ঢাকা ০২:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি কুপ্রথা

আমাদের সমাজে একটি প্রথা প্রচলিত আছে, তা হলো, পবিত্র ঈদুল আজহার সময় মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু পাঠাতে হয়, বিশেষ করে নববিবাহিত মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু ও ঈদ উপহার পাঠানো বাধ্যতামূলক মনে করা হয়। ঈদ এলে কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় কোরবানির পশু এলো, তা নিয়ে এলাকা সরগরম থাকে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই বরপক্ষের লোকদের মনে আশা জন্মায় যে আমাদের ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে এমন কিছু আসুক, যা এলাকায় আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। মেয়ের পক্ষের লোকদের মাথায় থাকে, মেয়ের জামাইকে ঈদে বড় কোরবানির পশু না দিতে পারলে মানসম্মান থাকবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো মেয়ে অত্যাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। কেউ সন্তুষ্টচিত্তে কোনো রকম চাপ ছাড়া তাঁর মেয়েকে কোরবানির পশু উপহার দিলেও তা অনেকের বিপদের কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। নি¤েœ এ রকম কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো, যেগুলোর কারণে যৌতুকের পশুতে কোরবানি বিপজ্জনক হতে পারে।
যৌতুক হওয়ার কারণে : এ উপহার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যৌতুকের পর্যায়ে পড়ে। খুব কম মানুষই কোনো ধরনের চাপে না পড়ে সন্তুষ্টচিত্তে এসব উপহার দেয় না কিংবা যা দিচ্ছে, তা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না।
যৌতুক মূলত চাপ সৃষ্টি করে অন্যের সম্পদ নেওয়া। ইসলামে এটি জুলুম ও অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে হারাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ কোরো না এবং তা বিচারকদের (ঘুষ হিসেবে) প্রদান কোরো না, যাতে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ পাপের মাধ্যমে জেনেবুঝে খেয়ে ফেলতে পার।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)
বোঝা গেল, অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ ভক্ষণ মুমিনের জন্য হালাল নয়। আর আল্লাহ হালাল ও উৎকৃষ্ট বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।
হাদিসে আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি শুধু পবিত্র (হালাল) জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৩৬)
অতএব, জবরদস্তি বা সামাজিক চাপে আদায় করা সম্পদ দিয়ে কোরবানি করলে তা কবুল হবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায়। ইবাদত সামাজিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা : সাধারণত যৌতুকের পশু ‘মানসম্মানের’ প্রতীক হয়ে যায়। তখন মানুষকে ধোঁকায় ফেলা শয়তানের জন্য সহজ হয়। কোরবানির মহৎ উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হলেও শয়তান মানুষের অন্তরে প্রশংসা ও বাহবা প্রাপ্তির বাসনা তৈরি করে, এটাও কোরবানির মহিমা ক্ষুণ্ন করার প্রবল আশঙ্কা তৈরি করে। কারণ কোরবানিতে আল্লাহর একনিষ্ঠতা ও তাকওয়াই মুখ্য। ভিন্ন নিয়ত ও প্রদর্শনীর মাহাত্ম্য নষ্ট করে দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে না পৌঁছে এগুলোর গোশত, না পৌঁছে রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
যখন কোরবানির পশু ‘কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় পশু এলো’—এ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন ইখলাস নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে।
অহংকার ও গর্ব সৃষ্টি হওয়া : সাধারণত যৌতুকের পশু নিয়ে পরিবার বা ব্যক্তি যদি গর্ববোধ করে, ‘আমাদের অমুকের শ্বশুরবাড়ি থেকে এত বড় পশু পাঠানো হয়েছে’, ‘আমরা অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারে আত্মীয়তা করেছি, প্রতিবেশীরা তুচ্ছ’ এগুলোও নিয়তকে কলুসিত করে। আর পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৮)
সামাজিক কুপ্রথাকে শক্তিশালী করা : যৌতুকের পশু গ্রহণ করলে সমাজে এ ধারণা শক্ত হয় যে বিয়েতে মেয়েপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা স্বাভাবিক বা এসব রেওয়াজ পালন করা বাধ্যতামূলক। ফলে এটি জুলুমে সহযোগিতার শামিল হয়ে যেতে পারে। অথচ ইসলাম জুলুমে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মন্দকর্ম ও সীমা লঙ্ঘনে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
অতএব, যৌতুকের পশু গ্রহণ এবং তা দিয়ে কোরবানি করা অনেক সময় একটি সামাজিক কুপ্রথাকে স্বাভাবিক করে দিতে পারে।
তাই যারা বরপক্ষের লোক, তাদের উচিত কনেপক্ষকে আগে থেকেই বিনয়ের সঙ্গে এসব কুপ্রথা চর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা। প্রত্যেকের উচিত সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা। তবে বর বা কনে পক্ষ নয় যে কেউ শতভাগ সন্তুষ্টিচিত্তে উপহার দিলে তা নেওয়া অবশ্যই জায়েজ ও হালাল। কিন্তু শয়তান যেহেতু মানুষের ইবাদত বিনষ্টে তৎপর থাকে, তাই এসব কুপ্রথা পালন না করাই উত্তম। ( ধর্মের নামে এমন কুপ্রথার প্রচলন রিতিমত বেদাত।-বি.স)

