
উপন্যাস
হারুন ইবনে শাহাদাত
১
আকাশে অনেক মেঘ। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। যে কোন সময় বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টির সাথে এখন আবার নতুন আরেক আপদ যোগ হয়েছে- ঠাটা। হ্যা ঠাটা। বইয়ের ভাষায় যার নাম ব্রজপাত। বৃষ্টির সাথে ঠাটার সম্পর্ক নতুন নয়। কিন্তু ইদানিং ব্রজপাতের হার অনেক বেড়েছে। এক এক বারের বৃষ্টির দিনে ১০/ ১২ জন মানুষ মরছে ঠাটা পড়ে। কিন্তু উপায় নেই। গোলাম আলীকে বাইরে বের হতে হবেই। না গোলাম আলী ছোট-খাট কোন গোলাম নয়, সে সরকারের বড় কর্মকর্তা। অনেক ক্ষমতা তার। তার আঙ্গুলের ইশার অপেক্ষায় থাকে অনেক গোলাম। তারপরও আজ তার মনটা কেন যেন বাইরে বের হতে সায় দিচ্ছে না। অফিস পর্যন্ত পৌছতে পারলে ঠাটা পড়ে মরার ভয় নেই। তার চলাচলের গাড়িটাও অত্যাধুনিক। এমন আধুনিক গাড়িতে কোন দিন ঠাটা পড়েছে এমন খবরও তার কাছে নেই। তারপরও তার কেন এত ভয়। তিনি নিজেও তা বুঝতে পারছেন না। তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী তার দায়িত্ব দেশের সংবিধান আইন-কানুন ও তার সার্ভিস রুল অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করা। জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন। দেশের মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তাদের জীবন-মান ও সম্পদের নিরপত্তা বিধান এবং মানবাধিকার অধিকার সংরক্ষণ। এই দায়িত্ব পালনের জন্যই তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা দেয়া হয়। গাড়ি বাড়ি পাইক পেয়দা দেয়া হয়েছে। তিনি ভাল করেই জানেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা মানে জনগণের টাকা।
কিরিংকিরিংকিরিং করে লাল টেলিফোনটা অনেক সময় ধরে বাজছে। গোলাম আলীর ধরতে ইচ্ছে করছে না। পাইক-পেয়দা এমন কি তাঁর স্ত্রীরও এই ফোন ধরার অনুমতি নেই। কর্তার মন-মর্জির দিকে তাকিয়ে কেউ কিছু বলারও সাহস করছে না। অগত্যা স্ত্রী সাকিলাই এগিয়ে এলেন: কি ব্যাপার ফোনটা ধরছো না কেন? মন্ত্রী মহোদয়ের ফোন?
গোলাম আলী তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন: তুমিই ধরো,ধরো । ঐ নোয়াজ আলীই তো ফোনটা করেছে ..
সাকিলা স্বামীর মনের ক্ষোভ বুঝতে পারলেও তাকে হালকা করতে বলে: সে তো তোমারই বন্ধু। এক সাথে পড়েছো..
: এক সাথে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়লেই কেউ বন্ধু না, তা তুমি খুব ভাল করেই জান। বেটা, মাস্তান, চাঁদাবাজ, চাঁদা আর কালোবাজারির টাকায় পার্টির পদ কিনে, বিনা ভোটে এমপি আর এখন কি না উনি মন্ত্রী সেজেছেন..
: মি. আলী তুমি ভাল করেই জান, আমলাদের মুখে এসব কথা মানায় না। তারা সরকারের..
: নামের প্রথম অংশটা বাদ দিলে কেন? বল,‘ মি. গোলাম আলী.., তোমার মুখের কথা কেড়ে নিলাম কেন জান?
: না তো?
