ফজল মুহাম্মদ। টরেন্টো কানাডা থেকে
কানাডা দুনিয়ার অন্যতম একটি অভিবাসন দেশ। সেই সাথে উন্নত বিশ্বের জি -৭ এর সাত দেশের সেরা একটি রাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৬১ সালের আগ পর্যন্ত কানাডায় ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ মানুষদের একক আধিপত্য ছিলো। এশিয়া আর আফ্রিকার মানুষেরা ১৯৬১ সালের আগে কোনভাবেই ইমিগ্রেশন ভিসা বা স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেত না। কানাডার মুসলিম কম্যুনিটির ইতিহাস লিখতে গিয়ে এমন একজন মানুষের সন্ধান পেয়েছি যার নাম ইমাম ড.আবদুল হাই প্যাটেল। উনি কানাডাতে আগমন করেছিলেন ছাত্র হিসেবে। পড়াশুনা করেছেন ইলেকট্রিক ইন্জিনিয়ারিং এ। ১৯৬৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইমাম ড. আবদুল হাই প্যাটেল কানাডার মাটিতে সর্বপ্রথম পা রাখেন। ইমাম প্যাটেলের জন্ম হিন্দুস্তানের গুজরাট রাজ্যের সুরাট শহরের নিকটে। উনার পিতা ব্যবসা করতে ১৯৩৪ সালে ক্যারিবিয়ান দ্বীপ রাষ্ট্র বারবাডোজে গমন করেন। বালক আবদুল হাই নিজ গুজরাটে মাদরাসায় লেখা পড়া করেন। তারপর ১৯৬২ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে উনার পিতার কর্মস্থল বারবাডোজে গমন করেন। ঐখানে আরো সাত বছর পড়াশুনা করে উনিশ বছর বয়সে কানাডার টরন্টো মহানগরীর অন্যতম সেরা টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ( University of Toronto) প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন। বহু অভিজ্ঞতার অধিকারী ইমাম ড. আবদুল হাই প্যাটেলকে কানাডার মুসলিম কম্যুনিটির জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আমি উনার একটি দীর্ঘ সাক্ষাতকার রের্কড করেছি। যা ভবিষ্যতে প্রকাশিতব্য মুসলিম মাইনরিটি কানাডা পুস্তকে সংযুক্ত করার প্রত্যাশা আছে। ইমাম প্যাটেল একান্ত সাক্ষাৎকারে অনেক ইতিহাস, ঘটনা, সংলাপ আর বহুবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাহিনী বলেছেন।
দীর্ঘ দিন কানাডার মাটিতে ইমামতি করেছেন। উনি যেহেতু প্রকৌশলী; তাই উনি ইমামতি করে কোনদিনই বেতন গ্রহণ করেননি। ছাত্র জীবনে উনি যখন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন তখন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র আট থেকে দশ জন মুসলিম ছাত্রছাত্রী ছিলেন। আর উনার মতে আনুমানিক মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। টরন্টো শহরে প্রথম জুমআ নামাজের জামাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ট হাউজে মুসলিম ছাত্ররাই শুরু করেন। ড. রহমত শাহ যিনি ছাত্রজীবন শেষে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। উনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে জুমআ জামাত চালু করেন এবং খুতবা দিতেন। অধ্যাপক ড. রহমত শাহ এক সময়ে ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা ইকনা কানাডা ফেডারেল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যেসব ছাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন। মূলত ঐসব ছাত্ররা জুমআ জামাতে সামিল হতেন। উল্লেখ্য,তখনও বাংলাদেশ হয়নি। তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকেও দুইজন ছাত্র তখন এসেছিলেন। যাদের একজন মনট্রিয়ল ম্যাগগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময় জুমআ নামাজের জামাত করেছেন। ইমাম প্যাটেল আরো বলেছেন ঐসময়ে যেসব ছাত্র