‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিকূলতা জয় করে সাফল্য অর্জনকারী নারীদের মধ্যে সফল জননীর সন্মাননা পেয়েছেন শামসুন নাহার। সে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার তাড়াশ গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী। শামসুন নাহার বলেন, আমার খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়, পরপর ৮ সন্তানের মা হয়ে যাই আমি। তখন আমার স্বামী পাবনা বুলবুল কলেজে চাকরি করতেন। আমার স্বামী পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পর গ্রামের বাড়ি তাড়াশ চলে আসেন। নিজ এলাকায় পড়ালেখার মানোন্নয়নে তাড়াশ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ও একই কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ ও চাকরির জন্য তাড়াশ সদরেই থাকতেন। শ্বশুর বাড়ি ছিলো তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে। ৮ সন্তানকে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতেই থাকতাম আমি। সংসার সামলানো ও সন্তানদের দেখাশোনা আমাকেই করতে হতো। গ্রামে জমিজমা ছিলো। সাংসারিক সমস্ত দায়িত্ব পালন করে সন্তানদের পড়ালেখার দায়িত্বও আমাকেই পালন করতে হতো। পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানদের সুশিক্ষিত করতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করতে যেন অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে না হয়, সাংসারিক কাজের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন ও ছাগল পালন করতে থাকি। গ্রামে পড়ালেখার সুযোগ সুবিধা না থাকায় বড় সন্তানদের তাড়াশ সদরে পাঠিয়ে দেই। এরই মধ্যে আমার বড় মেয়ে সন্তান প্রসবের সময় মারা যায়। আঘাত সইতে না পেরে স্ট্রোক করি আমি। আমার শরীরের বাম দিক অচল হয়ে যায়। অনেক চিকিৎসা করে কিছুটা সুস্থ হলে সন্তানদের পড়ালেখার কথা চিন্তা করে তাড়াশ সদরে চলে আসি। তাড়াশ থেকেও আমার গ্রামের বাড়ি দেখাশোনা করতে হতো। তবে, আগে সন্তানদের পড়ালেখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরে অন্য বিষয়গুলো সামলে নিয়েছি। আমার ছোট ছেলে সোয়েবুর রহমান অনেক মেধাবী ছিলো। সে পঁঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলো, তাড়াশ থানার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলো। তার মেধা যাতে আরও বিকশিত করতে পারে, তাকে উন্নত পড়ালেখার জন্য রাজশাহীতে পাঠিয়ে দেই রাজশাহী কলিজিয়েট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য। আমার ছোট ছেলে সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করলে তাকে ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য উৎসাহ দেই। নটরডেম কলেজে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করে। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সুযোগ পায়। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এল.এল.বি (অনার্স) ও এল.এল.এম পাশ করে। পড়ালেখা শেষ করে প্রথমে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে ল’ ডিপার্টমেন্টে লেকচারার হিসেবে জয়েন করে। পরবর্তীতে ৭ম বিসিএস পরিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগদান করেন। আজ আমি সন্তানদের সফলতার জন্য গর্ববোধ করি। আরেক ছেলে শহীদুল্লাহ শাহীন এসএসসি পাশ করে কৃষি পেশায় রয়েছে। সালাউদ্দিন শামীম বিএ পাশ করে প্রাইভেট চাকরি করছে। মেয়ে মহাসিনা খাতুন রিনা এইচএসসি পাশ। আরেক মেয়ে মহিমা খাতুন এসএসসি পাশ। মদিনা খাতুন এইচএসসি পাশ ও মুর্শিদা খাতুন এমএ পাশ। তিনি আরও বলেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়ালেখা শিখিয়েছি। তাদের জন্যই আজ আমার এ সন্মাননা।