: ঐ যে বলছিলে সরকারের তারপর বলতে গোলাম, তোমার ঐ কথাটি ঠিক নয়। শুনে রাখ তোমার মি. গোলাম আলী সরকারের নয় প্রজাতন্ত্রের গোলাম।
: ঐ একই কথা।
: তোমার মুখে এ কথা মানায় না। দেশের সংবিধান মেনে চলার শপথ নেয়া সরকার প্রজাতন্ত্রের আইন এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোন আদেশ দিলে এই গোলাম আলী তা মানতে বাধ্য নয়।
: মি. আলী আমি আপনার মতো বিশাল আমলার সাথে তর্কে পারবো না। তবে এটা জানি রাষ্ট্র বা প্রজাতন্ত্র নামের গাড়ির ড্রাইভার হলো সরকার আর আপনারা হলেন সুপারভাইজার যাকে সাধারণ মানুষ হেল্পার বলে। তাই তার দেরি না করে ফোনটা ধরে একটু হেল্প করুন।
: ফোনটা তো বাজতে বাজতে বন্ধ হয়ে গেছে। আবার বাজুক।
সাকিলা স্বামীর কষ্টটা বুঝতে পারে। কিন্তু কি বা করার আছে। জগত সংসারের বাস্তবতাটাকে তো ইচ্ছে করলেই কেউ রাতারাতি পাল্টে দিতে পারবে না। তার স্বামীর শিক্ষাজীবন ছিল উজ্জ্বল। স্কুল জীবন থেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও তিনি কারো পিছনে পড়েননি। পাবলিক সার্ভিস কমিশন প্রতিযোগিতায় তার পছন্দের তালিকার এক নম্বরে ছিল প্রশাসন ক্যাডার। সেখানেও তিনি সবার সেরা হিসেবেই ঠাঁই করে নিয়েছেন। কর্মদক্ষতা সততা আর যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি আজ এই ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদে আসীন। মি. গোলাম আলী এখন সচিব। তা হলে তার কষ্টটা কোথায়? তার বাল্য বন্ধু নোয়াজ আলী এখন মন্ত্রী। নোয়াজ আলী ক্লাস এইট পর্যন্ত গোলাম আলীর সাথে পড়া-লেখা করেছেন। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ায় আর লেখা-পড়া করা হয়ে উঠেনি। মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি তার বাল্যবন্ধুকে তার মন্ত্রণালয়ের সচিব করেছেন, নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করেই। বন্ধুর মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়ে খুশী হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু গোলাম আলীর মাথায় একটা চিন্তাই সব উল্টপাল্ট করে দিচ্ছে- যে কি না কোন ক্লাসেই তার ধারের কাছে আসতে পারতো না, সেই কি না জীবন নাটকের মোহনায় তার মাথার ওপর উঠে বসলো।
সাকিলা স্বামীকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলে: মি. আলী প্লেটোর শিক্ষায় ব্যবস্থায় শিক্ষিত দার্শনিক রাজার আদর্শ রাষ্ট্র শুধুই কল্পনা। বাস্তবে পৃথিবীর কোথাও এর অস্তিত্ব নেই। আমাদের বাস্তবের রাষ্ট্রটা কেমন রূপে সাজে দেখ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেরা সেরা ছাত্ররা বিজ্ঞান নয় তো ব্যবসা প্রশাসনে পড়ে ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, সিইও হন। কেউ কেউ তোমার পাবলিক সার্ভিস পাস করা আমলা হন। বেকবেঞ্চাররা হন নেতা। কারণ তোমাদের মতো ভাল ছাত্ররা রাজনীতি থেকে দূরে থেকে ক্যারিয়ার গড়ায় ব্যস্ত থাকায় সেই শুন্য স্থান দখল করে তারা- পেশিশক্তি আর মাস্তানির জোরে।
গোলাম আলী কথা না বাড়িয়ে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
২
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মালিবাগ মোড়। আকাশের গুমট ভাবটা এখনো কাটেনি। এখন সকাল না সন্ধ্যা, ঘড়ি না দেখলে বোঝার উপায় নেই। সকাল সাড়ে আটটা থেকে ১৫ মিনিট ধরে তিন তলা জ্যামে আটকা আছে গোলাম আলীর গাড়ি। ফ্লাইভার নির্মাণের আগে অবশ্য নগরবাসী তিনতলা জ্যামের সাথে পরিচিত ছিল না। বর্তমানে এই নতুন অনুসঙ্গ নতুন মাত্রায় অস্বস্তি বিলাচ্ছে বিশ্বের বসবাস অযোগ্য নগরের নাগরিক জীবনে। কড়াৎ করে আশে-পাশে কোথাও একটা বাজ পড়লো। ড্রাইভার সাহেব আলী উচ্চস্বরে বলে উঠে লা ইলাহা ইল্লালাহু…
গোলাম আলীর শরীর কেঁপে উঠে। তারপরও সাহসী ভাব নিয়ে ড্রাইভারের কাছে জানতে চায়: কি রে খুব বেশী ভয় পেয়েছিস
:‘স্যার যে কি বলেন, ঠাটারে ভরায় না কেডা। প্রতি দিন যেভাবে পাইকারি হারে মানুষ মরতাছে। স্যার এই সমেস্যার কি কোন সমাধ্যান নাই।’ সাহেব আলীর এই এক দোষ একবার মুখ খুললে গড় গড় করে বলতেই থাকবে। কেউ শুনছে কি না শুনছে সে দিকে তার কোন ভ্রুরক্ষেপ নেই। ঝম ঝম শব্দে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির অবস্থা দেখে সাহেব আলী আবার চিৎকার করে উঠলো: ‘স্যার, আরেক নতুন সমেস্যা । ঢাকা তো নদী হইয়া যাবেনে।’
মৃদু ধমক দিয়ে গোলাম আলী বলেন: ‘তোর সমেস্যা সমস্যা হবে কবে। এত বছরেও শব্দটা ঠিক করতে পারলি না।’
লজ্জা মিশানো হাসি হাসতে হাসতে সাহেব আলী বলে:‘ স্যার অভ্যাস হইয়া গেইছে। জিবলাটা শাসন মানতে চায় না। মাফ কইরা দেন স্যার। এই যে ঢাকা শহরটা প্রত্যেক বছর কত কোটি কোটি টাকা খরচ কইরা ঠিক করা হয় তাও তো ঠিক হয় না, আজ ভালা তো কাল খারাপ। আজ ভাসে তো কাল ডুবে। জ্যাম থাইকা বাঁচার জন্য উড়াল সড়ক করলেন, শুরু হয়েছে তিন তলা জ্যাম।’
: থাম এবার থাম।
: গাড়ি গাড়ি তো থাইমাই আছে, দেহেন না জ্যাম। এখন আবার আইলো ব্রিষ্টি
: আরে বেটা গাড়ি থেমে আছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। তোকে থামতে বলেছি।
গোলাম আলী কি বলতে চাচ্ছে সাহেব আলী ঠিক বুঝতে পারছে না। সে আবার থামবে কি ভাবে। সে তো গাড়িতে বসে আছে। ফ্যাল ফ্যাল করে সাহেব আলী ওর সাহেবের মুখের দিকে তাকায়। এত দিনে গোলাম আলী তার ড্রাইভারের এই অভ্যাসের সাথেও পরিচিত হয়ে গেছেন। তাই তিনি আবার বলেন: আরে, এই থামা মানে তোকে কথা বন্ধ করে গাড়ি চালাতে বলছি।
: কিভাবে চালাবো স্যার। ওপরের দুই তলায় জ্যাম। নীচ তলা সাগর।
: উল্টা পথে চল।
: দুদক।
: আরে বেটা সে আমি দেখবো। সাংবাদিক, ক্যামেরা না থাকলে ওটা কোন ব্যাপার না।
: স্যার সাংবাদিক ক্যামেরাকে ডরান কেন?
: কে বলছে তোকে?
: এই যে কইলেন
: ছবিসহ পত্রিকায় ছাপলে দুই / তিন দিন হাউ-কাউ হবে এই যা তারপরও সব ঠাণ্ডা।
গোলাম আলীর কথা শেষ হওয়ার আগেই ড্রাইভার সাহেব আলী সাহেব সাহেব ভাব নিয়ে উল্টা পথে হাই স্পিটে চলতে শুরু করে। কপাল ভাল। দুদক, সাংবাদিক ক্যামেরা কারো সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় না। তবে সাহেব আলীর মুখ চলছে গাড়ির গতির সাথে তাল মিলিয়ে:‘ স্যার। এই যে উল্টা পথে চলছি। এতে নিজেরে রাজা রাজা লাগে। এর মজাই আলাদা। শো শো করে আমার গাড়ি চলছে আর হাজার হাজার মানুষ চাইয়া চাইয়া দেখছে কি যে স্ফূর্তি।’ গোলাম আলী ধমক দিয়ে ড্রাইভারকে থামতে বলেন।
৩
বৃষ্টি থেমে গেছে অনেক ক্ষণ। তারপরও সচিবালয়ের মাঠে পানি থৈ থৈ করছে। ড্রাইভার গাড়িটা নিয়ে সোজা ৮ নং ভবনের সামনে দাঁড় করায়। গোলাম আলী গাড়ি থেকে নেমে সোজা লিফট গিয়ে উঠেন। তারপরও নিজের অফিস কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে নেম প্লেটটার দিকে নজর বুলান- মি. জি আলী, সচিব, .. মন্ত্রণালয়। ইচ্ছে করেই সে মন্ত্রণালয়ের নামটা এড়িয়ে যান। কারণ এই মন্ত্রণালয়ে আসার তার কোন ইচ্ছে ছিল না। তার সাথে একই স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়া নোয়াজ আলী এই মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়। তিনিই জোর করে তাকে তার সাথে নিয়েছেন। চাকরি যেহেতু করতেই হবে, তাই সব অস্বস্তিকে কবর দিয়ে চেষ্টা করছেন কাজ করার। কিন্তু তারপরও মনটা মাঝে মাঝে বিদ্রোহী হয়ে উঠে। স্কুল জীবনের স্মৃতিগুলো বড় পীড়া দেয়। পড়া না পারার ভয়ে যে ছেলেটা কোন দিন সামনের বেঞ্চে বসতো না, সেই আজ তার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার পর কি করেছে, সেই খবরও গোলাম আলীর কাছে না থাকলেও মন্ত্রী মহোদয়ের বায়ো-ডাটায় পরিস্কার অক্ষরে লেখা- বিএ ( এলএলবি) , কলকাতা, ভারত। প্রথম দিন যখন বায়ো ডাটা হাতে নিয়ে মি. আলী বার বার নাড়া-চাড়া করছিলেন তখনই বিষয়টি নোয়াজ আলীর নজরে পড়ে।
তিনি হাসতে হাসতে তার সামনে এসে বলেছিলেন: আরে বন্ধু। স্কুল ছাড়লেও পড়া-লেখা ছাড়িনি। গোপনে গোপনে ডিগ্রিগুলো নিয়ে নিছি। এবার চিন্তা করছি পিএইচডি’টাও নিয়ে নিবো। নামের আগে ড. লিখলে ভালই লাগবে। মন্ত্রী যখন হয়েছি। পদের সাথে মানাবে কি বল। তোমার তাও দেখবো। একটা বিষয় ঠিক করে ফেলো। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির কোন একটা দিক নিয়েও করতে পারো। তুমি তো ভাল ছাত্র ছিলে তা পিএইচডি’টা করেনি কেন?