বৃত্তি নিয়ে এসেছিলেন তারা প্রায় সকলে পিএইচডি করে নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। মাত্র গুটিকয়েকজন মুসলিম ছাত্র রয়ে গেছেন। যেসব ছাত্র নিজ দেশে যাননি তারা উত্তর আমেরিকার মাটিতে প্রথম Muslim Students Association of America (MSA) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন গঠনে মূলত ড. আহমদ সাক্কার এবং ডঃ আহমদ তুতুনজী মুখ্য ভূমিকা রাখেন। MSA প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ছাত্র সংগঠনের শাখা গঠন শুরু হতে থাকে। আর দিনে দিনে বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা কানাডাসহ আমেরিকার বিভিন্ন অংগ রাষ্ট্রে দলে দলে আসা শুরু করে। আর ঐদিকে কানাডার একশততম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষ্ ১৯৬৭ সালে কানাডার ফেডারেল সরকার ইমিগ্রেশন পদ্ধতি উদার করে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক অভিবাসীদের গ্রহণ করে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের যুদ্ধের কারণে অনেক মুসলিম শরণার্থী হিসেবে কানাডাতে আশ্রয় লাভ করেন। ড. প্যাটেল বলেছেন; MSA প্রতিষ্ঠার পর আমাকে কানাডার নির্বাহী পরিচালক করা হয় এবং আমাকে দায়িত্ব দেওয়া কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে MSA শাখা খোলা এবং বিভিন্ন শহরে মুসলিম কম্যুনিটির জন্যে ৫ ওয়াক্ত নামাজের ব্যবস্থা চালু করা। এই উদ্দেশ্যে আমি কানাডার পশ্চিম এলাকার প্রদেশগুলোতে ব্যাপক সফর শুরু করি। বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করি। এ কাজে এবং মুসলিমদের জন্য মসজিদ নির্মাণের জন্য ফয়সাল রাবেতা আলমে আল ইসলামী আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। সংগঠনটি অনেক মসজিদ স্থাপনে আর্থিক চেক প্রদান করেছে। আমরা MSA এর পক্ষে রাবেতা থেকে চেক গ্রহণ করেছি এবং বিভিন্ন প্রদেশের মুসলিম কম্যুনিটির কাছে সরবরাহ করেছি। ইমাম ড. আবদুল হাই কানাডার মাটিতে বসবাস করতেছেন প্রায় আটান্ন বছর যাবত। এই দীর্ঘ ছয় দশকের কানাডার জিন্দেগীতে উনি অনেক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কানাডার সরকারের সাথে মুসলিম কম্যুনিটির লিয়াজোর জন্য কানাডিয়ান ইমাম কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেছেন। কানাডার পুলিশের নৈতিক প্রশিক্ষণে দিতে ইমাম প্যাটেল একজন মুসলিম চ্যাপলিন অর্থাৎ আত্মাধ্যিক নেতা হিসেবে দজ্ঞতা দেখিয়ে যাচ্ছেন। ছিন্নমূল মানুষের দৈনন্দিন খাবার সরবরাহ করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন আনসার আল ফাউন্ডেশন। তারা প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার হোম লেস মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। ইমাম ড. আবদুল হাই প্যাটেল বিভিন্ন ফ্যামিলি সংকটে একজন অভিজ্ঞ কাউন্সিলিং দিয়ে আসতেছেন। উনার এই সব কম্যুনিটির কাজ শত ভাগ ভলান্টিয়ারিং। কানাডার বৃহত্তম টরন্টো মহানগরী শহর এবং আশে পাশের সকল গ্রেটার টরন্টো এরিয়ায় ইমাম ড.আবদুল হাই একজন অন্যতম মুসলিম কম্যুনিটি লিডার। যাকে কম্যুনিটির কাজে এক ডাকে পাওয়া যায়। টরন্টো মহানগরীতে যে কয়েকটি পুরনো মসজিদ আছে ,যেমন জামে মসজিদ, ইসলামিক ফাউনডেশন মসজিদ, মদীনা মসজিদ, নূর মসজিদ এবং জামে আবু বকর মসজিদসহ আরো ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উনার অবদান।, ৮জুলাই ২০২৬
ফজল মুহাম্মদ 
























