ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে গতকাল শনিবার (১০ অক্টোবর) কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে রাজধানী দিল্লি। বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া দশ হাজারেরও বেশি বিরোধী দলের নেতা ও অধিকারকর্মী আটক করেছে পুলিশ।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, অধিকারকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা বোরা।
গতকাল শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের কর্মসূচি ছিল। তবে সেখানে যাওয়ার বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসায় পুলিশ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত কোনো বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারেননি। বেলা ২টা ৪৯ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটক করা হয়।
পুলিশের দাবি, যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথে অন্তত ২০০ জনকে আটক করার পর আন্দোলনকারীরা সমর্থকদের দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। সেখান থেকে মিছিলের নেতৃত্ব দেন নেহা বোরা ও যোগেন্দ্র যাদব। আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও সেখানে ছিলেন। পরে তাঁদের আটক করা হয়।
দিল্লিতে নিজের বাসভবনের বাইরে থেকে মমতা ব্যানার্জী ও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য নেতাদের আটক করা হয়। অন্যদিকে, যন্তর মন্তরের কাছ থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও দিল্লি আম আদমি পার্টির নেতা সৌরভ ভরদ্বাজকে আটক করে পুলিশ। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে নিয়ে যাওয়া হয় ছত্রশাল স্টেডিয়ামে। এর আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নেতাদেরও আটক করা হয়। বিমান দিল্লিতে অবতরণের পরপরই বিমানের ভেতর থেকে অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের আলাদা আলাদা আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
কয়েক ঘণ্টা পর সিজেপির পক্ষ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে জানানো হয়, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেবেন অজিঙ্ক শিন্ডে।
এদিকে, ইউটিউবে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ অনুসারী থাকা ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র। গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬ এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাজধানীর প্রায় ৪৫টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। দুপুর ২টা পর্যন্ত ২৫০টিরও বেশি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়।
পুলিশ সূত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে জানিয়েছে, বিক্ষোভের আগের রাতেই অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীতে ব্যাপক ধরপাকড় ও যাতায়াতে বিধিনিষেধের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
দিল্লি জুড়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি
দিল্লিতে পুলিশের পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনীর ‘যুদ্ধকালীন মোতায়েনকে’ লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ও জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক শশী থারুর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, রাত ২টার পর দিল্লিতে ফিরে এমন পরিস্থিতি খুব কমই দেখেছেন।
থারুর বলেন, ‘মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেয়া হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নাগরিকেরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রশ্ন তুলতে না পারেন, সে জন্যই এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ারও সমালোচনা করেছেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, এটি সবচেয়ে পশ্চাৎমুখী ও দমনমূলক পদক্ষেপগুলোর একটি। থারুর আরও বলেন, নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এড়াতে যে সরকার নিজের রাজধানীকেই দুর্গে পরিণত করে, তারা আসলে মানুষের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
তিনি বলেন, ‘ব্যারিকেড দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা ফেরানো যাবে না। জনসাধারণের প্রশ্নের জবাব যত দ্রুত দেয়া হবে, পরিস্থিতি তত দ্রুত শান্ত হবে।’
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বামপন্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গতকাল শুক্রবার থেকেই থমথমে দিল্লি। বিক্ষোভ দমাতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী দিল্লিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে। শনিবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
এদিন বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে পৌঁছনো মাত্রই আটক করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বকে। আটক হয়েছেন বামপন্থী ছাত্র নেত্রী নেহা বোরা ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও । এ ছাড়া দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও আটক করেছে পুলিশ।
বিবিসির লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসকে বিমান থেকেই আটক করেছে পুলিশ। এর আগে সকালেই ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে তার বাড়ি থেকেই আটক করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে একাধিক জায়গায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক লিদিয়া পলগ্রিন বলেছেন, দিল্লির রাস্তাজুড়ে পুলিশি তা-ব চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, পুলিশ রাস্তায় যাকে পাচ্ছে, তাকেই ধরে বাস ও পুলিশের ভ্যানে তুলে নিচ্ছে।
সংবাদ শিরোনাম
দিল্লি জুড়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি: দশ হাজারেরও বেশি আটক
-
আন্তর্জাতিক ডেস্ক - আপডেট সময় ০৮:০৪:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- 5
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























