পবিত্র কোরআনে মানুষের সৃষ্টির সূচনা, পৃথিবীতে তার আগমন, জীবনেরসীমাবদ্ধতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশের বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ একসময় অস্তিত্বহীন ছিল।
আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন, পৃথিবীতে জীবনযাপনের সুযোগ দিয়েছেন এবং তাকে দায়িত্ব ও কর্তব্যের নির্দেশনা দিয়েছেন। একদিন এই জীবন শেষ হবে, কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের যাত্রা সেখানেই শেষ হয়ে যাবে না। বরং তাকে পুনরুত্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং নিজের কর্মের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১১৫)
সুরা ক্বফের বিশেষ মর্যাদা
সুরা ক্বফের বিশেষ মর্যাদার একটি দিক হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার খুতবায় এ সুরা পাঠ করতেন।
উম্মে হিশাম বিনতে হারিসা ইবনুল নুমান (রা.) বলেন, ‘আমি সুরা কাফ শিখেছি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখ থেকে। তিনি প্রতি জুমায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে লোকদের উদ্দেশে খুতবা দেওয়ার সময় এ সুরা পাঠ করতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৭৩)
১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি পুনরুত্থানের প্রমাণ
সুরা কাফের সূচনা হয়েছে বিচ্ছিন্ন আরবি অক্ষর ‘কাফ’ দিয়ে। এরপর মহান কোরআনের শপথের মাধ্যমে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে।
সুরাটির শুরুতেই পুনরুত্থান সম্পর্কে অবিশ্বাসীদের বিস্ময় ও আপত্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তারা প্রশ্ন করেছিল, মানুষ মারা যাওয়ার পর মাটিতে মিশে গেলে তাকে আবার নতুন করে সৃষ্টি করা কীভাবে সম্ভব? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কাফ। শপথ মহিমান্বিত কোরআনের! বরং তারা বিস্মিত হয়েছে যে, তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন সতর্ককারী এসেছে। অতঃপর কাফিররা বলে, ‘এ তো এক বিস্ময়কর ব্যাপার! আমরা মারা গেলে এবং মাটিতে পরিণত হলে কি আবার জীবিত হব? এ তো সুদূরপরাহত প্রত্যাবর্তন!’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ১-৩)
এর জবাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও অসীম ক্ষমতার প্রমাণ তুলে ধরেছেন। মানুষ মাটিতে মিশে গেলেও তার কোনো কিছুই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।
প্রথমবার যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর পক্ষে পুনরায় সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়।
এরপর মানুষকে নিজের চারপাশের মহাবিশ্বের দিকে তাকানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিস্তৃত আকাশ, সুসজ্জিত নক্ষত্ররাজি, বিশাল পৃথিবী, সুদৃঢ় পর্বতমালা, বিচিত্র উদ্ভিদ, বৃষ্টির পানি এবং মৃত ভূমিতে নতুন প্রাণের সঞ্চারÑএসবই আল্লাহর অসীম ক্ষমতার নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি আকাশ থেকে বরকতময় পানি বর্ষণ করি। অতঃপর তা দিয়ে উদ্যান, শস্য এবং গুচ্ছবদ্ধ ফলবিশিষ্ট দীর্ঘ খেজুরগাছ উৎপন্ন করিÑবান্দাদের জীবিকার জন্য। আর এ পানি দিয়ে আমি মৃত ভূমিকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই হবে পুনরুত্থান।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ৯–১১)
২. অতীতের জাতিগুলোর পরিণতি থেকে শিক্ষা
সুরা কাফ শুধু মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের প্রমাণই তুলে ধরে না; বরং অতীতের জাতিগুলোর ঘটনাবলির মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের আগে নুহের সম্প্রদায়, রাসের অধিবাসীরা, সামুদ, আদ, ফেরাউন, লুতের সম্প্রদায়, আইকার অধিবাসীরা এবং তুব্বার সম্প্রদায়ও অস্বীকার করেছিল। প্রত্যেকেই রাসুলদের অস্বীকার করেছিল। ফলে আমার শাস্তির প্রতিশ্রুতি অবধারিত হয়েছিল।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ১২-১৪)
এসব জাতির কেউ শক্তি ও ক্ষমতায় বলীয়ান ছিল, কেউ সম্পদ ও প্রভাবের অধিকারী ছিল, আবার কেউ নিজেদের সভ্যতা ও সামর্থ্য নিয়ে অহংকার করত। কিন্তু তাদের ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা পার্থিব প্রভাব তাদের আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
