ইসলামে নারী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে নারী শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশেষ করে একটি পরিবারকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর তাই তো বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা: আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শ’ বছর আগে সর্বপ্রথম নারী জাতির পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারীর শিক্ষা বিস্তারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে ইতিহাসে কালজয়ী অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। ইসলাম নারীকে যে গুরুত্ব ও মর্যাদা দান করেছে, তা পৃথিবীতে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এমনকি ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে তা অতীত ও বর্তমানের কোনো রাজা বা রাষ্ট্র দান করতে পারেনি।
শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলাম নারী-পুরুষকে দিয়েছে সমান অধিকার। ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা: শিক্ষাকে শুধু নারীর অধিকার সাব্যস্ত করেননি; বরং আরো একধাপ আগে বেড়ে শিক্ষাকে নারী-পুরুষ সবার জন্য আবশ্যক করে দিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য শিক্ষা গ্রহণ আবশ্যক। নারী শিক্ষার গুরুত্ব চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে সহি বুখারির ৭৩১০ নং হাদিসে। একবার এক নারী রাসূল সা:-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাদিস তো শুধু পুরুষরা শুনতে পায়। সুতরাং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করুন। যেদিন আমরা আপনার কাছে আসব, আল্লাহ আপনাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তা থেকে আপনি আমাদের শেখাবেন।
তিনি ইরশাদ করেন, তোমরা অমুক অমুক দিন অমুক জায়গায় একত্রিত হবে। সে মোতাবেক তারা একত্রিত হয়। নবী সা: তাদের কাছে আসেন এবং আল্লাহ তাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তা থেকে তাদের শিক্ষা দেন এবং রাসূল সা: বাঁদীদেরও শিক্ষাদানের ব্যাপারে মুসলিম সমাজকে উৎসাহিত করেন। অথচ তাদের শিক্ষার ব্যাপারে কেউ কোনো দিন চিন্তাও করত না। তিনি ইরশাদ করেন, কারো যদি বাঁদী থাকে আর সে তাকে উত্তমরূপে বিদ্যা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে আজাদ করে দেয়। এরপর তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে, তার জন্য দু’টি পুরস্কার। (বুখারি-৯৭)
এভাবে মহানবী সা: মুসলিম নারীদের অন্তরে শিক্ষার তীব্র স্পৃহা তৈরি করেছিলেন। যার ফলে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে ইসলামের প্রথম যুগের নারীরা ব্যাপকভাবে সাড়া দেন। ইবনে সাদ তার ‘তাবাকাত’ নামক গ্রন্থে ৭০০ নারীর নাম উল্লেখ করেছেন, যারা রাসূল সা: থেকে বা তার সাহাবিদের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা: হলেন নারী শিক্ষার উজ্জ্বল নক্ষত্র। বড় বড় সাহাবিও তার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
নবী সা:-এর যুগে এবং পরবর্তী যুগগুলোতেও মুসলিম নারীরা চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে শুরু করে কাব্য, সাহিত্য, আইন প্রভৃতি সব বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যেমনÑ রুফাইদা আল ইসলামিয়া ছিলেন মসজিদে নববীতে স্থাপিত যুদ্ধাহত সৈন্যদের হাসপাতালের অধ্যক্ষ। উইকিপিডিয়াতে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, রুফাইদা রা: ছিলেন বিশ্বের প্রথম নার্স ও মহিলা সার্জন। শিফা বিনতে হারেস ইসলামের সর্বপ্রথম পারিবারিক শিক্ষিকা ছিলেন। নারী তাবেয়িনদের মধ্যে হাফসা বিনতে সিরিন ইবাদত, ফিকহ ও কুরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. নারী শিক্ষিকা নাফিসা বিনতুল হাসানের দরসে অংশগ্রহণ করতেন এবং তার থেকে হাদিস শুনতেন। উম্মে সুলাইম বিনতে মিলহান ও উম্মে শারিক ইসলামের প্রসিদ্ধ দাওয়াত দানকারী নারী ছিলেন। সুতাইতা আল মাহামালি নামক এক নারী গণিতশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
এভাবে বলতে গেলে জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে নারীপ্রগতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় রচনা করেছে ইসলাম। এমনকি বিশ্বের প্রথম সনদ প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন একজন মুসলিম নারী, যার নাম ফাতেমা আল ফিহরিয়া। মোটকথা, ইসলামের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে এভাবেই বহু মুসলিম নারী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় সফলতার সাক্ষর রেখেছিলেন। নারী শিক্ষার উন্নয়নে ইসলামের অগ্রণী ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল।
লেখক : প্রবন্ধকার