ধর্ষণ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার ঘটনায় আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার হওয়া আসামি সোহেল রানা। শিশুটির ওপর চালানো নৃশংসতার বর্ণনা দেয় ঘাতক। এনিয়ে আজ উত্তাল দেশ। সবাই বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। ধর্ষকের শাস্তির আইন সব দেশেই রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে। চলতি মাসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণের মামলা আগের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে দেশে।
বর্তমানে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই শিশু এবং কন্যাশিশু। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গত ২০ মাসে দেশে অন্তত ৬৪৩টি শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ধর্ষণকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই অপরাধের শাস্তি দেশভেদে ভিন্ন-কোথাও মৃত্যুদণ্ড, কোথাও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, আবার কোথাও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও শারীরিক শাস্তির মতো ব্যবস্থাও রয়েছে। অনেক দেশ সম্প্রতি জনরোষ ও সামাজিক চাপের মুখে তাদের আইন আরও কঠোর করেছে।
কোন দেশে কী আইন রয়েছে ধর্ষকের শাস্তির। চলুন জেনে নেওয়া যাক-
বাংলাদেশ: ২০০০ সালের আগে ধর্ষণের ঘটনায় জরিমানার বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল না। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে জরিমানা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই আইনে বলা হয়, যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দ-নীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে ও দণ্ডনীয় হবেন।”
এছাড়া যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন তাহলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করে বা আহত করার চেষ্টা করে তাহলে তার যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হবে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হবে।
ভারত: ভারতে ধর্ষণের আইন দিন দিন কঠোর হচ্ছে। ধর্ষণ নিয়ে দেশটিতে যত অসন্তোষ জনমনে তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলো কাশ্মীরে আট বছর বয়সী মুসলিম শিশু আসিফা বানু ধর্ষণ ও হত্যা। শিশুটিকে একটি মন্দিরে আটকে রেখে মাদক খাইয়ে পাঁচ দিন ধরে ধর্ষণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং মাথা থেঁতলে তার লাশ কাঠুয়ার কাছে একটি জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর ভারতজুড়ে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির মন্ত্রিসভা পাস করে নতুন আইন। আর সেই আইনে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মৃত্যুদ-। আর ১২ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত মেয়েদের ধর্ষণের জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আর যেকোনো ধর্ষণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাজা সাত বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে যাবজ্জীবন কারাদ-ও হতে পারে। তা ছাড়া ১৬ বছরের নিচে কোনো মেয়েকে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ করলে অভিযুক্তরা কোনোভাবেই আগাম জামিন পাবে না। ধর্ষকের সাজা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর বিধানও রাখা হয়েছে নতুন অধ্যাদেশে। এর আগে ২০১২ সালে নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর এ অপরাধের আইন সংশোধন করেছিল ভারত। ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুর কাছে হার মানেন নির্ভয়া। ধর্ষণের এ ঘটনায় সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। এ ঘটনার পর নতুন করে নড়েচড়ে বশে দেশটির সরকার। ঘটনার জের ধরেই পরে ভারতে ধর্ষণ প্রতিরোধে কড়া আইন আনা হয়েছিল।
