উপায় তৈরি করে। খালদুন এই মোড অব লিভিংয়ের ভিত্তিতে দুই ধরনের সামাজিক জীবনের ধারণা হাজির করেছিলেন: উমরান বাদাউই, মানে গ্রামীণ ও সহজ সংস্কৃতি এবং উমরান হাদারি, মানে শহুরে ও জটিল সংস্কৃতি। এই দুটো ধারণা দিয়ে তিনি যাযাবর (নোমাডিক) জীবন ও সেডেন্টারি বা স্থায়ীভাবে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারীদের জীবনযাপনের পার্থক্যকে নির্দেশ করেন। উমরান বাদাউই দিয়ে মোটাদাগে যাযাবর, আধা-যাযাবর, বেদুইন, শহর থেকে দূরে পাহাড়-পর্বতে বসবাসকারীদের বোঝানো হয়েছে, অন্যদিকে উমরান হাদারি দিয়ে শহুরে, আধা-শহুরে বা নগরবাসীর জীবনযাপন ও সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়েছিল। তার কাছে এ দুই জীবনের মধ্যে একধরনের ধারাবাহিকতা আছে। যেহেতু শহরগুলোর বাসিন্দারা বেদুইন সমাজ থেকে আসা, সেহেতু যাযাবর বা বেদুইন সমাজ হচ্ছে শহুরে জীবনের অগ্রদূত।
সমাজের উপর্যুক্ত দুই রূপের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে ইবনে খালদুনের পুরো ইতিহাস ও সমাজচিন্তাজুড়ে বিরাজ করছে। এ দুই সমাজ সম্পর্কে তার পূর্বানুমানগুলো অন্যান্য সিদ্ধান্তে পৌঁছার প্রধান সিঁড়ি। আমাদের কাছে এগুলো তার রাষ্ট্র ও সমাজভাবনার মূলসূত্র। খালদুনের মতে, সেডেন্টারি বা শহুরে বাসিন্দাদের তুলনায় যাযাবর বা বেদুইনরা নৈতিকভাবে ভালো। কেননা আত্মার জন্ম হয় প্রাকৃতিক অবস্থায়, কিন্তু সামাজিকায়নের মাধ্যমে ভালো-মন্দ আয়ত্ত করে। বেদুইনরা তুলনামূলকভাবে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি বসবাস করেন। প্রয়োজনের বেশি তারা কিছু ব্যবহার করেন না। তাদের আত্মা কম কলুষিত। বেদুইনদের কঠিন পরিস্থিতিতে বসবাস করতে হয়, ফলে তারা যেমন মানসিক, শারীরিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী ও দৃঢ? হন তেমনি উন্নত চরিত্রেরও অধিকারী হন। অন্যদিকে শহুরে বাসিন্দারা বিলাসী ও দুনিয়াবি চাকচিক্যের মধ্যে বসবাস করার ফলে তাদের আত্মা খুব তাড়াতাড়ি কলুষিত হয়ে পড়ে। তাদের সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকায় তাদের জিন্দেগি তুলনামূলকভাবে সহজ। এ কারণে বেদুইনদের তুলনায় তারা ভীরু ও কম সাহসী। তারা নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতে পারেন না, সুরক্ষার জন্য উচ্চ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন পড়ে। এদের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সহজে বশ করা যায়। অন্যদিকে বেদুইনরা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরাই করেন।
ইবনে খালদুনের মতে, আইনের ওপর অতিনির্ভরশীলতা সেডেন্টারি বা শহুরে বাসিন্দাদের আরেকটি সমস্যা। এ সমাজের প্রকৃতিই এমন যে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ওপর সংখ্যালঘু আধিপত্য বিস্তার করে। যখন এ আধিপত্যের সঙ্গে ভীতি ও জুলুম যুক্ত হয়, তখন এটা সাধারণ মানুষের বীরত্ব ও প্রতিরোধের দৃঢ?তাকে ধ্বংস করে দেয়। শাস্তি হিসেবে আইন প্রয়োগ জনগোষ্ঠীর সাহসিকতাকে কমিয়ে দেয়, কেননা এটা বেইজ্জতি ঘটায়। যে আইনগুলো মানুষকে শিক্ষা ও নির্দেশনা দেয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোও অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষের সাহসিকতাকে হ্রাস করতে পারে, কারণ মানুষ নিজস্ব সক্ষমতার চেয়ে ওই আইনকানুনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ খালদুন বারবার এর সঙ্গে সাহসিকতার দিকে ইঙ্গিত করেন। নৈতিকতা ও সাহসিকতার জন্য খালদুন শহুরে বাসিন্দাদের তুলনায় বেদুইনদের তারিফ করেন। এমনকি বেদুইনদের গোষ্ঠী সংহতি প্রবল।