গোলাম আলী সেদিন কোন কথা বলতে পারেননি। আমলা সুলভ ভংগিতে বিনয়ের সাথে বলেছেন: না, স্যার তেমন কিছু না।
নোয়াজ আলী অট্টহাসি হেসে বলেছিলে: ‘আরে স্যার স্যার করতে হবে না। তুমি আমার লেংটা কালের বন্ধু। তবে হ্যা তোমাদের অফিসিয়াল ম্যানারের বিষয় যখন আসবে তখনকার কথা আলাদা। তুমি যা ভাল বুঝ করবে। তুমি তো জান তোমাকে আমার কাছে এনেছি কারণ..।’ না গোলাম আলী আর ভাবতে পারে না। অফিসের চেয়ারে বসার আগে মাথার ওপরে রাখা দু’টি ছবি দিকে ভাল করে নজর বুলায়। তারপর ডান হাতটা উচু করে গ্লাসে হাত দিয়ে দেখে ধুলো-বালি জমেছে কি না। তারপর মি. আলী স্বগতভাবে বলে উঠে: ‘না, আজ খুব ভালভাবেই পরিস্কার করেছে।’ তারপর শান্ত হয়ে বসে একটা একটা করে ফাইল উল্টাতে থাকে। সে যানে তার সরকারের নীতি হলো জনগণের কোন আবেদন নিবেদন আটকে রাখা যাবে না। আইন-কানুন, নিয়মনীতি দেখার আগে এই কথাটি মাথায় রাখতে হবে। আর জনগণ মানে সরকার দলের সমর্থক, কর্মী ও নেতারা। এটা রাজনৈতিক অভিধানের অলিখিত ভাষা। সরকারের সমালোচক, বিরোধী দলের নেতা-কর্মী সমর্থকরা হলেন দশে ও জনগণের শত্রু – অভিধানের অলিখিত এই ভাষাগুলো না বুঝলে সরকারের প্রকৃত গোলাম,কামলা কিংবা আমলা হওয়া যায় না এই যুগ। তা তার নাম গোলাম আলী হোক আর যাই হোক না কেন ?
কি রিং কি রিং করে ফোনটা বেজে উঠে।
গোলাম আলী ফোনটা তুলে বলেন: হ্যালো, আস সালামু আলাইকুম।
ওপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে নোয়াজ আলীর গলা: ওয়ালাইকুম। সর্বনাশ হয়ে গেছে।
: কেন, কি হয়েছে?
: কি আর হবে পত্রিকা পড়নোনি?
: কেন কোন পত্রিকা?
: এই যে আলো
: না ঐ সব পত্রিকা আমি পড়ি না। ওরা সরকারের ভাল কাজ চোখে দেখে না।
: সমস্যাটা তো ওখানেই।
: এবার তো আমাকে ধরছে।
: পত্রিকা কি পুলিশ না র্যাব আপনাকে ধরবে? আর আপনি হলেন ক্ষমতাসীন সরকারের মাননীয় মন্ত্রী , বিরোধী দলে যাওয়ার আগেই ধরা পড়ার চিন্তা করছেন কেন?