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি কুপ্রথা

আপডেট সময় ১০:৪১:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

আমাদের সমাজে একটি প্রথা প্রচলিত আছে, তা হলো, পবিত্র ঈদুল আজহার সময় মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু পাঠাতে হয়, বিশেষ করে নববিবাহিত মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু ও ঈদ উপহার পাঠানো বাধ্যতামূলক মনে করা হয়। ঈদ এলে কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় কোরবানির পশু এলো, তা নিয়ে এলাকা সরগরম থাকে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই বরপক্ষের লোকদের মনে আশা জন্মায় যে আমাদের ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে এমন কিছু আসুক, যা এলাকায় আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। মেয়ের পক্ষের লোকদের মাথায় থাকে, মেয়ের জামাইকে ঈদে বড় কোরবানির পশু না দিতে পারলে মানসম্মান থাকবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো মেয়ে অত্যাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। কেউ সন্তুষ্টচিত্তে কোনো রকম চাপ ছাড়া তাঁর মেয়েকে কোরবানির পশু উপহার দিলেও তা অনেকের বিপদের কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। নি¤েœ এ রকম কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো, যেগুলোর কারণে যৌতুকের পশুতে কোরবানি বিপজ্জনক হতে পারে।
যৌতুক হওয়ার কারণে : এ উপহার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যৌতুকের পর্যায়ে পড়ে। খুব কম মানুষই কোনো ধরনের চাপে না পড়ে সন্তুষ্টচিত্তে এসব উপহার দেয় না কিংবা যা দিচ্ছে, তা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না।
যৌতুক মূলত চাপ সৃষ্টি করে অন্যের সম্পদ নেওয়া। ইসলামে এটি জুলুম ও অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে হারাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ কোরো না এবং তা বিচারকদের (ঘুষ হিসেবে) প্রদান কোরো না, যাতে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ পাপের মাধ্যমে জেনেবুঝে খেয়ে ফেলতে পার।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)
বোঝা গেল, অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ ভক্ষণ মুমিনের জন্য হালাল নয়। আর আল্লাহ হালাল ও উৎকৃষ্ট বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।
হাদিসে আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি শুধু পবিত্র (হালাল) জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৩৬)
অতএব, জবরদস্তি বা সামাজিক চাপে আদায় করা সম্পদ দিয়ে কোরবানি করলে তা কবুল হবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায়। ইবাদত সামাজিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা : সাধারণত যৌতুকের পশু ‘মানসম্মানের’ প্রতীক হয়ে যায়। তখন মানুষকে ধোঁকায় ফেলা শয়তানের জন্য সহজ হয়। কোরবানির মহৎ উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হলেও শয়তান মানুষের অন্তরে প্রশংসা ও বাহবা প্রাপ্তির বাসনা তৈরি করে, এটাও কোরবানির মহিমা ক্ষুণ্ন করার প্রবল আশঙ্কা তৈরি করে। কারণ কোরবানিতে আল্লাহর একনিষ্ঠতা ও তাকওয়াই মুখ্য। ভিন্ন নিয়ত ও প্রদর্শনীর মাহাত্ম্য নষ্ট করে দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে না পৌঁছে এগুলোর গোশত, না পৌঁছে রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
যখন কোরবানির পশু ‘কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় পশু এলো’—এ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন ইখলাস নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে।
অহংকার ও গর্ব সৃষ্টি হওয়া : সাধারণত যৌতুকের পশু নিয়ে পরিবার বা ব্যক্তি যদি গর্ববোধ করে, ‘আমাদের অমুকের শ্বশুরবাড়ি থেকে এত বড় পশু পাঠানো হয়েছে’, ‘আমরা অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারে আত্মীয়তা করেছি, প্রতিবেশীরা তুচ্ছ’ এগুলোও নিয়তকে কলুসিত করে। আর পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৮)
সামাজিক কুপ্রথাকে শক্তিশালী করা : যৌতুকের পশু গ্রহণ করলে সমাজে এ ধারণা শক্ত হয় যে বিয়েতে মেয়েপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা স্বাভাবিক বা এসব রেওয়াজ পালন করা বাধ্যতামূলক। ফলে এটি জুলুমে সহযোগিতার শামিল হয়ে যেতে পারে। অথচ ইসলাম জুলুমে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মন্দকর্ম ও সীমা লঙ্ঘনে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
অতএব, যৌতুকের পশু গ্রহণ এবং তা দিয়ে কোরবানি করা অনেক সময় একটি সামাজিক কুপ্রথাকে স্বাভাবিক করে দিতে পারে।
তাই যারা বরপক্ষের লোক, তাদের উচিত কনেপক্ষকে আগে থেকেই বিনয়ের সঙ্গে এসব কুপ্রথা চর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা। প্রত্যেকের উচিত সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা। তবে বর বা কনে পক্ষ নয় যে কেউ শতভাগ সন্তুষ্টিচিত্তে উপহার দিলে তা নেওয়া অবশ্যই জায়েজ ও হালাল। কিন্তু শয়তান যেহেতু মানুষের ইবাদত বিনষ্টে তৎপর থাকে, তাই এসব কুপ্রথা পালন না করাই উত্তম। ( ধর্মের নামে এমন কুপ্রথার প্রচলন রিতিমত বেদাত।-বি.স)