ঢাকা ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo নেত্রকোনা হাওরাঞ্চলের হাটবাজারে ধানের চারা ব্যাপক চাহিদা Logo জামালপুরে প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ বঞ্চিত ৫১ জন আমরণ অনশনে Logo খাল খনন নামে ৩০ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ Logo অফিস বন্ধ করে সদস্যদের তিন কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন সমিতির সভাপতি Logo টুঙ্গিপাড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান গাঁজা সেবনে ১ মাস, ইয়াবা সেবনে ৩ মাসের কারাদন্ড Logo গাইবান্ধায় প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে মানববন্ধন Logo কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে ফ্রেন্ডশিপের ভেড়া বিতরণ Logo তাড়াশে অতিরিক্ত টাকা দিলেই মিলছে গুদামজাত সার Logo ধনবাড়ীতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বৃক্ষরোপণ অভিযান Logo ৯ প্রতারক গ্রেফতার, উদ্ধার নগদ টাকা-২০ সিম-১১ মোবাইল

কৃষকের কান্না, দেশের কান্না

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। যুগ যুগ ধরে এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আজও দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের ওপর। অথচ সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলোÑযে মানুষটি আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, সেই কৃষকই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও অসহায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়,মাধ্যমে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয়, আজ একজন সাধারণ ধানের ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, বরং হাজারো কৃষকের কষ্টের সাক্ষী হয়ে আপনাদের কাছে এই আকুল আবেদন জানাচ্ছি। আমি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার এলাকার একজন ধানের ব্যবসায়ী। আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ব্যবসা করি না; প্রতিদিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলি, তাদের ঘামের মূল্যহীনতা দেখি, তাদের চোখের জল দেখি। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আজ এই কথাগুলো বলছি। একজন দিনমজুর বা কামলার দৈনিক মজুরি প্রায় ৭০০ টাকা। তার সঙ্গে দুই বেলার খাবারের খরচও যোগ করতে হয়। অথচ একজন কৃষক যখন এক মণ ধান বিক্রি করতে বাজারে যান, তখন অনেক সময় মাত্র ৮০০ টাকার মতো দাম পান। এই সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি কীভাবে শ্রমিকের মজুরি দেবেন? কীভাবে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ মেটাবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ দেবেন? বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কিনবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজ কৃষকের কাছে নেই। ধান উৎপাদনের জন্য কৃষককে বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, খরাÑসব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি ফসল ফলান। কিন্তু যখন সেই ফসল বিক্রির সময় আসে, তখন বাজারমূল্য এতটাই কম থাকে যে উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। ফলাফলÑঋণের বোঝা, হতাশা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন। একজন কৃষক যদি তার ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে তিনি আর কতদিন কৃষিকাজে আগ্রহী থাকবেন? যদি কৃষক জমি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়াবে? কৃষকের দুর্দশা শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আজ প্রয়োজন কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সরকারিভাবে আরও বেশি পরিমাণে ধান সংগ্রহ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। কৃষক যদি তার ঘামের ন্যায্য মূল্য পান, তাহলে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো দেশই উপকৃত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বহুবার কৃষকের উন্নয়নের কথা বলেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো অনেক কৃষকের জন্য অত্যন্ত কঠিন। তাই বিনীতভাবে অনুরোধ, মাঠের মানুষের কান্না শুনুন। কৃষকের চোখের জল যেন আর অবহেলার ইতিহাস না হয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার কৃষক। কারণ কৃষক বেঁচে থাকলে দেশ বাঁচবে, খাদ্য বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক যদি ভেঙে পড়েন, তাহলে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন এবং গর্ব করে বলতে পারবেনÑ“আমি কৃষক, আমি দেশের প্রাণ।” কৃষকের হাসিই হোক বাংলাদেশের সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রতীক। কারণ যে দেশের কৃষক সুখে থাকে, সেই দেশ কখনো ক্ষুধার কাছে পরাজিত হয় না।
মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

নেত্রকোনা হাওরাঞ্চলের হাটবাজারে ধানের চারা ব্যাপক চাহিদা

কৃষকের কান্না, দেশের কান্না

আপডেট সময় ০২:৪১:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। যুগ যুগ ধরে এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আজও দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের ওপর। অথচ সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলোÑযে মানুষটি আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, সেই কৃষকই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও অসহায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়,মাধ্যমে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয়, আজ একজন সাধারণ ধানের ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, বরং হাজারো কৃষকের কষ্টের সাক্ষী হয়ে আপনাদের কাছে এই আকুল আবেদন জানাচ্ছি। আমি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার এলাকার একজন ধানের ব্যবসায়ী। আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ব্যবসা করি না; প্রতিদিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলি, তাদের ঘামের মূল্যহীনতা দেখি, তাদের চোখের জল দেখি। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আজ এই কথাগুলো বলছি। একজন দিনমজুর বা কামলার দৈনিক মজুরি প্রায় ৭০০ টাকা। তার সঙ্গে দুই বেলার খাবারের খরচও যোগ করতে হয়। অথচ একজন কৃষক যখন এক মণ ধান বিক্রি করতে বাজারে যান, তখন অনেক সময় মাত্র ৮০০ টাকার মতো দাম পান। এই সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি কীভাবে শ্রমিকের মজুরি দেবেন? কীভাবে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ মেটাবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ দেবেন? বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কিনবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজ কৃষকের কাছে নেই। ধান উৎপাদনের জন্য কৃষককে বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, খরাÑসব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি ফসল ফলান। কিন্তু যখন সেই ফসল বিক্রির সময় আসে, তখন বাজারমূল্য এতটাই কম থাকে যে উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। ফলাফলÑঋণের বোঝা, হতাশা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন। একজন কৃষক যদি তার ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে তিনি আর কতদিন কৃষিকাজে আগ্রহী থাকবেন? যদি কৃষক জমি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়াবে? কৃষকের দুর্দশা শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আজ প্রয়োজন কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সরকারিভাবে আরও বেশি পরিমাণে ধান সংগ্রহ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। কৃষক যদি তার ঘামের ন্যায্য মূল্য পান, তাহলে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো দেশই উপকৃত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বহুবার কৃষকের উন্নয়নের কথা বলেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো অনেক কৃষকের জন্য অত্যন্ত কঠিন। তাই বিনীতভাবে অনুরোধ, মাঠের মানুষের কান্না শুনুন। কৃষকের চোখের জল যেন আর অবহেলার ইতিহাস না হয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার কৃষক। কারণ কৃষক বেঁচে থাকলে দেশ বাঁচবে, খাদ্য বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক যদি ভেঙে পড়েন, তাহলে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন এবং গর্ব করে বলতে পারবেনÑ“আমি কৃষক, আমি দেশের প্রাণ।” কৃষকের হাসিই হোক বাংলাদেশের সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রতীক। কারণ যে দেশের কৃষক সুখে থাকে, সেই দেশ কখনো ক্ষুধার কাছে পরাজিত হয় না।
মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।