সামান্য একটি চলাচলের সড়ক। সেই সড়ক নিয়ে বিরোধে প্রাণ গেল ২৪ বছর বয়সী বিল্লাল হোসেনের। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে থেমে গেল একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও। স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। একটি ছোট বিরোধ কীভাবে একটি পরিবারের জন্য আজীবন শোকের কারণ হয়ে উঠতে পারে, বিল্লাল হোসেনের মৃত্যু তারই নির্মম উদাহরণ।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বিল্লাল হোসেন। সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে প্রবেশের সড়ক নিয়ে পাশের ঘরের মোজাম্মেল হোসেনের পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিবারের বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত ২৪ জুলাই মোজাম্মেল হোসেনের পরিবার সড়কে বাঁশের বেড়া দেয়। কিছুক্ষণ পর বিল্লাল হোসেনসহ তাঁর স্বজনরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেই বেড়া সরাতে গেলে মোজাম্মেলের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন বিল্লাল। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে কুমিল্লার একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৪ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।
একটি সামান্য বিরোধ শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল একটি তরুণ প্রাণ। বিল্লালের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। এখন তাঁদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কে নেবে? একটি প্রাণ হারানোর পর আইনি বিচার হলেও সেই পরিবারের শূন্যতা কি আর পূরণ হবে?
হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি মোজাম্মেল হোসেনকে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। হয়তো আইনের প্রক্রিয়ায় একসময় তিনি জামিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু আর কখনো ফিরবেন না সিএনজি অটোরিকশাচালক বিল্লাল হোসেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে বয়ে বেড়াতে হবে এই শোকের ভার।
বিল্লালের এই পরিণতি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্নও দাঁড় করায়-একটি বিরোধ কি সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা যেত না?
জায়গা নিয়ে বিরোধ, টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া, পারিবারিক সমস্যা, প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ-বিভিন্ন কারণেই পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত সংঘাত তৈরি হয়। এসব সংঘাতে কখনো প্রাণ যায়, কখনো ঘরবাড়ি হারায় মানুষ, আবার কখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়ায় ক্ষত।
সংঘাতের বিপরীতে সংলাপ হতে পারে সবচেয়ে মানবিক পথ। মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, মতভেদ ও বিরোধ নিরসনে পারস্পরিক আলোচনা এবং সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান পৃথিবীতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই সময়ে পারস্পরিক মতভেদ দূর করে সমঝোতার সেতু তৈরিতে সংলাপ একটি কার্যকর হাতিয়ার।
ইসলামেও বিতর্ক ও সংলাপকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উচ্চবাচ্য কিংবা শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে যুক্তি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে মতভেদ মোকাবিলার শিক্ষা রয়েছে। নবীজি (সা.) মক্কার মুশরিকদের পাশাপাশি ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মোনাফেকদের সঙ্গেও সংলাপ করেছেন। পারিবারিক জীবন, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কসব ক্ষেত্রেই সমস্যা সমাধান ও উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আমাদের সমাজে সংলাপের জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অসহিষ্ণুতা, গোঁড়ামি, অন্যের মতকে অগ্রাহ্য করা এবং সামান্য মতভেদেই কাউকে ‘ভুল’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রকাশ আরও স্পষ্ট। সামান্য মতপার্থক্য থেকেই মানুষ কদর্য ভাষায় আক্রমণ করছে একে অন্যকে। কুধারণা, অসহিষ্ণুতা ও ন্যায়বিচারের অভাব সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন ‘সংলাপ সংস্কৃতি’। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক সংগঠনে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মতভেদকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সংলাপ যত উন্নত ও রুচিশীল হবে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের সুযোগ তত বাড়বে।
