প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হচ্ছে, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর ভালোবাসা ততই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মানুষের আচরণ দেখে সমাজের ছোট-বড় পার্থক্য করা আজ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। না আছে বড়দের সম্মান, না আছে শ্রদ্ধাবোধ। ফেসবুক খুললেই টাইমলাইনজুড়ে বড়দের নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে দেখা যায়। ঠুনকো বিষয় কেন্দ্র করে যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদেরও নানারকম নেতিবাচক মন্তব্যে জর্জরিত করা হয়। ‘আমিই সঠিক বুঝেছি; আমার উস্তাদরা ভুল বুঝেছেন বা আমার বড়রা দ্বীন বোঝেননি, দ্বীনের দাবিসমূহের ব্যাপারে তাদের খবর নেই, তাদের মধ্যে দ্বীনের দরদ নেই’- এরকম একগুঁয়ে একটি মনোভাব বর্তমান উঠতি বয়সী তরুণদের মধ্যে চরমভাবে জেঁকে বসেছে। দ্বীন ও উম্মাহর জন্য তাদের যেসব খেদমত ও অবদান সেগুলো স্বীকার করতে তারা যেন সঙ্কীর্ণতা বা কষ্ট অনুভব করছে। অথচ বড়দের অগ্রাধিকার দিতে, শ্রদ্ধাবোধ আর সম্মান প্রদর্শন করতে আমাদের নবীজী সা: আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা: হতে বর্ণিত- নবী করিম সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং বড়দেরকে সম্মান করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (আবু দাউদ-৪৮৪২)।
নবী করিম সা: বড়দের সম্মান প্রদর্শন না করার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি বার্তা উচ্চারণ করার পাশাপাশি কার্যক্ষেত্রেও বড়দের অগ্রাধিকার দিয়ে উম্মতকে দেখিয়ে গেছেন। বর্ণিত হয়েছে- ‘কয়েকজন লোক একবার একটি হত্যা মামলা নিয়ে নবীজীর কাছে এসেছেন। নিহতের ছোট সন্তান আগ বেড়ে কথা বলতে চাইলে নবীজী সা: তাকে থামিয়ে বড় ভাইকে কথা বলার আদেশ দিলেন’ (সুনানে আবু দাউদ-৬১৪২)।
নৈতিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা : জীবনে চলার পথে প্রত্যেক মানুষের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো নৈতিক মূল্যবোধ। আর একটি সুশৃঙ্খল সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের ডাল-পালা মেললে অন্যায়, অপরাধ, অপসংস্কৃতি বেড়ে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। তখন আর এ কথা বললে চলবে না যে, ‘অবক্ষয়ের চোরা স্রোত বইয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজে’ বরং বলতে হবে ‘চোরা স্রোত নয়, রীতিমতো বন্যার মতো অবক্ষয় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজটাকে।’
নবীনদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা : আজকের তরুণরাই জাতির আগামী দিনের কর্ণধার। বাস্তবিকভাবে পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তরুণদের অবদান অনস্বীকার্য। পরিবার গঠন, উন্নয়ন ও সমাজের কল্যাণে কর্মময় জীবন ব্যয় করে এক সময় তারা বার্ধক্যে উপনীত হন। তাদের বেড়ে ওঠা ও প্রাপ্ত শিক্ষার ওপর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ভর করে। তাই তরুণ প্রজন্মকে এবং তার ভবিষ্যৎ ও নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের প্রবীণদেরই ভাবতে হবে। প্রবীণদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা আর সযতœ পরিচর্যায় নবীনরা বেড়ে উঠলে আশা করি বড়দের প্রতি নেতিবাচক ধারণা জন্মানোর এ প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
বিগত কয়েক দশক ধরে এই প্রচেষ্টা আর সযতœ পরিচর্যার অভাবেই সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক অবক্ষয়, নতুন প্রজন্ম ধাবিত হচ্ছে অধঃপতনের দিকে আর নানারকম একগুঁয়ে মনোভাব তাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা যদি এখন থেকেই সচেতন না হই, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তাহলে তরুণ প্রজন্মের ধ্বংস অনিবার্য, যা পুরো জাতির জন্য এক মহাসর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আর আমরা যারা ছোট আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যদি বড়দের সম্মান না দেই, তা হলে ছোটরাও আমাদের সম্মান দেবে না, এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। তাই সচেতন হতে হবে আপনাকে আমাকে। যার যার অবস্থান থেকে মানবিকতা, নৈতিকতা, নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও সৌজন্য প্রদর্শন এবং ভালো ব্যবহার করতে হবে। তবেই অন্যজন শিখবে। আমি অন্যের সাথে ভালো ব্যবহার করলে, তার বিনিময়ে আমিও ভালো ব্যবহার পাব। তাই আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে, তারপর অন্যকে সচেতন করার কথা ভাবতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুক। লেখক : শিক্ষার্থী, উচ্চতর গবেষণা বিভাগ, শায়েখ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা