ঢাকা ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সলঙ্গা-তাড়াশ সড়কের বেহাল দশা: দুর্ভোগে যাত্রী ও চালক, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি Logo কীট সংকটে কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ Logo জাংগালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ডেঙ্গু মশা নিধন সম্পর্কে র‌্যালি ও আলোচনা Logo নবীনগর দেওয়ানী আদালত পরিদর্শন করেন দুই হাইকোটের বিচারপতি Logo মনোহরগঞ্জে ২০ মাসেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ দুর্ভোগে কয়েক হাজার মানুষ Logo ধনবাড়ীতে পুলিশের অভিযানে ৭৮ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার Logo পাঁচবিবিতে মাওড়িতলা ব্রিজে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল, লাইট পোস্ট দাবি Logo স্পিকারের এপিএস সবুজকে ঘিরে অপপ্রচার, প্রতিবাদ Logo স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর প্রচেষ্টায় উপকুলবাসী পেল ইউবিইএসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চুড়ান্ত অনুমোদন Logo মৌলভীবাজারে চাঞ্চল্যকর নাঈম হত্যা মামলায় ৪ জনের ফাঁসি, ৫ জন খালাস

সম্প্রীতির ১১০০ বছরের ঐতিহ্যে রাশিয়া, নজর কাড়ছে ভিন দেশীদের

সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র রাশিয়া’র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ১১০০ বছরের ঐতিহ্য নজর কাড়ছে ভীন দেশীদের। প্রতি বছরই বিশে^র বিভিন্ন দেশের নানা ধর্ম-বর্ণ ও জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ রাশিয়া ভ্রমণ করছে। ভ্রমণকারীদের মতে, রাশিয়া তাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা অর্জন করেছে। জানা গেছে, বিশ^ দরবারে রাশিয়ার ১১০০ বছরের ইসলামী ঐতিহ্য তুলে ধরেছে মস্কো ক্যাথেড্রাল মসজিদে ‘ইসলামিক হেরিটেজ অব রাশিয়া: পিপল অ্যান্ড ট্র্যাডিশনস’ প্রদর্শনী। এর লক্ষ্য রাশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস এবং দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে তাদের অবদান তুলে ধরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার মুসলিমদের ধর্মীয় বোর্ডের প্রধান শেখ রাভিল গাইনুতদিন, বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক, তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা এবং রুশ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হয় আলোচিত এ প্রদর্শনীটি। প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ(সা.)-এর জন্মবার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ প্রদর্শনীতে রাশিয়ায় ইসলাম ও মুসলমানদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক চিত্র ফুঁটে উঠেছে। এতে রাশিয়ায় কোরআন প্রচারের ইতিহাস, লেখার সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, অলংকার ও কারুশিল্প এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের চারুকলা তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা গেছে, উত্তর ইউরেশিয়ায় অবস্থিত রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশ। ধর্মীয়ভাবে অধিকাংশ মানুষ রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টান। এছাড়া উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠীসহ বহুজাতিক, বহুধর্মাবলম্বী ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে রাশিয়া। আয়তনের দিক থেকে ইউরোপ ও এশিয়া উভয় মহাদেশের বৃহত্তম এই রাষ্ট্রটিকে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের সমান ১১৬টি ভূখ-কে একত্রিত করলে সেই সম্মিলিত ভূখ-টি রাশিয়ার সমান হবে। জনসংখ্যার দিক থেকে রাশিয়া ইউরোপের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র, কিন্তু তারপরও রাশিয়ার জনসংখ্যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়ে কম। যা তার শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য, বৈপ্লবিক ইতিহাস এবং বিশ্বমানের শিল্পকলার জন্য পরিচিত। আরও জানা যায়, কিয়েভান রুস থেকে শুরু করে জার সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন পর্যন্ত রাশিয়ার ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মস্কোর ক্রেমলিন এবং রেড স্কয়ার রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু। সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজকীয় প্রাসাদগুলো জারের আমলের জাঁকজমক ফুটিয়ে তোলে। রাশিয়ায় ২৩টিরও বেশি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। রাষ্ট্রটির সংস্কৃতিতে স্লাভিক ঐতিহ্য, বাইজেন্টাইন সংস্কৃতি এবং এশীয় প্রভাবের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুল মাতরিওশকা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। এছাড়া সামোভার বা চা বানানোর বিশেষ পাত্র এবং বিভিন্ন লোকনৃত্য তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীতের বিদায় এবং বসন্তের আগমন উদযাপনে ‘মাসলেনিতসা’ উৎসব এবং অর্থোডক্স খ্রিষ্টীয় উৎসবগুলো বেশ ধুমধামের সাথে পালিত হয়। লিও টলস্টয়, ফিওদোর দস্তয়েভস্কি এবং আলেকজান্ডার পুশকিনের মতো লেখকরা বিশ্ব সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বলশয় থিয়েটার এবং মারিনস্কি থিয়েটারের ব্যালে নাচ বিশ^ বিখ্যাত। চাইকোভস্কির মতো সুরকারদের ক্লাসিক্যাল মিউজিক আজো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সেন্ট পিটার্সবার্গের হারমিটেজ মিউজিয়াম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রাচীন শিল্পকলা জাদুঘর। মস্কোর ট্রেতিয়াকভ গ্যালারিতে রাশিয়ান ফাইন আর্টসের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য রাশিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান পছন্দ। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটি বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয়। মহাকাশ বিজ্ঞান, পারমাণবিক শক্তি এবং গণিতে রাশিয়ার অবদান ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী। রাজধানী মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। মস্কোর চারপাশের কিছু প্রাচীন শহরের একটি রুট, যেখানে রাশিয়ার আদি স্থাপত্য ও গ্রামীণ ঐতিহ্য দেখা যায়। বিশ্বের দীর্ঘতম রেলপথ ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে দিয়ে ভ্রমণ এবং পৃথিবীর গভীরতম হ্রদ ‘বৈকাল হ্রদ’ দর্শন পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রীয় সূত্র জানায়, রাজনৈতিকভাবে রাশিয়া একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। সেখানে প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি ও সামরিক শক্তির কারণে রাশিয়া বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। রাশিয়া তার বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। সাইবেরিয়ার তুষারাচ্ছন্ন অঞ্চল, বিশ্বের গভীরতম হ্রদ বৈকাল, বিস্তীর্ণ বনভূমি এবং আর্কটিক এলাকার বরফাচ্ছন্ন প্রকৃতি রাষ্ট্রটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়া তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও সামরিক শিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক। এছাড়া মহাকাশ প্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তি ও ভারী শিল্পেও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। নাগরিক জীবনে শিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায় রয়েছে রাশিয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় দেশটির অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বর্তমানে দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ করছে রাশিয়া। চলতি বছরের ৩০ জুন রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকার অর্ধ-বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য রাশিয়ান সরকারের বৃত্তির সংখ্যা ২০১৮ সালের ৬৫টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে ২০০টিতে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে আরও অধিকসংখ্যক মেধাবী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ও রাশিয়া পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে মন্তব্য করেন রাশিয়ান হাউসের পরিচালক আলেকজান্দ্রা খেলভনই। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে বর্তমান অস্থিরতা সত্ত্বেও, মস্কো এবং ঢাকা সর্বদা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিভিন্ন বৈশ্বিক ও দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে একই দৃষ্টিভঙ্গি এবং একটি ন্যায়সঙ্গত বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য একটি যৌথ অঙ্গীকারের ভিত্তিতে অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক সংলাপে জড়িত। অনলাইনে রাশিয়ান সরকারের বৃত্তিপ্রাপ্ত মস্কোর রাশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব ফ্রেন্ডশিপ অব পিপলসের ফিলোলজি অনুষদের ম্যাস কমিউনিকেশন বিভাগে গ্লোবাল অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ‘শিক্ষা, শিক্ষাজীবন, আবাসন ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে রাশিয়ান সরকার। সার্বিক সুবিধা বিবেচনায় ভিন দেশী শিক্ষার্থীরা আগ্রহের সাথে রাশিয়ায় পড়ালেখার জন্য আসছে’। অপর বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাশিয়ার বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ বিশ^ দরবারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। বিভিন্ন সময়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা ভলগা অঞ্চল, ককেশাস ও সাইবেরিয়াসহ রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকার মুসলমানদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছে। এসব নিদর্শনে রুশ মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয়েছে’। সম্প্রতি রাশিয়া ভ্রমণকারী ব্যবসায়ী ইমাম হোসেন বলেন, ‘ভ্রমণ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে রাশিয়া অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তারা ইতিহাস সংরক্ষণ করে। মস্কোর ক্রেমলিন, সেন্ট পিটার্সবার্গের ঐতিহাসিক স্থাপনা, ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ এবং তুষারময় প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া রাশিয়ার সাহিত্য, ব্যালে নৃত্য ও শাস্ত্রীয় সংগীত বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। সব মিলিয়ে রাশিয়া এমন একটি দেশ যেখানে বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি, শক্তিশালী ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য বৈশ্বিক পরিচয়’। ইউরোপ-এশিয়া ভ্রমণ টিম বাংলাদেশ আহবায়ক আল আমিন রাসেল মঙ্গলবার বলেন, ‘মস্কো শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে হাজার বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে। ফলে রাশিয়া একটি সম্প্রীতির রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ। সুন্দর পরিবেশ, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও ঐতিহ্যের কারনে রাশিয়ার প্রতি দিন দিন ভিন দেশীদের আগ্রহ বাড়ছে’।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সলঙ্গা-তাড়াশ সড়কের বেহাল দশা: দুর্ভোগে যাত্রী ও চালক, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

