ঢাকা ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনৈতিক পক্ষপাত যেভাবে সামাজিক অবক্ষয় তৈরি করে

মানব সমাজে অন্যায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত মানুষের ইতিহাস ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘাতের ইতিহাস।
কিন্তু ইতিহাসের একটি সত্য হলো কোনো সমাজ শুধু ব্যক্তির পাপে ধ্বংস হয়নি; বরং ধ্বংস হয়েছে তখন, যখন সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার নৈতিক প্রতিরোধশক্তি হারিয়েছে। যখন অপরাধীর চেয়ে অপরাধকে রক্ষা করার লোক বেশি হয়েছে, যখন সত্যের চেয়ে গোত্র বা দল বড় হয়েছে, যখন নীতির চেয়ে ব্যক্তির মর্যাদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখনই সভ্যতার অবক্ষয় শুরু হয়েছে।
ইসলাম ব্যক্তি-পাপকে নিন্দা করে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় ন্যায়বিচার, সত্যনিষ্ঠা এবং নৈতিক সততার প্রশ্নকে। কারণ একজন ব্যক্তি গুনাহ করলে তার ক্ষতি মূলত তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে; কিন্তু যখন একটি গোষ্ঠী বা সমাজ সেই গুনাহকে আড়াল করতে শুরু করে, তখন তা ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থেকে সামাজিক অবক্ষয়ে পরিণত হয়।
কোরআনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হলো সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।…সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচারে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)
এই আয়াত ন্যায়বিচারের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘোষণাগুলোর একটি।
এখানে আল্লাহ মানুষকে শুধু সত্য বলতে বলেননি; বরং সত্য এমনকি নিজের স্বার্থ, নিজের পরিবার বা নিজের গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গেলেও তার পাশে দাঁড়াতে বলেছেন। অর্থাৎ ন্যায়বিচারের মানদ- ব্যক্তি, দল বা জাতি নয়; বরং সত্য।
মানুষ স্বভাবতই তার আপনজন, গোষ্ঠী ও দলের প্রতি অনুরাগ অনুভব করে। এটি মানব প্রকৃতির অংশ; কিন্তু যখন এই অনুরাগ সত্যকে অস্বীকার করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা নৈতিক অবক্ষয়ে রূপ নেয়। পবিত্র কোরআন এ কারণেই সতর্ক করে দিয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।
ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আমরা এ নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখি। মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে অনেকেই তার সামাজিক মর্যাদার কারণে শাস্তি মওকুফের চেষ্টা করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তার হাতও কর্তন করতাম।’ (বুখারি, মুসলিম)
এই হাদিস ন্যায়বোধের একটি মৌলিক দলিল। রাসুল (সা.) স্পষ্ট করেছেন যে ব্যক্তির পরিচয়, মর্যাদা বা সম্পর্ক বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না।
ইসলামের অন্যতম বড় শত্রু হিসেবে যে প্রবণতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হলো ‘আসাবিয়্যাহ’ তথা অন্ধ গোষ্ঠীগত পক্ষপাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আসাবিয়্যাহর দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়; যে আসাবিয়্যাহর জন্য যুদ্ধ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়; এবং যে আসাবিয়্যাহর ওপর মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২১)
এই আসাবিয়্যাহ বা পক্ষপাত শুধু বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার নয়। সত্য-মিথ্যা বিবেচনা না করে অন্ধভাবে বা জেনেশুনে নিজের গোষ্ঠী, মতাদর্শের কারো পক্ষে দাঁড়ানোও এর অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক ভাষায় একে বলা যায় দলান্ধতা বা ব্যক্তিপূজা।
ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত ‘মুকাদ্দিমা’য় ‘আসাবিয়্যাহ’কে সভ্যতার উত্থান ও পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, গোষ্ঠীগত সংহতি একটি জাতিকে শক্তিশালী করতে পারে; কিন্তু যখন তা ন্যায় ও নীতির পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, বিলাসিতায় পর্যবসিত হয়, তখন সেই শক্তিই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইমাম গাজ্জালি তাঁর ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’-এ ক্ষমতা ও নেতৃত্বের নৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে নৈতিকতার প্রধান উৎস হলো মানুষের নফস, আর তা সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় তখন, যখন সে নিজের ভুলকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করতে শুরু করে। ব্যক্তি যখন নিজের ভুল ঢাকে, তখন তা একটি ব্যক্তিগত সমস্যা; কিন্তু যখন একটি গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে সেই ভুলকে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন তা একটি সামাজিক বিপর্যয়।
ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল শাসক ও আলেমদের সমালোচনা করার নৈতিক সাহস। খলিফা উমর (রা.) একবার মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার মধ্যে কোনো বিচ্যুতি দেখলে তোমরা কী করবে?’ তখন একজন সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমরা আমাদের তরবারি দিয়ে তা সংশোধন করব।’ উমর (রা.) এতে অসন্তুষ্ট হননি; বরং আল্লাহর প্রশংসা করেছিলেন যে তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন মানুষ আছে, যারা শাসকের ভুল সংশোধনের সাহস রাখে।
পবিত্র কোরআনে ফেরাউনের ঘটনা বারবার এসেছে। গভীরভাবে পড়লে দেখা যায়, ফেরাউনের শক্তি শুধু তার নিজের মধ্যে ছিল না; বরং তার চারপাশে এমন এক শ্রেণি ছিল যারা তার মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করত এবং তার অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাত। ফেরাউন একা ছিল না; তার সঙ্গে ছিল একটি নৈতিকভাবে বিকল (কিবতি) সমাজ। এ কারণেই মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ফেরাউন তার জাতিকে নির্বোধ বানিয়েছিল, আর তারা তার আনুগত্য করেছিল।’ (সুরা : যুখরুফ, আয়াত : ৫৪)
অর্থাৎ অত্যাচারী নেতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অন্ধ অনুসারীও বিপজ্জনক।
সমসাময়িক বিশ্বেও আমরা একই বাস্তবতা দেখি। ধর্মীয় সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক গোষ্ঠী কিংবা মতাদর্শিক সম্প্রদায়; সবখানেই একটি প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে : ‘আমার পক্ষ হলে ভুলও সঠিক, আর প্রতিপক্ষ হলে সঠিকও ভুল।’ এই মানসিকতা সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। মানুষ তখন প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমাণ খুঁজে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরো তীব্র করেছে। কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ সত্য যাচাইয়ের আগে নিজেদের পক্ষ বেছে নেয়। ফলে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায় এবং দলীয় অবস্থানই প্রধান হয়ে ওঠে।
ইসলামের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত কোরো না, আবার প্রমাণ পাওয়া গেলে গোষ্ঠী-স্বার্থে সত্যকে গোপনও কোরো না। ইসলাম ব্যক্তি নয়, নীতিকে অনুসরণ করতে বলে; নেতা নয়, সত্যকে অনুসরণ করতে বলে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

অনৈতিক পক্ষপাত যেভাবে সামাজিক অবক্ষয় তৈরি করে

আপডেট সময় ১০:১৯:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

মানব সমাজে অন্যায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত মানুষের ইতিহাস ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘাতের ইতিহাস।
কিন্তু ইতিহাসের একটি সত্য হলো কোনো সমাজ শুধু ব্যক্তির পাপে ধ্বংস হয়নি; বরং ধ্বংস হয়েছে তখন, যখন সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার নৈতিক প্রতিরোধশক্তি হারিয়েছে। যখন অপরাধীর চেয়ে অপরাধকে রক্ষা করার লোক বেশি হয়েছে, যখন সত্যের চেয়ে গোত্র বা দল বড় হয়েছে, যখন নীতির চেয়ে ব্যক্তির মর্যাদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখনই সভ্যতার অবক্ষয় শুরু হয়েছে।
ইসলাম ব্যক্তি-পাপকে নিন্দা করে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় ন্যায়বিচার, সত্যনিষ্ঠা এবং নৈতিক সততার প্রশ্নকে। কারণ একজন ব্যক্তি গুনাহ করলে তার ক্ষতি মূলত তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে; কিন্তু যখন একটি গোষ্ঠী বা সমাজ সেই গুনাহকে আড়াল করতে শুরু করে, তখন তা ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থেকে সামাজিক অবক্ষয়ে পরিণত হয়।
কোরআনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হলো সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।…সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচারে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)
এই আয়াত ন্যায়বিচারের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘোষণাগুলোর একটি।
এখানে আল্লাহ মানুষকে শুধু সত্য বলতে বলেননি; বরং সত্য এমনকি নিজের স্বার্থ, নিজের পরিবার বা নিজের গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গেলেও তার পাশে দাঁড়াতে বলেছেন। অর্থাৎ ন্যায়বিচারের মানদ- ব্যক্তি, দল বা জাতি নয়; বরং সত্য।
মানুষ স্বভাবতই তার আপনজন, গোষ্ঠী ও দলের প্রতি অনুরাগ অনুভব করে। এটি মানব প্রকৃতির অংশ; কিন্তু যখন এই অনুরাগ সত্যকে অস্বীকার করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা নৈতিক অবক্ষয়ে রূপ নেয়। পবিত্র কোরআন এ কারণেই সতর্ক করে দিয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।
ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আমরা এ নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখি। মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে অনেকেই তার সামাজিক মর্যাদার কারণে শাস্তি মওকুফের চেষ্টা করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তার হাতও কর্তন করতাম।’ (বুখারি, মুসলিম)
এই হাদিস ন্যায়বোধের একটি মৌলিক দলিল। রাসুল (সা.) স্পষ্ট করেছেন যে ব্যক্তির পরিচয়, মর্যাদা বা সম্পর্ক বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না।
ইসলামের অন্যতম বড় শত্রু হিসেবে যে প্রবণতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হলো ‘আসাবিয়্যাহ’ তথা অন্ধ গোষ্ঠীগত পক্ষপাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আসাবিয়্যাহর দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়; যে আসাবিয়্যাহর জন্য যুদ্ধ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়; এবং যে আসাবিয়্যাহর ওপর মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২১)
এই আসাবিয়্যাহ বা পক্ষপাত শুধু বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার নয়। সত্য-মিথ্যা বিবেচনা না করে অন্ধভাবে বা জেনেশুনে নিজের গোষ্ঠী, মতাদর্শের কারো পক্ষে দাঁড়ানোও এর অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক ভাষায় একে বলা যায় দলান্ধতা বা ব্যক্তিপূজা।
ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত ‘মুকাদ্দিমা’য় ‘আসাবিয়্যাহ’কে সভ্যতার উত্থান ও পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, গোষ্ঠীগত সংহতি একটি জাতিকে শক্তিশালী করতে পারে; কিন্তু যখন তা ন্যায় ও নীতির পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, বিলাসিতায় পর্যবসিত হয়, তখন সেই শক্তিই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইমাম গাজ্জালি তাঁর ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’-এ ক্ষমতা ও নেতৃত্বের নৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে নৈতিকতার প্রধান উৎস হলো মানুষের নফস, আর তা সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় তখন, যখন সে নিজের ভুলকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করতে শুরু করে। ব্যক্তি যখন নিজের ভুল ঢাকে, তখন তা একটি ব্যক্তিগত সমস্যা; কিন্তু যখন একটি গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে সেই ভুলকে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন তা একটি সামাজিক বিপর্যয়।
ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল শাসক ও আলেমদের সমালোচনা করার নৈতিক সাহস। খলিফা উমর (রা.) একবার মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার মধ্যে কোনো বিচ্যুতি দেখলে তোমরা কী করবে?’ তখন একজন সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমরা আমাদের তরবারি দিয়ে তা সংশোধন করব।’ উমর (রা.) এতে অসন্তুষ্ট হননি; বরং আল্লাহর প্রশংসা করেছিলেন যে তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন মানুষ আছে, যারা শাসকের ভুল সংশোধনের সাহস রাখে।
পবিত্র কোরআনে ফেরাউনের ঘটনা বারবার এসেছে। গভীরভাবে পড়লে দেখা যায়, ফেরাউনের শক্তি শুধু তার নিজের মধ্যে ছিল না; বরং তার চারপাশে এমন এক শ্রেণি ছিল যারা তার মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করত এবং তার অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাত। ফেরাউন একা ছিল না; তার সঙ্গে ছিল একটি নৈতিকভাবে বিকল (কিবতি) সমাজ। এ কারণেই মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ফেরাউন তার জাতিকে নির্বোধ বানিয়েছিল, আর তারা তার আনুগত্য করেছিল।’ (সুরা : যুখরুফ, আয়াত : ৫৪)
অর্থাৎ অত্যাচারী নেতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অন্ধ অনুসারীও বিপজ্জনক।
সমসাময়িক বিশ্বেও আমরা একই বাস্তবতা দেখি। ধর্মীয় সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক গোষ্ঠী কিংবা মতাদর্শিক সম্প্রদায়; সবখানেই একটি প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে : ‘আমার পক্ষ হলে ভুলও সঠিক, আর প্রতিপক্ষ হলে সঠিকও ভুল।’ এই মানসিকতা সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। মানুষ তখন প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমাণ খুঁজে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরো তীব্র করেছে। কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ সত্য যাচাইয়ের আগে নিজেদের পক্ষ বেছে নেয়। ফলে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায় এবং দলীয় অবস্থানই প্রধান হয়ে ওঠে।
ইসলামের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত কোরো না, আবার প্রমাণ পাওয়া গেলে গোষ্ঠী-স্বার্থে সত্যকে গোপনও কোরো না। ইসলাম ব্যক্তি নয়, নীতিকে অনুসরণ করতে বলে; নেতা নয়, সত্যকে অনুসরণ করতে বলে।