চীন: চীনে ধর্ষণ নিয়ে আইন বেশ কঠোর। নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ ঠেকাতে আইন রয়েছে সব দেশেই। কিন্তু ধর্ষণের শিকার শুধু নারীরাই হন, এমন নয়। বহু পুরুষও যৌন নির্যাতনের শিকার হন নানা ক্ষেত্রে। আগে দেশটিতে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে দেখা হতো। তবে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন হয়। এতে শুধু নারী নয়, পুরুষদের ওপর যৌন নির্যাতন অপরাধ বলে গণ্য হবে। অপরাধ আইনে সংশোধন করে এর ন্যূনতম সাজা করা হয় পাঁচ বছর। নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর যৌন নির্যাতনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। বিশেষ করে অপ্রাপ্ত বয়সের শিশু নারীদের ওপর এ ধরনের সহিংসতা প্রমাণিত হলে দেশটি ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড দেয়। আর সেটি কার্যকর করে খুব কম সময়ের মধ্যেই। কিছু বিরল ক্ষেত্রে, পুলিশ তাদের যৌনাঙ্গগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত বা অ-কোষ কেটে ফেলে। তা ছাড়া অপ্রাপ্ত বয়সের যৌনকর্মীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ককেও ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইরান: নারীদের ওপর সহিংসতায় ইরান বেশ কঠোর। অপরাধ প্রমাণিত হলে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে এই মৃত্যুদণ্ড যে সেভাবে কার্যকর করা হয় না। ধর্ষকদের সবার সামনে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় অথবা মাথায় গুলি করে মারা হয় বা পিটিয়ে হত্যা করা হয়। কারণ, দেশটি মনে করে এ ক্ষেত্রে নারীদের কোনো দোষ নেই। ধর্ষকই এ কাজে দোষী। এছাড়া রয়েছে আরও নানা ধরনের শাস্তি। যেমন দোররা বা চাবুক মারা অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষেও রয়েছে ইরান। ধর্ষণের দায়ে ১৮ বছরের কম বয়সীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, দেশটিতে এই নজিরও রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি উত্তর কোরিয়া। এ দেশের বেশ কিছু আইন চালু রয়েছে, যা খুবই ভয়ংকর। দেশটিতে নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার মাত্রা বেশি। শুধু সাধারণ নাগরিকই নয়, এই অভিযুক্তের তালিকায় দেশটির শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা, কারারক্ষী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও রয়েছেন। ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার। আর গ্রেপ্তারের পর অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সেটা কার্যকর হয় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা ফায়ারিং স্কোয়াডে। তবে সেটার জন্য কোনো সময় নেয়া হয় না। যখনই প্রমাণিত হবে, তখনই ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে গুলি। তা ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন মাত্রার শাস্তি। এসব ক্ষেত্রে আমলে নেওয়া হয় ধর্ষিতা কুমারী না বিবাহিতা, সাবালিকা, নাকি নাবালিকা, নারীর চরিত্র ত্রুটিমুক্ত কি না। এসব বিষয় আমলে নিয়ে বিচারক যদি মনে করেন ধর্ষকের অপরাধ ততটা গুরুতর নয়, যতটা ধর্ষিতা বলছে, সে ক্ষেত্রে অপরাধীর লঘু শাস্তি হয়। সে ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, আসামি অনেক সময় বেকসুর খালাসও পেয়ে যায়।
নেদারল্যান্ডস: বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় রয়েছে নেদারল্যান্ডসের নাম। সেখানে সম্মতি ছাড়া একটি চুম্বনও অপরাধ। এমন অভিযোগ যদি পাওয়া যায়, তাহলে আইনি জটিলতায় পড়তে পারে যে কেউ। শুধু সাধারণ নাগরিকই নয়, যদি সে যৌনকর্মীও হয়, তাহলেও পড়তে হবে আইনি জটিলতায়। যেকোনো ধরনের অনিচ্ছাকৃত শারীরিক মিলন বা অত্যাচার হলে নেদারল্যান্ডসে সেটিকে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর ভুক্তভোগীর বয়স কত, তা মাথায় রেখে ধর্ষককে ৪ থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। শাস্তি এত কম বলে আবার ভাবা ঠিক নয় এই দেশে যৌন সহিংসতা বেশি হয়। নারীদের জন্য নিরাপদ ও সেরা দেশগুলোর যদি তালিকা করা হয়, তাহলে সেই তালিকার ওপরের দিকেই থাকবে নেদারল্যান্ডসের নাম।
আফগানিস্তান: বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশটিতে বছরে তিন হাজারের মতো মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে, যার আশি শতাংশই নারী। শুধু ২০১৭ সালেই ১৮০০ মানুষ সেখানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। এর মধ্যে চৌদ্দশই নারী। আর এর কারণ হলো, নারীর প্রতি সহিংসতা। বলা হয়ে থাকে, আফগানিস্তানে নারীরা পরিবারের ভেতরেই সব থেকে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। যদিও আফগানিস্তানে তেমন কোনো আইন নেই, যা ধর্ষণের শিকার বা তার পরিবারকে সুরক্ষা দেয়। এ কারণেই অনেকে আইনের শরণাপন্ন হয় না। তাই খুব কমসংখ্যক নারী বা তার পরিবার এ ঘটনায় আইনের আশ্রয় নেয়। বেশির ভাগ পরিবারেই বিষয়টি চেপে যায়। অনেক সময় যে ভিকটিম, সম্মান রক্ষার্থে তাকে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে। এত কিছুর পরও দেশটিতে ধর্ষণের শাস্তি কার্যকর করা হয় সঙ্গে সঙ্গে বা সর্বোচ্চ চার দিনের মধ্যে। অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে গেলে আর কোনো ধরনের কালক্ষেপণ করা হয় না। এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ধর্ষকের মাথায় গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে বা মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে।