সম্প্রীতির ১১০০ বছরের ঐতিহ্যে রাশিয়া, নজর কাড়ছে ভিন দেশীদের

আপডেট সময় ০১:৩৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র রাশিয়া’র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ১১০০ বছরের ঐতিহ্য নজর কাড়ছে ভীন দেশীদের। প্রতি বছরই বিশে^র বিভিন্ন দেশের নানা ধর্ম-বর্ণ ও জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ রাশিয়া ভ্রমণ করছে। ভ্রমণকারীদের মতে, রাশিয়া তাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা অর্জন করেছে। জানা গেছে, বিশ^ দরবারে রাশিয়ার ১১০০ বছরের ইসলামী ঐতিহ্য তুলে ধরেছে মস্কো ক্যাথেড্রাল মসজিদে ‘ইসলামিক হেরিটেজ অব রাশিয়া: পিপল অ্যান্ড ট্র্যাডিশনস’ প্রদর্শনী। এর লক্ষ্য রাশিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস এবং দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে তাদের অবদান তুলে ধরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার মুসলিমদের ধর্মীয় বোর্ডের প্রধান শেখ রাভিল গাইনুতদিন, বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক, তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা এবং রুশ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হয় আলোচিত এ প্রদর্শনীটি। প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ(সা.)-এর জন্মবার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ প্রদর্শনীতে রাশিয়ায় ইসলাম ও মুসলমানদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক চিত্র ফুঁটে উঠেছে। এতে রাশিয়ায় কোরআন প্রচারের ইতিহাস, লেখার সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, অলংকার ও কারুশিল্প এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের চারুকলা তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা গেছে, উত্তর ইউরেশিয়ায় অবস্থিত রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশ। ধর্মীয়ভাবে অধিকাংশ মানুষ রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টান। এছাড়া উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠীসহ বহুজাতিক, বহুধর্মাবলম্বী ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে রাশিয়া। আয়তনের দিক থেকে ইউরোপ ও এশিয়া উভয় মহাদেশের বৃহত্তম এই রাষ্ট্রটিকে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের সমান ১১৬টি ভূখ-কে একত্রিত করলে সেই সম্মিলিত ভূখ-টি রাশিয়ার সমান হবে। জনসংখ্যার দিক থেকে রাশিয়া ইউরোপের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র, কিন্তু তারপরও রাশিয়ার জনসংখ্যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়ে কম। যা তার শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য, বৈপ্লবিক ইতিহাস এবং বিশ্বমানের শিল্পকলার জন্য পরিচিত। আরও জানা যায়, কিয়েভান রুস থেকে শুরু করে জার সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন পর্যন্ত রাশিয়ার ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মস্কোর ক্রেমলিন এবং রেড স্কয়ার রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু। সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজকীয় প্রাসাদগুলো জারের আমলের জাঁকজমক ফুটিয়ে তোলে। রাশিয়ায় ২৩টিরও বেশি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। রাষ্ট্রটির সংস্কৃতিতে স্লাভিক ঐতিহ্য, বাইজেন্টাইন সংস্কৃতি এবং এশীয় প্রভাবের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুল মাতরিওশকা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। এছাড়া সামোভার বা চা বানানোর বিশেষ পাত্র এবং বিভিন্ন লোকনৃত্য তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীতের বিদায় এবং বসন্তের আগমন উদযাপনে ‘মাসলেনিতসা’ উৎসব এবং অর্থোডক্স খ্রিষ্টীয় উৎসবগুলো বেশ ধুমধামের সাথে পালিত হয়। লিও টলস্টয়, ফিওদোর দস্তয়েভস্কি এবং আলেকজান্ডার পুশকিনের মতো লেখকরা বিশ্ব সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বলশয় থিয়েটার এবং মারিনস্কি থিয়েটারের ব্যালে নাচ বিশ^ বিখ্যাত। চাইকোভস্কির মতো সুরকারদের ক্লাসিক্যাল মিউজিক আজো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সেন্ট পিটার্সবার্গের হারমিটেজ মিউজিয়াম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রাচীন শিল্পকলা জাদুঘর। মস্কোর ট্রেতিয়াকভ গ্যালারিতে রাশিয়ান ফাইন আর্টসের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য রাশিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান পছন্দ। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটি বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয়। মহাকাশ বিজ্ঞান, পারমাণবিক শক্তি এবং গণিতে রাশিয়ার অবদান ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী। রাজধানী মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। মস্কোর চারপাশের কিছু প্রাচীন শহরের একটি রুট, যেখানে রাশিয়ার আদি স্থাপত্য ও গ্রামীণ ঐতিহ্য দেখা যায়। বিশ্বের দীর্ঘতম রেলপথ ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে দিয়ে ভ্রমণ এবং পৃথিবীর গভীরতম হ্রদ ‘বৈকাল হ্রদ’ দর্শন পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রীয় সূত্র জানায়, রাজনৈতিকভাবে রাশিয়া একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। সেখানে প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি ও সামরিক শক্তির কারণে রাশিয়া বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। রাশিয়া তার বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। সাইবেরিয়ার তুষারাচ্ছন্ন অঞ্চল, বিশ্বের গভীরতম হ্রদ বৈকাল, বিস্তীর্ণ বনভূমি এবং আর্কটিক এলাকার বরফাচ্ছন্ন প্রকৃতি রাষ্ট্রটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়া তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও সামরিক শিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক। এছাড়া মহাকাশ প্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তি ও ভারী শিল্পেও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। নাগরিক জীবনে শিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায় রয়েছে রাশিয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় দেশটির অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বর্তমানে দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ করছে রাশিয়া। চলতি বছরের ৩০ জুন রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকার অর্ধ-বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য রাশিয়ান সরকারের বৃত্তির সংখ্যা ২০১৮ সালের ৬৫টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে ২০০টিতে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে আরও অধিকসংখ্যক মেধাবী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ও রাশিয়া পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে মন্তব্য করেন রাশিয়ান হাউসের পরিচালক আলেকজান্দ্রা খেলভনই। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে বর্তমান অস্থিরতা সত্ত্বেও, মস্কো এবং ঢাকা সর্বদা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিভিন্ন বৈশ্বিক ও দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে একই দৃষ্টিভঙ্গি এবং একটি ন্যায়সঙ্গত বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য একটি যৌথ অঙ্গীকারের ভিত্তিতে অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক সংলাপে জড়িত। অনলাইনে রাশিয়ান সরকারের বৃত্তিপ্রাপ্ত মস্কোর রাশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব ফ্রেন্ডশিপ অব পিপলসের ফিলোলজি অনুষদের ম্যাস কমিউনিকেশন বিভাগে গ্লোবাল অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ‘শিক্ষা, শিক্ষাজীবন, আবাসন ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে রাশিয়ান সরকার। সার্বিক সুবিধা বিবেচনায় ভিন দেশী শিক্ষার্থীরা আগ্রহের সাথে রাশিয়ায় পড়ালেখার জন্য আসছে’। অপর বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাশিয়ার বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ বিশ^ দরবারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। বিভিন্ন সময়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা ভলগা অঞ্চল, ককেশাস ও সাইবেরিয়াসহ রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকার মুসলমানদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছে। এসব নিদর্শনে রুশ মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয়েছে’। সম্প্রতি রাশিয়া ভ্রমণকারী ব্যবসায়ী ইমাম হোসেন বলেন, ‘ভ্রমণ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে রাশিয়া অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তারা ইতিহাস সংরক্ষণ করে। মস্কোর ক্রেমলিন, সেন্ট পিটার্সবার্গের ঐতিহাসিক স্থাপনা, ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ এবং তুষারময় প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া রাশিয়ার সাহিত্য, ব্যালে নৃত্য ও শাস্ত্রীয় সংগীত বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। সব মিলিয়ে রাশিয়া এমন একটি দেশ যেখানে বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি, শক্তিশালী ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য বৈশ্বিক পরিচয়’। ইউরোপ-এশিয়া ভ্রমণ টিম বাংলাদেশ আহবায়ক আল আমিন রাসেল মঙ্গলবার বলেন, ‘মস্কো শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে হাজার বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে। ফলে রাশিয়া একটি সম্প্রীতির রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ। সুন্দর পরিবেশ, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও ঐতিহ্যের কারনে রাশিয়ার প্রতি দিন দিন ভিন দেশীদের আগ্রহ বাড়ছে’।