এ গোষ্ঠী সংহতি বা আসাবিয়া হচ্ছে খালদুনের সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনার দ্বিতীয় কিন্তু সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। মুকাদ্দিমার একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে আসাবিয়া: মরুভূমির কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে বেদুইন বা যাযাবর গোত্রগুলোর ভেতর যে সংহতি গড়ে ওঠে। মধ্যযুগের আরবি অভিধান অনুযায়ী, আসাবিয়া মানে হচ্ছে ‘একটি শক্ত বন্ধন যা কয়েকজন ব্যক্তিকে সমস্বার্থ বা মতের ভিত্তিতে একত্র করেছে’। খালদুন-গবেষক রবার্ট আরউইন বলেন, ‘মরুভূমির বাসিন্দারা যে ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন সেটাকেই খালদুন আসাবিয়া বিবেচনা করেছিলেন।’ যাযাবরদের মধ্যকার পরস্পর-নির্ভরশীলতার কথা আরো অনেকে বলেছেন। বেদুইনরা গোত্রভিত্তিক সমাজে বসবাস করতেন। সে সমাজে সবাই কোনো না কোনোভাবে আত্মীয় বা রক্তের বন্ধন দ্বারা আবদ্ধ। যেকোনো প্রয়োজনে ব্যক্তি তার গোত্রের পাশেই দাঁড়ায়, ব্যক্তির পাশেও গোত্র দাঁড়ায়। গোত্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ব্যক্তি-আনুগত্যের চেয়ে বেশি থাকে। মরুভূমিতে আসলে এ কাঠামোর বাইরে কোনো ব্যক্তি নিরাপত্তা নেই। খালদুন একজন এথনোগ্রাফারের মতো মরুভূমির বাসিন্দাদের ভেতরকার এ সংহতিকে খেয়াল করেছেন এবং বলা যায়, একে তত্ত্বায়নও করেছেন।
ইবনে খালদুনের কাছে আসাবিয়া হচ্ছে সাধারণ হেতু ও নিয়তির বোধ, কুটুম্বিতার ওপর নির্ভরশীল আনুগত্যের বাঁধন; তবে কুটুম্বিতাই একমাত্র নয়। আসাবিয়া শক্তিশালী হবে নাকি দুর্বল হবে সেটা যেমন প্রধানত নির্ভর করে কুটুম্বিতার ওপর, তেমনি ধর্মও শক্তিশালী সংহতি তৈরি করতে পারে। আবার আসাবিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের মতো দিকগুলো জড়িত রয়েছে।
ইবনে খালদুনের চিন্তায় আরেকটি গুরুত্বভাবনা হচ্ছে রাজকীয় কর্তৃত্ব বা মুলক; আমরা একে রাষ্ট্রও বলতে পারি। লিডারশিপের সঙ্গে মুলকের পার্থক্য রয়েছে। নেতা বা লিডার তার শাসন মানার জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন না, কিন্তু যিনি মুলক প্রতিষ্ঠা করবেন তার সেই সক্ষমতা আছে। তার সেই সক্ষমতা আসবে আসাবিয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ রাজকীয় কর্তৃত্ব অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে নেতাকে তার অনুসারীরা মেনে চলবে; এ মেনে নেয়ার বিষয়টি ঘটে আসাবিয়ার কারণে।
ইবনে খালদুনের কাছে আসাবিয়া কোনো স্থিতিশীল ঘটনা নয়, বরং এটা গতিশীল। এটা কোনো একটি যাযাবর বা বেদুইন গোষ্ঠীকে ক্ষমতা বা মুলক প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়। সেদিক থেকে আসাবিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য বা অভিমুখ হচ্ছে ফধষিধয বা রাজ্য কিংবা ডাইনেস্টি বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আসাবিয়া ধারণার সঙ্গে উপর্যুক্ত দুই সামাজিক জীবনের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে; অথবা আমরা বলতে পারি, আসাবিয়ার কারণেই এক সমাজ থেকে আরেক সমাজের উত্তরণ/অবনমন ঘটে।