সৌদি আরব: রক্ষণশীল দেশ সৌদি আরব। আর তাই সেখানে ধর্ষণের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন। এখানে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এই মৃত্যুদণ্ড বিভিন্নভাবে কার্যকর করা হয়। কখনো পাথর ছুড়ে, কখনো-বা মাথা দ্বিখণ্ডিত করে, কখনো-বা পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। প্রকাশ্যে এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো সবাই যাতে ধর্ষণের শাস্তির বিষয়ে সচেতন হতে পারে। কমে যায় ধর্ষণ। আর তাই দেশটিতে অন্যান্য দেশের তুলনায় ধর্ষণের মাত্রা অনেক কম। তা ছাড়া রয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, চাবুক মারা ও নানা মাত্রার জেল। তবে ধর্ষককে তখনই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যাবে, যখন এ কাজের জন্য অন্তত চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেবে। তাই ধর্ষণ প্রমাণ করা বেশ কঠিন এখানে।
এছাড়া বিশ্বের কয়েকটি দেশে ধর্ষকদের জন্য কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন বা রাসায়নিক খোজাকরণের বিধান রয়েছে। এটি এমন এক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে বিশেষ ওষুধের মাধ্যমে যৌন আকাঙ্ক্ষা বা সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়।
২০২১ সালে ধর্ষণবিরোধী আইনে রাসায়নিক খোজাকরণের বিধান যুক্ত করে পাকিস্তান। বিশেষ করে সিরিয়াল বা সংঘবদ্ধ ধর্ষকদের ক্ষেত্রে এই শাস্তির কথা বলা হয়।
ইন্দোনেশিয়া শিশু ধর্ষণের ঘটনায় রাসায়নিক খোজাকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদ-ের অনুমোদন দেয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর এই ব্যবস্থা নেন।
রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে প্রায় প্রতি ৮ জন মেয়ের মধ্যে ১ জন ১৮ বছর হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। তবে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি, কারণ বিশ্বের বড় অংশের ঘটনাই রিপোর্ট হয় না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু যৌন নির্যাতনের বড় অংশই প্রকাশ পায় না। বিশ্বে ধর্ষণের মাত্র ১০ শতাংশের মতো ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট হয়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে রিপোর্টই হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র শাস্তির কঠোরতা নয়, বরং দ্রুত বিচার, শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। অনেক দেশ কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তি এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে।
সর্বোপরি, বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনি অবস্থান কঠোর হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ ও বিচারিক কার্যকারিতা দেশভেদে ভিন্ন। কোথাও মৃত্যুদ-, কোথাও বেত্রাঘাত, আবার কোথাও আজীবন কারাবাস-কিন্তু লক্ষ্য একটাই, যৌন সহিংসতা দমন এবং সমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ছোট্ট রামিসার জন্য কাঁদছে পল্লবী
রামিসার কুলখানিতে অংশ নিতে প্রাইভেটকারে করে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরায় গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন পরিবার, ছবি: জাগো নিউজ
ঢাকার আকাশ আজও ভারী। সকাল গড়িয়ে দুপুর ১২টা হলেও রাজধানীর মিরপুরে ছোট্ট রামিসাদের বাসার সামনে মানুষের ঢল কমেনি। চোখে-মুখে ক্ষোভ আর শোক নিয়ে নির্যাতন ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন পল্লবীর বাসিন্দারা। এলাকাজুড়ে একটাই দাবি— দোষীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধীদের বিচারের দাবিতে যখন পল্লবীবাসীর ক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই সাত বছর বয়সী রামিসার কুলখানিতে অংশ নিতে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হন পরিবারের সদস্যরা। কয়েকদিন পরই হয়তো বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে ঈদুল আজহা উদযাপনের জন্য বাড়ি ফেরার কথা ছিল ছোট্ট রামিসার। কিন্তু এবারের ঈদে আর ফেরা হবে না তার।