: আরে ভাই পত্রিকাটা সামনে থাকলে একটু দেখ
: আচ্ছা দেখছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। শক্তিশালী বিরোধী দলহীন দেশে পত্রিকা,টেলিভিশন কোন ফ্যাক্টর না।
: আচ্ছা তা যেন হয়। মানি ইস নো মেটার। যা করার কর।
: ‘জু হুকুম মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়।’ বলে মি. গোলাম আলী টেবিলে রাখা পত্রিকাটা কাছে টেনে নিয়ে তাতে চোখ রাখে-‘রডের বদলে বাঁশ!’ শিরোনাম দেখে তাচ্ছিল্যের সাথে রেখে দিয়ে মনে মনে বলে এ আর নতুন কি। দেশীয় প্রযুক্তির সাশ্রয়ী ব্যবহার। এতে এতো অস্থির হওয়ার কি আছে। এত ওপরে এর কোন ধাক্কাই আসবে না। ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার বড়জোর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সাময়িক বহিষ্কার। তারপর যা শুরু হবে তাকে বলা যায় আমাদের পকেট করার প্রকল্প। ওরা আসবে শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে। আমরা দাবি করবো দায় মুক্তি ফি। এভাবে কাটবে কিছু দিন। তারপর সব ঠাণ্ডা। প্রমোশনসহ কর্তারা আবার স্ব স্ব পদে বহাল হবেন। তার ওপর যা হবে তা আরো মজার। সরকার বদল হলেই এই সাময়িক বরখাস্তের সার্টিফিকেট দেখিছেন ওরা বলবে,‘ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হয়েছিলাম। এবার এর প্রতিদান চাই।’ সেই আমলে যে নোয়াজ আলীরা মন্ত্রী হয়ে আসবেন তারা সুদে আসলে প্রতিদান দিয়ে উচ্চ পদে ওনাদের বসাতে কসুর করবেন না।
৪
ফ্যানটা বন্ধ। এসির ঠাণ্ডা বাতাস। হিম হিম ভাব। বাইরের প্রচণ্ড গরমের কোন ছোঁয়া রুমের মধ্যে নেই। সাকিলা নরম মখমলের বিছনায় কাধ হয়ে শুয়ে আছে। হাতে আই ফোন সেভেন। হরিণের মতো চঞ্চল চোখ দুটিতে কোন পলক পড়ছে না। ফেসবুকের নিজে প্রোফাইলের ছবিগুলো দেখছে। একটা ছবি যেন শুধূ ছবি নয়। তার জীবনের মহাকাব্য। বর-কনের ছবিতে আটকে গেলো সাকিলার চোখ। বর আর কনে অন্য কেউ নয়। গোলাম আলী আর সাকিলার ছবি। দু’জনের মাঝে সাকিলার বাবা। গোলাম আলীর সাথে গাড়িতে তুলে দেয়ার আগ মুহূর্তের ছবি। বধূ বেশে ওকে অপরূপ খুব সুন্দরী লাগছে। নিজেকের নিজের কাছেই বড় অচেনা মনে হচ্ছে। ভার্সিটি থেকে সদ্য পাস করা সুন্দরী তরুণী। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনেক ক্লাসমেট, সিনিয়র ভাই এমন কি জুনিয়রদের স্বপ্নের রাণী ছিল সাকিলা। কিন্তু লেখা-পড়া নিয়ে সে এত ব্যস্ত থাকতো যে রোমিওরা পাত্তাই পেতো না। ক্যাম্পাস জীবনের সোনালি অতীত স্মৃতি মন্থন করলে অনেক ছবিই তার মনের পাতায় ভেসে ওঠে। কিছু কিছু তাকে হাসায় কিছু তাকে কাঁদায়ও।
সাকিলার বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। সৎ ও কর্তব্য নিষ্ঠ অফিসার হিসেবে পুলিশ বিভাগে সুনাম থাকলেও কোন পুরস্কার তার ভাগ্যে জুটেনি। কারণ কোন সরকারই তাকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনি। প্রতিদান ছাড়া কি কেউ কাউকে কিছু দেয়। দেশ. জনগণের সেবায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন তার বাবা। বিনা কারণে বিনা বিচারে মানুষ মারা দূরের কথা এক পাতা ছিঁড়ার বিরোধী ছিলেন তিনি। অপরাধ দমনে তিনি ছিলেন খুবই কঠোর। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষ তাকে বন্ধুর মতো ভালবাসতো। অপরাধীরা তার নাম শুনলে ভয়ে কাঁপতো। কারণ তাকে টাকার বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয় এক কথা তারা খুব ভালভাবেই জানতো। বাবার এই সততার কথা ভাবতেই গর্বে সাকিলার বুকটা ফুলে ওঠে। তার বাবা বলতেন: প্রত্যেকটা কাজের জন্য মানুষকে আল্লাহর কাছে হিসেব দিতে হবে। সেই দিনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আল্লাহতায়ালা যে পুরস্কার দিবেন তার সাথে দুনিয়ার কোন কিছুর তুলনা চলে না। বাবার সাথে দুনিয়ার কারো তুলনা করতে পারে না। সাকিলার বাবা আজ দুনিয়ায় নেই। এই শূন্যতা অন্য কিছুতে পূরণ হওয়ার নয়। তবে বাবার কথা ভাবলে মনটায় এক অন্যরকম ভালা লাগা এসে ভর করে। কারণ তার আত্মবিশ্বাস একজন ভাল মানুষ হিসেবে আল্লাহ পরপারে তাকে ভালই রেখেছেন।