৩. মানুষের অন্তরের কথাও আল্লাহ জানেন
সুরা কাফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের বাহ্যিক কাজের পাশাপাশি তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কেও আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। মানুষ কী চিন্তা করে, তার মনে কী ইচ্ছা জাগে এবং সে কী গোপন করেÑকিছুই আল্লাহর অজানা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা আমি জানি। আর আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও তার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ১৬)
এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও মানুষের প্রতি তাঁর পূর্ণ অবগতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের অন্তরে কী চলছে, তা অন্য মানুষের কাছে গোপন থাকতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে তা গোপন নয়।
৪. মানুষের প্রতিটি কাজ লিপিবদ্ধ হচ্ছে
মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তার কথা, কাজ ও আচরণ একদিন তার সামনে উপস্থাপন করা হবে। সুরা কাফে এ বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে সদা প্রস্তুত পর্যবেক্ষক রয়েছে।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ১৭-১৮)
৫. মৃত্যু অনিবার্য, হিসাবের দিন অবশ্যম্ভাবী
দুনিয়ার জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত বাস্তবতা হলো মৃত্যু। মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, যত সম্পদের অধিকারী হোক কিংবা যত দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করুক, একদিন তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। সুরা কাফে আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর অনিবার্য মুহূর্তের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যসহ উপস্থিত হবে। এ থেকেই তো তুমি পালিয়ে বেড়াতে।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ১৯)
মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যা থেকে পালিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর মানুষকে এমন এক জগতে প্রবেশ করতে হবে, যেখানে তার পার্থিব জীবনের কাজকর্মের পরিণতি প্রকাশিত হবে। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে। এটাই সেই প্রতিশ্রুত দিনের বাস্তবায়ন। প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে একজন চালক ও একজন সাক্ষী।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ২০–২১)
৬. জান্নাত ও জাহান্নামের চূড়ান্ত পরিণতি
সুরা কাফের শেষাংশে পরকালের দৃশ্য তুলে ধরে জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহভীরুদের জন্য জান্নাতকে কাছে নিয়ে আসা হবে। তাদের বলা হবে, এটি সেই প্রতিশ্রুত জান্নাত, যা প্রত্যেক আল্লাহমুখী ও সংরক্ষণশীল বান্দার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জান্নাতকে মুত্তাকিদের নিকটবর্তী করা হবে, দূরে নয়। বলা হবে, “এটাই তোমাদের প্রতিশ্রুত বিষয়; প্রত্যেক আল্লাহমুখী ও সংরক্ষণশীল বান্দার জন্য।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ৩১–৩২)
সুরা কাফ মানুষের সামনে জীবনের এক চিরন্তন সত্য তুলে ধরে-মানুষের সৃষ্টি উদ্দেশ্যহীন নয়, মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি নয় এবং প্রতিটি মানুষকে একদিন তার প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হতে হবে। মহাবিশ্বের বিশালতা, বৃষ্টিতে মৃত ভূমির পুনর্জীবন, অতীতের জাতিগুলোর পরিণতি এবং মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাবÑসবকিছুই আল্লাহর ক্ষমতা ও আখিরাতের বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মৃত্যুর আগে আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
সুরা ক্বাফে জন্ম-মৃত্যু ও চূড়ান্ত পরিণতির ৬ বার্তা
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০৫:৫২:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- 9
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