বাবা-মায়ের এবারের যাত্রাও আনন্দের নয়, বেদনার। পরিবার নিয়ে এ যাত্রা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির নয়; বরং প্রিয়জনকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে কুলখানিতে অংশ নেওয়ার যাত্রা। যে শিশুটি ঈদের আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল, সেই রামিসাকে ঘিরেই এখন স্বজনদের কান্না আর বিচার দাবিতে মানুষের ক্ষোভ।
গতকাল শুক্রবার (২২ মে) রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় নিহত শিশু রামিসার বাসার সামনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই রামিসার বাসার সামনের সড়কটি যেন শোক আর ক্ষোভের এক প্রতিবাদমঞ্চে পরিণত হয়েছে। বাসার সামনে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্করাও অংশ নেন বিক্ষোভে। স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় তাদের।
এদিকে, বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ চলার মধ্যেই দুপুর ১২টার দিকে রামিসার পরিবারকে একটি প্রাইভেটকারে করে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হতে দেখা যায়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ছোট্ট রামিসার কুলখানিতে অংশ নিতেই স্বজনরা গ্রামের পথে যাত্রা করেন। শোকাহত পরিবারের সেই যাত্রা ছিল প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত।
রামিসার স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, বুধবার এশার নামাজের পর মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে মোল্লাবাড়ির বায়তুল আমান জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দাদা-দাদির কবরের পাশে রামিসাকে দাফন করা হয়। ছোট্ট রামিসার দাফনের সময় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
রামিসা হত্যা: আসামির পক্ষে মামলা লড়বেন না ঢাকা বারের কোনো আইনজীবী
এদিকে রামিসার বাসার সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা সিনথিয়া। তিনি বলেন, “যে অপরাধী নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে, তাকে কেন সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে না? সরকার যদি এই অপরাধের বিচার করতে না পারে, তাহলে জনগণের হাতে তুলে দিক। ধর্ষক ও হত্যাকারীদের বিচার জনগণ করবে। আর কত শিশু এভাবে প্রাণ হারালে সঠিক বিচার নিশ্চিত হবে?”
তিনি আরও বলেন, “আমরাও সন্তান নিয়ে বসবাস করি। এখন নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কে আছি। একটি শিশুকে এত নির্মমভাবে হত্যা কোনো মানুষ করতে পারে না। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে দেশে এমন অপরাধ আরও বাড়বে।”
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা জানান, সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক রামিসার মা-বাবা শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে মেয়ের কুলখানি ও মিলাদে অংশ নিতে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। বিদায়ের মুহূর্তে বাসার সামনে জড়ো হওয়া মানুষের কান্না, সমবেদনা ও সান্ত¡নার কথায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের দাবি, ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো অপরাধে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অনেকেই এ ধরনের অপরাধীদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদ- কার্যকরের দাবি জানান। একই সঙ্গে রামিসা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোন রাইসা আক্তার পাশের চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন। এ সময় ছোট বোন রামিসা তার সঙ্গে যেতে চাইলে তাকে বাসায় রেখে লুকিয়ে বের হয়ে যান রাইসা। তবে বিষয়টি বুঝতে পেরে রামিসাও দরজা খুলে বড় বোনের পিছু নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় সামনের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) রামিসাকে জোর করে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। এরপর তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