‘টুং’। নোটিফিকেশনের শব্দে সাকিলার ভাবনায় ছেদ পড়ে। নজর চলে যায় নোটিফিকেশনের দিকে:‘ দুই দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২০ জন নিহত।’ ওর বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে ওঠে। যারা নিহত হয়েছে তারা সবাই কি অপরাধী হবে হয় তো বা। হয় তো বা নয়। তার মানেটা খুবই ভয়ংকর। না সে আর ভাবতে পারে না। বন্দুকযুদ্ধের কথা শুনলেই তার সামনে মনে পড়ে যায় তারেকের কথা। ছেলেটা ওর সাথেই ভার্সিটিতে পড়তো। একটা ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিল। সংগঠনটা ঠিক নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু ওদের জনপ্রিয়তাই ওদের জন্য কাল হয়েছে,‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরি।’ তারেক গ্রেফতারের পরের দিন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। সাকিলা ভাবতেই পারে না। একটা গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি করার কারণে এভাবে কাউকে মরতে হয়। তারেকের সততা ও নম্র ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করতো। সে মেয়েদের সাথে খুব একটা মিশতো না। অন্য বন্ধুদের মতো ওর রূপে সে মুগ্ধ ছিল এমনটাও বোঝা যেত না। কারণ কথা বলার সময় চোখ দু’টো সব সময় অবনত থাকতো। অতীত স্মৃতি কাতর সাকিলার চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। সে ্আবার ফিরে যায় ফেসবুকের অ্যালবামে। তার বিয়ের ছবিগুলো একটি একটি করে দেখেতে থাকে। তার মনে পড়ে মা যেদিন প্রথম গোলাম আলীর ছবিটি তার হাতে দিয়ে বলেছিল দেখ তো মা, ছেলেটাকে তোমার পছন্দ হয় কি না। লজ্জায় সে ছবিটি ফেলে নিজের রুমে বালিশে মুখ লুকাচ্ছিলো। পড়ে মা এসে ছবিটা টেবিলে রেখে যান। সাকিলা ছবিটি লাজ রাঙামুখে হাতে নিয়ে দেখে, সদ্য বিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তরুণ। চোখে মুখে বুদ্ধির দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে। একহারা সুন্দর গঠন। ছবিতে গায়ের রঙ খুবটা একটা বুঝা না গেলেও সে মনে মনে কল্পনা করে নেয় উচ্চ শ্যামবর্ণ। যে কোন মেয়ের মনকাড়ার মতো ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক তরুণ। কিন্তু নামটা জানার পর সাকিলার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এখন অবশ্য সেই মন খারাপ ভাবটা নেই। কেন নেই? এ প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর তার কাছে না থাকলেও। মনে মনে সাকিলা একটা যুক্তি দাঁড় করিয়েছে, না শুধু যুক্তি নয়। বাস্তবটাও সে বিয়ের পর জেনেছে। গোলাম আলীর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত গজল গায়ক উস্তাদ গোলাম আলীর ভক্ত। তাই তিনি তার ছেলের নাম রেখেছিলেন তার প্রিয় শিল্পীর নামে। মন খারাপ না হওয়ার পরের কারণটা আরো চমৎকার। সেই কারণটি হলো এখন আর তার স্বামীকে কেউ গোলাম আলী নামে জেনে না। তিনি এখন মি. জি আলী। আর সরকারি বড় আমলার স্ত্রী হওয়ার সুভাগ্য অনেক অনেক বড় বড় কর্তকর্তাদের মেয়েরও না। কিন্তু সাকিলা ভাবে তার বাবা ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। তিনি ছিলেন সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ অফিসার। শুধু পুলিশ বিভাগে নয়। তিনি যখন এলাকায় দায়িত্ব বদলি হয়েছেন সুনামের সাথেই দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন সেই সব এলাকার মানুষ শ্রদ্ধার সাথে তার বাবাকে মনে রেখেছে। তার বাবা তাদেও জন্য ধন-সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার রেখে যাননি। কিন্তু সবাইকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। একমাত্র মেয়ে সাকিলাকে যোগ্য পাত্র দেখে বিয়ে দিয়েছেন। সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠায় তার স্বামীরও সুনাম আছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর তার দফতরও বদল হয়েছে। গোলাম আলীর দফতরের মন্ত্রী এখন তার বন্ধু। অবশ্য গোলাম আলী তাকে বন্ধু নয় ক্লাস এইটের ক্লাসমেটের বেশী কিছু ভাবে না। তার স্বামীর মানসিক কষ্টের কারণ সাকিলা বুঝে কিন্তু দেশ পরিচালনার পদ্ধতি বদলনোর ক্ষমতা তো তার নেই। দেশের রাজনীতি থেকে সৎ যোগ্য দেশপ্রেমিকরা আস্তে আসেত নির্বাসিত হয়ে যাচ্ছে। কারণ সৎ যোগ্যরা ছোট-খাট মতপার্থক্যেও কারণে আজ বিচ্ছিন্ন। তাদের অনৈক্যের সুযোগে দিন দিন মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। সমাজে সৎ যোগ্য দেশপ্রেমিক লোকের অভাব নেই। সরকার, বিরোধী দল, সচিবালয়, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী,ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সবার সব জায়গাতেই সৎ যোগ্য দেশপ্রেমিক লোক আছে। কিন্তু অসৎ অযোগ্য গাদ্দারদের হুমকি-ধামকি বেশী। তাই মানুষ ভুল করে। তারা ভাবে গোটা সমাজই নষ্ট হয়ে গেছে। এই ভুল ভাঙাতে পারলেই আবার আলোয় আলোয় ভরে উঠে প্রতিটি আঙ্গিনা। কিন্তু কে জ্বালবে সেই আলোর মশাল?
