মানুষ ভুল করে। কেউ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাবে ভুল করে, কেউ আবেগের বশে, আবার কেউ নিজের দুর্বলতার কারণে ভুল পথে পা বাড়ায়।
তাই সমাজে একে অপরকে ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া এবং অন্যায় থেকে সতর্ক করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা নসিহত ও দাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে এমন পদ্ধতিতে বিতর্ক করো, যা সর্বোত্তম।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)
এ আয়াতে শুধু কী বলতে হবে তা নয়, কীভাবে বলতে হবে—সেটিও শেখানো হয়েছে। ‘হিকমত’ অর্থ প্রজ্ঞা ও উপযুক্ত পদ্ধতি।
আর ‘মাওইজাতুল হাসানাহ’ হলো সুন্দর ও কল্যাণকর উপদেশ। অর্থাৎ নসিহত এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের হৃদয়কে সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে। কেননা কঠোরতা অনেক সময় মানুষকে সত্য থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ কোমলতা বন্ধ দরজাও খুলে দিতে পারে।
আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের মতো সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তির কাছেও কোমল ভাষায় কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৪৪)
যখন ফেরাউনের মতো ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও কোমলতার নির্দেশ রয়েছে, তখন একজন মুসলিমের ভুল-ত্রুটি সংশোধনের ক্ষেত্রে আমাদের ভাষা কতটা সংযত ও মমতাপূর্ণ হওয়া উচিত, তা সহজেই অনুমেয়।
গোপনে সংশোধনের চেষ্টা
নসিহতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো—সম্ভব হলে মানুষের ভুল এমনভাবে সংশোধন করা, যাতে তার সম্মান অযথা ক্ষুণ্ন না হয়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত ভুলকে সবার সামনে তুলে ধরে তাকে লজ্জিত করা অনেক সময় সংশোধনের পরিবর্তে জেদ, ক্ষোভ ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি যেন হজরত উসমান (রা.)-এর সঙ্গে গিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, তিনি তাঁর সঙ্গে গোপনে আলোচনা করছেন; তিনি এমন কোনো দরজা খুলতে চান না, যা পরে ফিতনা বা বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এরপর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শোনা একটি কঠিন সতর্কবাণী বর্ণনা করেন—যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের আদেশ দিত, কিন্তু নিজে তা করত না এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করত, অথচ নিজেই তা করত, কিয়ামতের দিন তার জন্য কঠিন শাস্তির কথা এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৬৭)
তাই অন্যকে ভালো হওয়ার কথা বলার পাশাপাশি নিজের আমলও সংশোধন করতে হবে। কারণ মানুষের কথার চেয়ে তার চরিত্র ও কাজ অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। তাই নসিহতকারীকে নিজের দিকেও তাকাতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেদের কথা ভুলে যাও?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪৪)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনো মানুষ নিজে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ না হওয়া পর্যন্ত অন্যকে ভালো কাজের কথা বলতে পারবে না। বরং সৎকাজের দাওয়াত দিতে হবে এবং একই সঙ্গে নিজের সংশোধনের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। প্রকৃত সৌন্দর্য হলো—অন্যকে যে পথে ডাকছি, নিজেকেও সেই পথে চলার চেষ্টা করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও নসিহতকারী। তাঁর নসিহতে ছিল মমতা, ধৈর্য ও মানুষের অবস্থার প্রতি গভীর বিবেচনা। তিনি মানুষের ভুল শুধরে দিতেন, কিন্তু অকারণে তাকে অপমান করতেন না। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেললে সাহাবায়ে কেরাম তাকে বাধা দিতে উদ্যত হন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের তাকে ছেড়ে দিতে বলেন এবং পরে সেখানে পানি ঢেলে পরিষ্কার করতে নির্দেশ দেন। এরপর তিনি লোকটিকে কোমলভাবে বুঝিয়ে দেন যে, মসজিদ এ ধরনের কাজের স্থান নয়। (সহিহ বুখারি)
কখনো কখনো মানুষ অন্যের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিজের জ্ঞান, ধার্মিকতা বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে চায়। এটি নসিহতের রূহ নষ্ট করে দেয়। একজন মুমিনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—‘আমি তাকে ছোট করব’ নয়; বরং ‘সে যেন ভালো হয়ে যায়।’ কারও ভুল সংশোধনের সময় নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করা দরকার—আমি কি তার কল্যাণ চাই, নাকি তাকে হার মানাতে চাই? আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলছি, নাকি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর জন্য? নসিহতের আগে এই আত্মজিজ্ঞাসা করলে কথার ধরন অনেকটাই বদলে যাবে।
উত্তম নসিহতের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য
একজন মুমিনের নসিহতে কয়েকটি বিষয় থাকা উচিত—
প্রথমত, নিয়ত শুদ্ধ হওয়া। নসিহতের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণ।
দ্বিতীয়ত, সঠিক কথা বলা। যাচাই না করে কারও ভুলের অভিযোগ করা যাবে না।
তৃতীয়ত, উপযুক্ত সময় ও স্থান নির্বাচন করা। রাগের মুহূর্তে বা মানুষের সামনে কাউকে অপমান করে নসিহত করার পরিবর্তে উপযুক্ত সময় অপেক্ষা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
চতুর্থত, ভাষা কোমল রাখা। সত্য কথা কঠোর ভাষায় বলতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম ইসলামে নেই।
পঞ্চমত, ব্যক্তিকে নয়, ভুলকে লক্ষ্য করা। ‘তুমি খারাপ’ না বলে ‘এই কাজটি ভুল’—এভাবে বলা অধিক ফলপ্রসূ।
ষষ্ঠত, নিজের সংশোধন করা। অন্যকে যে নসিহত করা হচ্ছে, নিজের জীবনেও তা বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকতে হবে।
সপ্তমত, ধৈর্য ধারণ করা। একটি নসিহত করলেই মানুষ সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। হেদায়েত আল্লাহর হাতে।
তাই কারও ভুল দেখলে তাকে সবার সামনে অপমান করার আগে একবার ভাবা উচিত—আমার কথায় কি তার সংশোধন হবে, নাকি তার হৃদয় আরও কঠিন হয়ে যাবে? মনে রাখতে হবে, নসিহতের সার্থকতা কাউকে হারিয়ে দেওয়া নয়; বরং তাকে সত্যের পথে ফিরিয়ে আনা। আল্লাহ তাআলা আমাদের নসিহতকে আন্তরিক করুন এবং আমাদের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য দান করুন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
নসিহতের উদ্দেশ্য হোক সংশোধন, অপমান নয়
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০৬:১৯:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 52
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