যাযাবর বা বেদুইনদের মধ্যে এ গোষ্ঠী সংহতি বা আসাবিয়া শক্তিশালী থাকে। তাদের মধ্যকার যে একতা ও পরস্পর-নির্ভরশীলতা, সেটা ওই সংহতির কারণেই। যে নেতা যথেষ্ট শক্তি ও ক্ষমতাবান গোত্রের আসাবিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি একটি মুলক তৈরি করে ফেলতে পারেন। বেদুইনদের দৃঢ? নৈতিকতা, সাহসিকতার সঙ্গে আসাবিয়ার যুক্ততা তাদের সামরিক সুবিধা প্রদান করেছিল। ফলে শক্তিশালী আসাবিয়া সংবলিত বেদুইনরা অলস শহুরে ‘সিভিলাইজেশন’ বা সভ্যতাকে দখল করে নতুন মুলক বা কর্তৃত্ব স্থাপন করে। কিন্তু কয়েক বছর পর শক্তিশালী বেদুইনরা শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, অলস হয়ে পড়েন, তাদের সামরিক, রাজনৈতিক ও চারিত্রিক দৃঢতা হারিয়ে যায়। তাদের আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। সহজ নাগরিক জীবন তাদের অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। বেদুইন থাকা অবস্থায় তারা যেভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে পারতেন, এখন আর সেটা করতে পারেন না। ফলে প্রতিরক্ষার জন্য নির্ভর করতে হয় ভাড়াটে সৈনিকের ওপর। এ সৈনিকদের বেতন-ভাতার জন্য এমন কর আরোপ করা হয় যা জনগণের জন্য জুলুম হয়ে ওঠে। মুলককে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপচয়কারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং পুরো শাসন ব্যবস্থা নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রায় তিন-চার প্রজন্ম বা ১০০-১২০ বছরের মাথায় তারা আরেকটি শক্তিশালী আসাবিয়া সংবলিত বেদুইন শক্তির কাছে পরাজিত হন। উত্থান-পতনের এ চক্র এভাবেই চলতে থাকে। ইবনে খালদুনের বিখ্যাত চক্রাকার ইতিহাস-তত্ত্বের এটাই গোড়ার কথা। খালদুন এই যে মডেল বা উত্থান-পতনের তত্ত্ব দিয়েছিলেন সেটাকে ইসলামের প্রথম যুগের শাসনামল, মধ্যযুগের উত্তর আফ্রিকার ইতিহাস, একাদশ-দ্বাদশ শতকের আলমোরাভিদদের উত্থান-পতনে প্রয়োগ করা যায়। আসাবিয়ার অবক্ষয় দুভাবে ঘটতে পারে। প্রথমত, ক্ষমতা গ্রহণের বা মুলক প্রতিষ্ঠার এক প্রজন্মের পরই দেখা যায় আগের সেই বেদুইন সমাজে শহুরে সংস্কৃতি ঢুকে পড়ছে, একদিকে বিলাসিতা অন্যদিকে আলস্য তাদের ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্যে এক ধরনের হায়ার্কি দেখা দেয়, বিভিন্ন দপ্তরের বিভিন্ন পদে একেকজন আসীন হন। আগে যেখানে সবাই একত্রে গৌরবের অংশীদার থাকতেন, এখন কেবল রাজাই সেই গৌরবের অধিকারী হন। এভাবে ধীরে ধীরে সংহতি কমতে থাকে এবং তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মে একেবারে শূন্যের কোটায় চলে যায়। অর্থাৎ ইবনে খালদুন বিলাসিতাকে আসাবিয়ার অবক্ষয়ের গুরুতর কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন। দ্বিতীয়ত, রাজা বা ক্ষমতাসীন গোত্রপ্রধান যখন নিজের পরিবার ও গোত্রের লোকদের সম্ভাব্য গদি দখলকারী বিবেচনা করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দপ্তর থেকে সরিয়ে নেন, তখন তিনি আসলে জনগণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাসিল করেন। কিন্তু গোত্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব ভাগাভাগি না করে কেবল নিজের নামেই রাজকীয় কর্তৃত্ব কায়েম করেন। তিনি তখন নিজেদের লোকদের ওপর ভরসা না করে অন্যান্য গোত্রের লোকদের ভাড়া করেন। ফলে একধরনের পৃষ্ঠপোষক-খরিদ্দার সম্পর্ক তৈরি হয়। কুটুম্বিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় শক্তিশালী আসাবিয়ার আরেকটি বেদুইন গোত্র সেটা দখল করে নতুন রাজ্যের পত্তন ঘটায়।
