বাংলাদেশের নার্সিং পেশায় উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষকতায় পথিকৃৎ নারী ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজ আর নেই। গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নার্সিং শিক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, শিক্ষকতা এবং বিভিন্ন নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের নার্সিং পেশার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৬১ সালের ১২ জুন গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী মিশনের দক্ষিণ পানজোরায় জন্মগ্রহণ করেন ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজ। তাঁর বাবা প্রয়াত পিটার গমেজ এবং মা প্রয়াত তেরেজা গমেজ। তাঁর পৈতৃক নিবাস গাজীপুর জেলায়। ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজের স্বামী উইলিয়াম অতুল কুলুন্তুনু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁদের একমাত্র পুত্র উইলসন ধ্রুব কুলুন্তুনু বর্তমানে আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মরত।
শিক্ষাজীবন ও উচ্চশিক্ষা : ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজ ১৯৭৭ সালে গাজীপুরের কালীগঞ্জের বাগদী হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৮০ সালে ঢাকা নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এবং ১৯৮১ সালে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকার মহাখালী নার্সিং কলেজ থেকে বিএসসি ইন নার্সিং ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাজ্যে যান। ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষে কুইন মার্গারেট কলেজ থেকে অ্যাডভান্সড নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা এবং ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষে একই প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাডভান্সড নার্সিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নার্সিং সায়েন্সে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। প্রদত্ত জীবনী-তথ্য অনুযায়ী, তিনি এ ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম বাংলাদেশি নার্সিং পেশাজীবী। তাঁর শিক্ষাজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন ২০১০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ। যুক্তরাষ্ট্রের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি এ ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নার্সিং সহায়তা বিকাশের পদ্ধতি। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের নার্সিং পেশায় প্রথম নারী পিএইচডিধারী।
শিক্ষকতা ও পেশাগত অবদান: কর্মজীবনের শুরুতে ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজ ঢাকা নার্সিং ইনস্টিটিউটে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ঢাকা নার্সিং কলেজ এবং মহাখালী বিএসসি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি নার্সিং শিক্ষার বিকাশ এবং দক্ষ নার্স তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন তিনি। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস উপলক্ষে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননায়ও ভূষিত হন। নার্সিং পেশায় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা দেশের নার্সিং শিক্ষার অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে নার্সিংয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণায় তাঁর অর্জন এ পেশায় আগ্রহী নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত।
আমাদের অনুপ্রেরণা: ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজের জীবন ছিল শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষকতা ও পেশাগত নিষ্ঠার এক দীর্ঘ পথচলা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন থেকে শুরু করে দেশের নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর কর্মজীবন নার্সিং পেশার বিকাশে অবদানের স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষা ও পেশাজগতে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীকে হারানোর শোক নেমে এসেছে। তাঁর অর্জন, কর্মনিষ্ঠা ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নার্সিং শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে।
সংবাদ শিরোনাম
নার্সিংয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী পিএইচডিধারী ড. জাসিন্তা অলিম্পিয়া গমেজ আর নেই
-
শাহ বুলবুল - আপডেট সময় ০৬:৫৮:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
- 4
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ






















