মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:১২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম ::
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইম ব্যাংকের “এমপাওয়ারিং ইয়ুথ” বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন একটি স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন: প্রিন্সিপাল নুরে আলম তালুকদার পেকুয়ায় অগ্নিকা-ে ১০ বসতবাড়ি পুড়ে ছাই: ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি জগন্নাথপুরে অসহায়-মানুষের মধ্যে ৫০টি ছাগল উপহার দিল সার্কেল ২৫ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ইউকে ফকিরহাটে দুই বাসের সংঘর্ষে নারীসহ ১৫জন আহত দুর্গাপুরে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা, মা-মেয়েসহ আহত ৪ মধুপুরে নবনির্বাচিত এমপি মহোদয়ের সাথে এক ঝাঁক কলম সৈনিকের সাক্ষাৎ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কবির হোসেনের জানাজার নামাজ সম্পন্ন ভোলায় বাস মালিক সমিতির উদ্যোগে “ঈদ আনন্দ বাজার” উদ্বোধন আমি দুই শ্রেণির মানুষের সান্নিধ্যে বিশেষ আনন্দ পাই-শফিকুর রহমান

কবি মোশাররফ হোসেন খান: স্বপ্নের সানুদেশে জাগ্রত প্রাণ

বিলাল হোসাইন নূরী
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫

‘স্বদেশা আমার সুমনা!’ নিজের দেশকে লক্ষ্য করে এমন হৃদয়মথিত সম্বোধন খুব একটা চোখে পড়ে না। এ যেন নাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে আসা উষ্ণ উচ্চারণ! বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে ছুটে আসা উত্তাল শব্দ-তরঙ্গ! দেশের জন্য কতটা গভীর মমতা থাকলে এমন কথা বলা যায়! কবি যেন প্রবাস থেকে লিখছেন। আর দূর থেকে ভাবছেন কেমন আছে তার দেশ? ভালো তো? নাকি ‘বদরোখা পড়শীরা’ ক্ষুধিত বাঘের মতো ঢুকে পড়বে তার ঘরে এবং কৌশলে ছিনিয়ে নেবে তাকে? একজন কবির এ হাহাকার মনে করিয়ে দেয় মহানবী (সা)-এর হিজরতের কথা। নিজ জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে তাকে পাড়ি জমাতে হচ্ছে ইয়াসরিবে। যেতেই হবে তাকে। আর কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু হৃদয় তো আর যেতে চায় না। তপ্ত-মরুর বালুকায় হৃদয়টা রেখে তিনি চলে যাচ্ছেন আর বলছেন- ‘কতই না পবিত্র ও উত্তম শহর তুমি! কতই না প্রিয় তুমি আমার কাছে! আমার জাতি যদি আমাকে বের করে না দিত, তোমাকে ছাড়া আমি আর কোথাও বসবাস করতাম না!’ [তিরিমিজি : ৩৯২৬] নবীজি ইয়াসরিবে এলেন। ইয়াসরিবকে তিনি আপন করে নিলেন। অনেক আপন। এ যেন তাঁরই দেশ। এখানকার অধিবাসীরাও তাঁকে গ্রহণ করলেন পরম মমতায়। একদিন ইয়াসরিব আর ইয়াসরিব থাকল না। হয়ে গেল ‘মদীনাতুন্নবী’- নবীর শহর! মদীনায় এসে আবুবকর (রা) ও বিলাল (রা) ভীষণ জ্বরে ভুগতে লাগলেন। একদিকে আপনভূমি ও প্রিয়জনদের বিরহ, অন্যদিকে কঠিন অসুস্থতা! মানসিকভাবেও তারা ভেঙে পড়লেন যেন! আবুবকর (রা) জ্বরের প্রকোপের মধ্যে কবিতা পাঠ করতেন-‘প্রতিটি মানুষকে তার পরিবার-পরিজনের মাঝেই বলা হয়-সুপ্রভাত! অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও কাছে!’ আর বিলাল (রা) তো স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তেন। আপন জন্মভূমির ঝরনা-পাহাড়-উপত্যকা তাকে হাতছানি দিত! যখন তার জ্বর ছেড়ে যেত, তখন উচ্চস্বরে বলতেন-‘হায়! আমি যদি একটি রাত কাটানোর সুযোগ পেতাম এমন এক উপত্যকায়-যেখানে আমার পাশে থাকবে ইজখির ও জালিল ঘাস। কোনোদিন কি অবতরণ করতে পারব মাজিন্না ঝরনায়? দেখতে পাব শামা ও তাফিল পাহাড়?’ আয়েশা (রা) মহানবী (সা)-এর কাছে এসে বললেন দু’জনের কবিতার কথা। তাদের দেশপ্রেমের কথা। তিনি তখন দোয়া করলেন- ‘হে আল্লাহ! মদীনাকে আমাদের কাছে প্রিয় করে দাও মক্কার মতো! অথবা তারচেয়েও বেশি!’ [বুখারী : ৫৬৫৪]
দেশপ্রেমের এমন সবক আর কার কাছে পাওয়া যাবে? কবি মোশাররফ হোসেন খান তো সে নবীরই উম্মত! আবুবকর ও বিলালেরই উত্তরসূরী। তাই তার ভেতরে দেশপ্রেমের এমন সবুজ কিশলয় প্রতিনিয়ত মাথা তুলবে, এটাই তো পরম সত্য! কবি মোশাররফ হোসেন খান-এর কবিতায় দেশের কথা উঠে এসেছে বিচিত্র চিত্রকলায়, অনবদ্য ভাষা ও শৈলীতে। তিনি যখন তার সৌন্দর্য বর্ণনা করেন, তখন সকল সুমিষ্ট শব্দ এসে যেন কোলাহল করে তার চারপাশে। ছায়াতরু হিজল তমালের নিচে ঘন হয়ে বসে তিনি সবাইকে নিয়ে দেখতে চান অনেক সূর্য আর সন্ধ্যার রং মিলেমিশে একাকার হওয়া এমন এক প্রাণবন্ত ছবি, যে ছবি আঁকার সাধ্য নেই কারও। তিনি যখন বলেন- ‘কৃষকের ভারী পা যেখানে এঁকে যায় নন্দিত শিল্পকর্ম, যেখানে হালের বলদ দিনভর স্বপ্ন এঁকে যায়…’ তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, কতটা গভীর দৃষ্টিতে তিনি পরখ করেছেন এ দেশের অপার সৌন্দর্য! এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের সাথে মিশে আছে ইসলামী বিশ্বাস, ইবাদাত-অনুষ্ঠানের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। এ কারণে নামাজের সময় হলেই একজন কৃষককে মাঠের সবুজ জমিনে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতে দেখি। মাঝিকে দেখি নৌকার ভেতর সিজদায় লুটিয়ে পড়তে। এ যেন মহানবী (সা)-এর কথারই বাস্তবায়ন- ‘পুরো জমিনকেই আমার জন্য পবিত্র ও নামাজের জায়গা বানানো হয়েছে। আমার উম্মতের যেকোনো লোক সময় হলেই নামাজ আদায় করতে পারবে’ [বুখারী ৩৩৫]। কবি মোশাররফ হোসেন খান এ বিষয়টিকেই সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। বলেছেন-‘সবুজ ঘাসের গালিচাসমৃদ্ধ এদেশ যেন আমার পবিত্র জায়নামাজ’… [আমার সবুজ বাংলা : স্বপ্নের সানুদেশ] তার এ চিত্রকল্প সকল যুগ ও কালের উর্ধ্বে উঠে প্রকাশ করছে আবহমান ঐতিহ্যের দৃশ্য। ঠিক এখানেই তার নিজস্বতা। ছয়ঋতুর এ বাংলাদেশের প্রতিটি ঋতুকেই তিনি স্পর্শ করেছেন। শুধু বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি, কবিতার চরণে চরণে রোপণ করেছেন অর্থের আড়ালে আরেক অর্থ। দৃশ্যের ভেতর আরেক দৃশ্য। সরল দৃষ্টি থেকে ধীরে ধীরে চলে গেছেন গভীরে, আরও গভীরে। শরত নিয়ে তিনি বলেন- ‘অতি শৈশবেই শরতের চাঁদ-ধোয়া জোছনা পান করানোর অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন আমার প্রাজ্ঞ পিতা। সেই থেকে প্রতিটি শরতেই আমি সেটা পান করে আসছি। এ এক অব্যক্ত, বিরল অনুভূতি! যা কেবল কবিরাই অনুভব করতে পারেন।’ [শরত সকালে : সবুজ পৃথিবীর কম্পন] এখানে শরতের শীতল জোছনা উপভোগের অনুভুতির সাথে মিশে আছে একজন পিতার দূরদৃষ্টি। যিনি হাত ধরে তার সন্তানকে দিয়েছেন জীবনের পাঠ। অবশ্য, ‘পিতার পাঠশালা’ নামে কবির একটি কাব্যগ্রন্থই আছে। যেখানে তিনি তার পিতার প্রসারিত জীবনবোধের গল্প তুলে ধরেছেন পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। ‘হলুদ শর্ষে ফুলের ওপর শিশিরকুঁচি যেন স্বর্ণকেও হার মানায়’ অথবা ‘বৃক্ষ এবং গুল্মগুচ্ছও এখন হেমন্তের একান্ত গৃহপালিত’- হেমন্ত যেন কবির চোখে এভাবেই ধরা দেয়। আর মাইকেল মধুসূদনের কপোতাক্ষ যেন মোশাররফ হোসেন খান-এর মননে ধরা দেয় নতুন ব্যঞ্জনায়-‘পাখিরা নদীকে ভোলেনি যেমন আমিও ভুলতে পারিনি-বিশ্বের তাবৎ দুঃসংবাদ এবং যুদ্ধের মহামারী একপাশে রেখে হেমন্তের এই কালে-এখনো প্রতিটি সকালে উদোম গায়ে রোদ পোহাই তার পাড়ে। এখনো প্রতিটি প্রভাতে ছুটে যাই সেই চিরচেনা নদীটির কাছে। কখনো বা ঘুমের মধ্যেই- মায়ের মায়াবী হাতে বোনা নকশিদার কাঁথা ফেলে অকস্মাৎ ডেকে উঠি-
কপোতাক্ষ! কপোতাক্ষ!…’[হেমন্তের নদী : সবুজ পৃথিবীর কম্পন] কপোতাক্ষ! হ্যাঁ, কপোতাক্ষ যেন কবিকে বেঁধে রেখেছে গভীর মায়ার বন্ধনে। কপোতাক্ষ তার স্মৃতির নদী। কপোতাক্ষর তীর ঘেঁষেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা। এ জন্যই তিনি বলেছেন- ‘কপোতাক্ষর বাঁকে/ আমার মনটা পড়ে থাকে।’ অথবা ‘সবাই বলে কী আর এমন, কীইবা ওতে আছে?/ আমি কিন্তু অনেক ঋণী কপোতাক্ষর কাছে’। ঠিক শীতে এসেও কপোতাক্ষ’র কথা ভোলেননি কবি-‘এক সময় যে কপোতাক্ষর বুক পাড়ি দিতে পাটনীর বুক কেঁপে উঠতো হাতের বৈঠা ঘুরতো রুটি-বেলা বেলুনের মতো এই শীতে তার পেটে বসে ছেলেরা নুড়ি জ্বালিয়ে দিব্যি আগুন তাবাচ্ছে।’ [শীতের পদাবলি : সবুজ পৃথিবীর কম্পন] কপোতাক্ষর এ করুণ পরিণতি কবিকে দারুণভাবে আহত করেছে। তাই তার কাতর কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পাই এভাবে- ‘পানির কলসে একি! বিষধর কেউটের ফণা! খরতাপে পাথরও হয়ে গেছে রোগাক্রান্ত ফিকে ভয়ংকর মৃত্যুর ছোবল হেনে যায় চারদিকে। সীমার দেবে না পানি? তবে নাও বারুদের কণা! চারদিকে মরুময় কেবলই ভস্মের ক্ষরণ থমকে দাঁড়িয়ে দেখো আমাদের নদীর মরণ!’ [নদীর মরণ : বৃষ্টি ছুঁয়েছে মনের মৃত্তিকা] শীতের কোমল কুয়াশা, শিশিরসিক্ত নরম ফুল-পাতা, সরষে ফুল, তাওয়ায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা পিঠা, সুগন্ধি পায়েস, অতিথি পাখির ভীড়ে কবির ভেতরে বেজে ওঠছে ভিন্নরকম এক বিষাদের সুর। শীতের সজীবতা যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের মানবিকবোধ। কবির মতে- ‘অতি পরিচিত মুখগুলোও কেমন অচেনা রয়ে গেছে নিজেরই পৃষ্ঠদেশের মতো’। মা ছাড়া আর কাউকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। তার ভাষায় ‘মনে হচ্ছে- মা আমার গোটা বাংলাদেশকেই কুয়াশার মতো জড়িয়ে রেখেছেন’। তার বিষাদের প্রতিধ্বনি সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তোলে-‘শীত এসেছে, চলেও যাবে। চলে যাবে শীতের অতিথি পাখিরা। কিন্তু আমার ভেতরের ব্যাকুল অতিথিকে জাগানোর মতো কাউকে তো দেখছি না!’ [শীতের পদাবলি : সবুজ পৃথিবীর কম্পন]
বাংলাদেশ এক বৃষ্টিমুখর জনপদ। মোশাররফ হোসের খান একজন বৃষ্টিবিলাসী কবি। ‘বৃষ্টি ছুঁয়েছে মনের মৃত্তিকা’ তার একটি কবিতার বই। এ নাম শুনলেই তো হৃদয়টা ভিজে ওঠে। ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরতে থাকে মনের জানালায়। ‘কী হবে যাতনা পুষে! তার চেয়ে ভালো-/বরষায় ভেসে যাক শোকের নহর।’ অথবা- ‘রিমঝিম জাগে বন, স্বপ্নের বীথিকা/বৃষ্টি তো ছুঁয়েছে মন- মনের মৃত্তিকা’। এমন কথা আর ক’জন কবি লিখতে পেরেছেন? এখানেও কবি স্নিগ্ধতার সৌরভে ভিজতে ভিজতে অন্য গল্প বলেছেন। বলেছেন- বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিক পৃথিবীর তাবৎ রক্তাক্ত প্রান্তর, মজলুম জনপদ। আফগান উদ্বাস্তু শিবির থেকে শুরু করে কাশ্মীর, ফিলিস্তিন এমনকি বাংলাদেশও বাদ পড়েনি তার বৃষ্টির প্রার্থনা থেকে। এভাবেই, এদেশের প্রকৃতির প্রতিটি রূপ তিনি সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কারুময় শব্দের নিটোল বুননে। বৈশাখ থেকে চৈত্র- কোথায় বিচরণ নেই তার? এদেশের সোঁদামাটির ঘ্রাণ, ফুল-পাখি-নদীর মমতা তিনি এমনভাবে ধারন করেছেন, যার তুলনা তিনি নিজেই- ‘এদেশ আমার এই যে আমি সবুজ মায়ার কোলে/ এ দেশ আমার স্বপ্ন-সাগর বুকের ভেতর দোলে’। তবে সাহস ও সংগ্রামের একজন কবি কি তার দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়েই মুগ্ধ থাকতে পারেন?
না! কবি মোশাররফ হোসেন খান এখানেই একক। প্রকৃত দেশপ্রেম বলতে যা বোঝায়, তার কবিতার পরতে পরতে তা-ই জেগে উঠেছে নতুন চারার মতো। এখানে কোনো রাখঢাক নেই, কৃত্রিমতা নেই। দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার জন্য তার উচ্চকিত আওয়াজ, এদেশের মানুষকে দিয়েছে জাগরণের বজ্রপাঠ। তিনি চান তার দেশের মাটিতে জন্ম নিক ‘সিংহশাবক, বারুদের গন্ধে পুষ্ট অগ্নিশিশু’। যে শিশু ভূমিষ্ট হয়েই জেনে যাবে দুশমনের পরিচয়। আর খুনঝরা দিনের বদলা নিতে লাফিয়ে উঠবে বিদ্যুতের মতো। কবি জানেন, সাহস-সংগ্রাম ও তারুণ্যের স্ফুরণ ছাড়া দেশের এক ইঞ্চি মাটিও নিরাপদ থাকবে না। তাই তার দ্বিধাহীন প্রত্যাশা-‘ভয় কি স্বদেশা! আজ না হলেও কাল কিংবা দু’দিন পর ভূমিষ্ট হবেই হবে জালিমের দুশমন-
যে তোমার সতীত্ব এবং সব ঘরদরজা পাক-পবিত্র রাখার জন্যই হবে যথেষ্ট।’ [প্রবাস থেকে বলছি : হৃদয় দিয়ে আগুন] কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতার দু’টি লাইন ইতিহাসের এক অনিবার্য সত্যকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। নাড়া দিয়েছে আমাদের আত্মপরিচয় ও আত্ম-উপলব্ধির মর্মমূলে-‘শিয়রে শকুন ওড়ে, ধূসর খামার! এ-ভূমি সেনের নয়- তোমার আমার।’[এ-ভূমি সেনের নয় : দাহন বেলায়] এভাবেই কবি তার কবিতায় এঁকে দিয়েছেন ‘হাজার বছরের পথচলার পদচিহ্ন’। মনে করিয়ে দিয়েছেন বখতিয়ারের কথা, ঈসা খাঁর কথা। তার ভাষায়- ‘তাদের অশ্বের হ্রেষাধ্বনি এবং গগন কাঁপানো খুরের শব্দে এখনো কেঁপে ওঠে শৃগালের হৃৎপি-’। নিজের দেশকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখতে রাজি নন তিনি। কারণ এখানেই সুদৃঢ় দুর্গের ভেতর সঞ্চিত রয়েছে বিশ্বাস আর ঐতিহ্যিক রতœ-ভান্ডার’। এ নিজস্ব সম্পদের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস নেই কোনো দস্যুর-
‘এ আমার সবল স্বদেশ-তস্করের শেকড় উপড়ে, বাজের নখর আর শকুনের ছোবল উপেক্ষা করে বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছে। এ পতাকা আমার সম্রাট শাহজাহানের তাজমহলের চেয়েও প্রশস্ত, দীপ্তিমান।’ [সবুজ পৃথিবীর কম্পন: সবুজ পৃথিবীর কম্পন] মোশাররফ হোসেন খান! যদিও তিনি একজন বিশ্বপরিব্রাজক কবি, নিজ দেশের জন্য তবু তিনি সবকিছু করতে পারেন। মানচিত্রের ওপর মাকড়সার জাল রেখে তিনি ঘুমাবেন কীভাবে? তাই তার অকপট উচ্চারণ- ‘আমার স্বদেশ আমাকে আর বোধ হয় ঘুমুবার সুযোগ দেবে না।’ তার ভাষায়- ‘এ আমার স্বপ্নের দেশ, ঠিক যেন আমারই হৃৎপি-’! এ কারণেই তিনি গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন এদেশের সকল সংকট ও অনিশ্চয়তার আর্তনাদ।
স্বদেশ গড়ার দায়ভার কাঁধে তুলে তিনি অবিরাম ঝড় তুলছেন সাহসের, প্রেরণার। তার আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ প্রতিটি দেশপ্রেমিককেই উদ্বেলিত করে- ‘আমি এই সবুজ মৃত্তিকারই এক অধঃস্তন কবি- যে মাতৃদুগ্ধের ঋণের মতো স্বদেশের দায়ভারও সমান বয়ে বেড়াচ্ছে।’ বহুপথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের এই সবুজ মাতৃভূমি। বহু রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। তার বুকে প্রবাহিত হয়েছে বহু ত্যাগ আর সংগ্রামের রক্তনদী। আর পেছনে ফেরা নয়। আর কোনো তস্করের ডাক শোনার সময় নেই আমাদের। তাই কবির বিনীত প্রার্থনা-‘হে প্রভু! আমি তো আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি- অতএব এর বিনিময়ে আপনি আমার স্বদেশ ভূমিকে বাজের নখর থেকে রক্ষা করুন এবং স্বপ্নের সানুদেশে পরিণত করুন। এর বেশি আপনার কাছে আমার আর কিছুই চাইবার নেই।’ [স্বপ্নের সানুদেশ : স্বপ্নের সানুদেশ] তাই আমরা বলতেই পারি, কবি মোশাররফ হোসেন খান- স্বপ্নের সানুদেশে জাগ্রত এক প্রাণ!




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com