৫
অফিসের সময় শেষ হয়েছে আরো দুই ঘন্টা আগে। মি. জি আলীর এখনো ছুটি হয়নি। সাংবাদিক সম্মেলন শেষ করে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছেন মাননীয় মন্ত্রী নোয়াজ আলী। অনেক ক্ষণ দুজন চুপচাপ বসে আছেন। কারো মুখে কোন কথা নেই। প্রথমে মুখ খুললেন নোয়াজ আলী: ‘দোস্ত কিছু একটা কর।’
জি আলী শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলেন: মাননীয় মন্ত্রী, এটা কোন বিষয় নয়। মন্ত্রণায়ল তো বাঁশ ব্যবহার করেনি। সাংবাদিকদেরকে যে কথা বলেছেন সেই কথায় অটল থাকেন।
: অনেক কথাই তো সাংবাদিকদের বললাম। কোন কথাটায় অটল থাকবো।
: ঐ যে ঐ কথাটা ‘ দায়ীদের ব্যাপারে আমার সরকার জিরো টলারেন্স। কোন ক্ষমা নেই।’
: তুমি তো সব জানো। ওরা আমার পার্টির লোক। সত্যি সত্যি কঠোর হলে আগামী নির্বাচনে আমার পক্ষে কাজ করবে তো?
গোলাম আলীর একটু রাগ মিশিয়ে বলেন,‘ তাহলে ছেড়ে দেন…’
: তা তো বুঝলাম দোস্ত, কিন্তু বেশী লেখা-লেখি হলে তো আবার মনোনয়নই পাওয়া নিয়েই সমস্যা হবে , পার্টি তখন খুজে ক্লিন ইমেজ
: আরো দুটি জিনিসও খুঁজে ?
: সেই জিনিসটা কি?
: মানি ও ম্যাশলম্যান।
: ঐ দুই জিনিসের জন্যই তো প্রশ্রয় নিতে হয়, কিন্তু বেটা মিডিয়ার বেকুবগুলো তা বুঝতে চায় না।
: মাননীয় মন্ত্রী একটু খুব সাবধান, দেয়ালের কান আছে, মিডিয়াকে আর …
: স্যরি, স্যরি
: সাংবাদিকরা দুধে ধোয়া সোনা-রূপা না হলেও কিছু সত্য কথা বলে বলেই রাক্ষসদের কবল থেকেটা কিছুটা হলেও দেশটা বেঁচে আছে
: মানে
: স্যরি আপনাকে কিছু বলিনি। যারা দেশ ও জনগণের সম্পদ লুটেপুটে খাচ্ছে তাদের বলছি।
মনের ক্ষোভ আর কষ্টটাকে চেপে রেখে হাসতে হাসতে নোয়াজ আলী বলেন: ‘তা তো জানি। তুমি আমার ল্যাংটা কালের দোস্ত। আমাকে খুব ভালভবেই চেনো। আমি তো নিজের জন্য কিছু করি না। নিজেকে দেশ ও জনগণের জন্য উৎর্স করেছি।’ নোয়াজ আলীর কথা শুনে জি আলীর রাগ ক্ষোভ বেড়ে যায়। তিনি বলেন: ‘জি মাননীয় মন্ত্রী স্যার।’ জানু পলিটিসিয়ান হিসেবে নোয়াজ আলীর বুঝতে অসুবিধা তার মন্ত্রণালয়ের সৎ দক্ষ জানু সচিব তার শঠতাকে ভালভাবে নিচ্ছে না। তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন:‘ বন্ধু দুনিয়াগিরি আর ভাল লাগে না। ভাবছি এবার একটু ধর্মকর্মে মন দিবো। নির্বাচনের আগে ওমরা হজ্জটা করে প্রচারণায় নামবো।’
: নির্বাচনের আগে তা বটে তা বটে। চলেন এবার উঠি। চিন্তা করে লাভ নেই। যার যার কর্মের ফল তাকে ভোগ করতেই হবে।
: সেই ছাত্রজীবনের মতো এখনো তুমি সেই দার্শনিক দার্শনিক কথা বলো। কথায় আমি সৎ সঙ্গ স্বর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। তোমার সংস্পর্শে থেকে যদি স্বর্গে যেতে পারি
: ‘বন্ধু স্বর্গ নরক নয়, বললো জান্নাত-জাহান্নাম। মৃত্যুর পর যাদের দেহ পুড়ে ছাই করা হয়, ওরা পূর্ণজন্ম আর স্বর্গ নরক খুঁজে। তোমার আমার শেষ ঠিকানা জান্নাত নয় তো জাহান্নাম।’ কথা বলতে বলতে পাইক-পেয়দা বরকন্দাজদের সাথে নিয়ে ওনারা লিফটে উঠেন।
চার দিক ঘন অন্ধকার। লিফটটা আর চলছে না। এক সাথে সবার মোবাইল ফোনের ফ্লাস লাইট জ্বলে ওঠে তারপরও অন্ধকার দূর হয় না। নোয়াজ আলী চিৎকার করে উঠেন:‘কি ব্যাপার! কি হলো?’ তিনি যে ভয় পেয়েছেন তা স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রথমে সবাই ভেবেছিল বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরে বুঝতে পারেন, না এটা বিদ্যুৎ বিভ্রান্ট নয় লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটি।
৬
কথায় আছে দুঃসময় সহজে শেষ হয় না। লিফটের ভিতর আটক এই সময়টাও যেন শেষ হচ্ছে না। গোলাম আলী ছাড়া ভয়ে সবার গলা শুকিয়ে গেছে। বাইরের কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। যতই সময় যাচ্ছে ভিতরের অক্সিজেন শেষ হয়ে কার্বনডাই অক্সাইডের পরিমাণও বাড়ছে। গুমট অবস্থায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঘামের গন্ধে বমি বমি লাগছে গোলাম আলী ও মন্ত্রী মহোদয়ের। এমন দুঃসহ অবস্থায় অতি বড় নাস্তিকরাও জীবন বাঁচানোর জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনায় কসুর করেন না। আর আজ যারা আটকা পড়েছেন তারা কেউ আর যাই হোক নাস্তিক নন। বড়জোর আল্লাহর পাপী বান্দা। গোলাম আলী নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন, সিয়াম পালন করেন, সময় সুযোগ পেলে কোরআন হাদিস অধ্যয়ন করেন। ইউটিউবে দেশ-বিদেশের ইসলামিক স্কলারদের ওয়াজ নসিয়ত ও লেকচারও শুনেন। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় নিয়মিত না করলেও নির্বাচনী এলাকায় গেলে আযান হলে বক্তৃতা বন্ধ করে মসজিদে ছুটে যান। প্রতি শুক্রবার,ঈদের জামায়াতে ও জানাজায় প্রথম কাতারে থাকার চেষ্টা করেন। অন্যরাও সাধারণ মুসলমান।
গোলাম আলীর ক্লাস এইটের ক্লাসমেট মন্ত্রী হয়ে মাথার ওপর বসার পর তার মনের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত তোলপাড় চলছে বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এর কোথায় যেন একটা মিল আছে। তাই জীবন-মৃত্যুর মাঝা-মাঝি এমন একটা অবস্থার মধ্যেও তার মনের ভিতর কোন ভয় কাজ করছে না। বরং কেন যেন মনে হচ্ছে এই ছোট্ট লিফটটাই তার দেশ। তার কর্মস্থল। অক্সিজেন বন্ধ হওয়া বমি বমি ভাব দেশের এমন অবস্থার সাথে বেমানান কিছু নয়। বরং এটাই কঠিন বাস্তবতা। কঠিন সত্য। এই সত্যকে মেনে নিয়েই অপেক্ষা করতে হবে। মনে শক্তি ও সাহস আনতে হবে দেশের এই বন্দী দশায়। হঠাৎ বাইরের হট্টগোলের শব্দ ওদের কানে আসে। কারা কী আওয়াজ করছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু গোলাম আলীর মনে হচ্ছে- এক দল লোক শ্লোগান দিচ্ছে:‘ মুক্তি চাই দিতে হবে। জেলের তালা ভাগবো।’ একটু পরেই গোলাম আলীর ঘোর কেটে যায়। সে বুঝতে পারে লিফটের বন্দী দশা থেকে তাদের মুক্ত করতে দমকল বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। তাদের হট্টগোলের শব্দই শ্লোগানের মােত কানে বাজচ্ছে। তিনি মনে মনে নিজের মনকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন,‘ যাক আর কিছু ঘোরের মধ্যে থাকলে হয় তো মিছিলে গুলি হচ্ছে এমন কোন শব্দ তার কানে বাজতো।’
লিফটা একটু একটু কওে ফাঁক হচ্ছে। অনেক ক্ষণ অন্ধকারে বন্দী থাকার পর গোলাম আলীর মনে হয় লিফটের ফাঁকের আলোর ঝলকানি নয়। দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে দেশবাসী মুক্তি দিবে পুব আকাশে নতুন সূর্য উঠছে।
( এই উপন্যাসের সকল চরিত্র,ঘটনা প্রবাহ কাল্পনিক। বর্তমান কিংবা অতীতের কোন ঘটনার সাথে কোথাও কিছু মিলে গেলে তা কাকতলীয়। এর জন্য লেখক, সম্পাদক প্রকাশক দায়ী নন।-বি.স)

