‘রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর অগ্নিপরীক্ষা’
চট্টগ্রামে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্তকে নেওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন
রামিসা হত্যাকা-ের চার্জশিট রোববার দাখিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রামিসার পরিবারের সদস্যরা জানান, নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া রাইসা ছোট বোনকে এড়িয়ে চাচার বাসায় যাচ্ছিলেন। পরে রামিসা পেছনে আসায় তাকে আবার রুমে রেখে বের হয়ে যান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর রামিসাও বাসা থেকে বের হয়ে বড় বোনের পিছু নেয়।
চাচার বাসা থেকে ফিরে এসে রাইসা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা বুঝতে পারেন, রামিসা সেখানে যায়নি। এরপর শুরু হয় তাকে খোঁজাখুঁজি। ভবনের একের পর এক ফ্ল্যাটে খোঁজ নেওয়া হলেও অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) তাদের ফ্ল্যাটের দরজা খুলেননি বলে পরিবারের অভিযোগ।
এর আগে ভুক্তভোগী শিশু রামিসার বড় বোন রাইসা জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাস্তার ওপারেই আমার চাচার বাসা। আমি সেখানে যাচ্ছিলাম। রামিসাও আমার সঙ্গে যেতে চাইছিল। আমি ওকে ঘরে যেতে বলি এবং রুমে রেখে বের হয়ে যাই। পরে আমার পেছনে বের হলেও আমি খেয়াল করিনি। তখনই দরজার বাইরে থেকে লোকটা রামিসাকে টেনে নিয়ে যায়। ও চিৎকার করেছিল, আম্মু সেই শব্দও শুনেছেন।’
রামিসার মা পারভিন আক্তার বলেন, প্রথমদিকে আমি বুঝতেই পারিনি চিৎকারটি আমার মেয়ের ছিল। আমি ভেবেছিলাম, ও বড় মেয়ের সঙ্গে গেছে। পরে দেখি বড় মেয়ে একা ফিরে এসেছে। তখনই বুঝতে পারি কিছু একটা হয়েছে এবং মেয়েকে খুঁজতে শুরু করি। একের পর এক ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিয়েছি। সবাই দরজা খুলেছে, শুধু ওই ফ্ল্যাটের দরজা খোলেনি।’
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েকে না পেয়ে ভবনের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তারা। তবে অভিযুক্তের ফ্ল্যাট থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।
রামিসার মা বলেন, অভিযুক্ত সোহেল রানাদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনো ধরনের সম্পর্ক বা পূর্বপরিচয় ছিল না। তারা কয়েক মাস আগে ভাড়া এলেও কোনোদিন তাদের সঙ্গে কথা হয়নি।’
ঘটনার পেছনে কোনো বিরোধ বা অন্য কারণ ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর পেছনে কোনো কারণ নেই, শুধু লালসা। আমার মেয়ে মাত্র দরজা খুলে বের হয়েছিল। এক পায়ে জুতা পরেছিল, অন্য পায়ের জুতা পরারও সুযোগ পায়নি। টেনে নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, মেয়ের একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেই আমাদের সন্দেহ হয়। তখনই আমরা ওই ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিই। পরে আশপাশের মানুষ এসে দরজা ভাঙে। পেছনের বাড়ির লোকজন জানিয়েছে, তারা অভিযুক্তকে ওই দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছেন।’
জানা যায়, যে ভবনে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই ভবনের মালিক বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতে ভবনটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন কেয়ারটেকার। এছাড়া রামিসা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজে মিস্ত্রির কাজ করতেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায় তাকে। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিচার আপনারা করতে পারবেন না। এ ধরনের ঘটনার বিচার হওয়ার কোনো নজির আমি দেখিনি। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। বিচার হবে—এমন প্রমাণ কি দিতে পারবেন? পারবেন না। কয়েকদিন আলোচনা হবে, তারপর আবার অন্য ঘটনা সামনে আসবে, বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বয়স ৫৫ বছর। এতদিনে অনেক ঘটনা দেখেছি। তাই বিচার পাওয়া নিয়ে আমার বিশ্বাস নেই।’
এ ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বুধবার রাজধানীর পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন নিহত শিশু রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
খবরপত্র ডেস্ক: 
