খালদুন রাজকীয় কর্তৃত্ব বা করহমংযরঢ়-কে সহজাত ও অনিবার্য বলে মনে করতেন। এর পেছনে প্রধান যুক্তি হচ্ছে মানুষকে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ-ফ্যাসাদ মেটানোর জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাউকে প্রয়োজন হয়। যার শক্তিশালী আসাবিয়া রয়েছে তিনি সেটা করতে পারবেন। আমরা দেখেছি, রাজকীয় কর্তৃত্ব বা তৎকালীন অথরিটির সঙ্গে আসাবিয়ার সম্পর্কটি জটিল। একদিকে আসাবিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে মুলক বা রাষ্ট্র স্থাপন করা, অন্যদিকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে সেটা জনগণের আসাবিয়াকে নষ্ট করে ফেলে। তার মতে, রাজকীয় কর্তৃত্ব মানেই হচ্ছে ক্ষমতাবলে বা শক্তিবলে শাসন; ওয়েবারের রাষ্ট্রের সংজ্ঞার মতোই। যখন জনগণের আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে তখন কর্তাব্যক্তিরা সহজে শাসন করতে পারেন। তদপুরি আসাবিয়া দুর্বল হয়ে পড়লে দিনশেষে খোদ রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মিল-অমিল-প্রভাব খালদুনের চিন্তায় মোড অব লিভিংয়ের ভিত্তিতে সমাজকে ভাগ করা, গোষ্ঠী সংহতি এবং ইতিহাসের চক্রীয় মডেল সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। খালদুন-পরবর্তী বহু চিন্তক খালদুন দ্বারা যেমন প্রভাবিত হয়েছিলেন, তেমনি খালদুনের চিন্তার এ উপাদানগুলোকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক জমানাতেও অনেকে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন নিয়ে যখন ইতিহাস লিখেছেন তখন তারা খালদুনের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের চক্রাকার মডেলকে গ্রহণ করেছেন। যেমন চক্রাকার তত্ত্বের হদিস পাওয়া যায় ওসওয়াল্ড স্পেংলারের দ্য ডিক্লাইন অব দ্য ওয়েস্ট গ্রন্থে। খালদুনের মতো স্প্লেংলারও শহুরে জীবনযাপন ও সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ ছিলেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি খালদুন দ্বারা প্রচ- প্রভাবিত ছিলেন। খালদুনের সন্ধান পেয়ে টয়েনবি রীতিমতো পুলকিত বোধ করেছিলেন। নৈরাশ্যবাদকে ইতিহাসের চক্রীয় তত্ত্বগুলোর একটি বৈশিষ্ট্যই বলে মনে করা হয়। খালদুন গবেষকরা বলেন, অবশ্য খালদুনের যুগ-বৈশিষ্ট্য। খালদুন যে পরিস্থিতিতে লেখালেখি করছিলেন, তখন একদিকে চলছিল রাজবংশগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতা, অন্যদিকে মহামারীতে স্বজন হারানোর ধাক্কা। আরবদের গৌরবময় দিনগুলো তখন শেষ হওয়ার পথে। চতুর্দশ শতাব্দীর আরব দুনিয়ার কোনো বাসিন্দার লেখালেখিতে নৈরাশ্যবাদী উপাদান বা ‘যায় দিন ভালো’ ধরনের মনোভঙ্গি থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল বলে ধরে নেয়া হয়। ইবনে খালদুনের সঙ্গে পনেরো শতকের ইতালীয় দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির তুলনা করা হয়। খালদুনকে যেমন এক জটিল রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল, ম্যাকিয়াভেলিকেও করতে হয়েছিল। দুজনকে তৎকালীন রাজ্যের কূটনৈতিক মিশনে অংশ নিতে হয়েছিল। মুকাদ্দিমার মতো দ্য প্রিন্সে ইতিহাস ছিল কেন্দ্রীয় গুরুত্বের জায়গায়। রাজনীতির জন্য ইতিহাসের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়েছিল। মুকাদ্দিমার মতো দ্য প্রিন্সও বিষণ্ন ও নৈরাশ্যবাদী কাজ। তবে দুজনের মধ্যে অমিলও প্রচুর। ম্যাকিয়াভেলির কাছে ইতিহাস অধ্যয়ন রাজ্যপরিচালনার জন্য দিকনির্দেশনা প্রদানের নিমিত্তে, খালদুন ইতিহাসের বাতেনি রূপ ধরতে চেয়েছিলেন। ম্যাকিয়াভেলি শাসনের মনস্তত্ত্ব, গৌরবের সন্ধান এবং উচ্চ রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়ে আগ্রহী হলেও খালদুন এসব নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। দ্য প্রিন্সে-এ ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার বিষয়ে ‘সুযোগ’-এর ওপর জোর দেয়া হয়েছিল। ম্যাকিয়াভেলির কাছে শাসনের প্রয়োজনে অনৈতিক আচরণ করার যৌক্তিকতা ছিল, কিন্তু খালদুন এক্ষেত্রে প্রচ- নৈতিকবাদী।
সহুল আহমদ: গবেষক ও লেখক