প্রতি বছর ১৯ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব মানবিক সহায়তা দিবস। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘের কানাল হোটেলে বোমা হামলায় ২২ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হন। তাঁদের স্মরণে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৮ সালে ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবিক সহায়তা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সংকটে আক্রান্ত মানুষের জীবন, মর্যাদা ও কল্যাণ রক্ষা এবং মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মানবাধিকার মানুষের অধিকার রক্ষার নৈতিক ও আন্তর্জাতিক ভিত্তি তৈরি করে। আর মানবিক সহায়তা যুদ্ধ, সংঘাত, দুর্যোগ, বাস্তুচ্যুতি ও অন্যান্য সংকটে মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় বাস্তব ভূমিকা রাখে। তাই সংঘাত কমানো এবং মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে সংলাপ, আইন, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার গুরুত্ব অপরিসীম।
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পটভূমিতে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। এতে জীবনের অধিকার, স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, নির্যাতন থেকে মুক্তি, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশ, শিক্ষা, কাজ, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের মতো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে যদি ঘৃণা, প্রতিশোধ ও সহিংসতা বাড়তে থাকে, তাহলে মানবাধিকারের মূল উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে পড়ে। অধিকার প্রতিষ্ঠার টেকসই পথ তাই সংলাপ, আইন, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মান।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষে বিশ্বের ২৫ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ জরুরি মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষার প্রয়োজনের মধ্যে ছিল। বছরের শুরুতে করা হিসাবের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেড়েছে। একই সময়ে মানবিক সহায়তার পরিকল্পনাগুলোর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩৩৬৬ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু মে মাসের শেষে পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ৮২১ কোটি ডলার, যা প্রয়োজনের প্রায় ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান কেবল অর্থের ঘাটতির হিসাব নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার কিংবা একটি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জীবন। কোথাও যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে, কোথাও খাদ্য ও পানির সংকট, কোথাও আক্রান্ত হচ্ছে হাসপাতাল ও বিদ্যালয়। আবার কোথাও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য হচ্ছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৬ সালের বার্তায় বলা হয়েছে, গত তিন বছরে প্রায় এক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন এবং ২০২৫ সালে ৩৫০ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হন। যুদ্ধক্ষেত্রে নারী ও কন্যাশিশুরা যৌন সহিংসতা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতার অতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকে।
মানবিক সহায়তাকর্মী, চিকিৎসক, ধাত্রী, অ্যাম্বুলেন্সচালক কিংবা উদ্ধারকর্মীর ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; এটি সংকটে থাকা অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থার ওপরও আঘাত। তাই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং চিকিৎসা ও মানবিক স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় পর্যায়েও সংঘাতের পরিণতি একইভাবে ভয়াবহ। মোজাম্মেল হোসেন নামের এক ভুক্তভোগীর অভিমত, ‘পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত সংলাপের মাধ্যমে যেকোনো সংঘাত প্রতিরোধ ও নিরসন করা সম্ভব। সংলাপে মানুষ বা প্রতিনিধিরা তাদের ভুল বুঝতে পারে। সেখানে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়। সুতরাং, সত্যিকারের অস্ত্রের চেয়ে সংলাপ নামের অস্ত্র বড়ই কার্যকর’।
মানবাধিকারকর্মী মোঃ আবদুস সাত্তারের ভাষ্য, ‘সংঘাত প্রতিরোধে সমাজের দারিদ্র্য, বৈষম্য বা অবিচার দূর করতে হবে। এছাড়া হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ তৈরি না করে সংলাপের মাধ্যমে পরিবার থেকে শুরু করে পৃথিবীর সকল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব’। উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘যে কোনো সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদ্ধতি সংলাপ। সমস্যার শুরুতেই যদি সংলাপ কার্যকর হয়, তাহলে কোনো প্রাণহানিই ঘটবে না’।
জাতীয় সংসদ সদস্য ডাঃ সৈয়দ আবদুল্লাহ মোঃ তাহের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলেছেন, ‘দেশের শান্তি, উন্নতি, মানবাধিকার রক্ষা, সংঘাত প্রতিরোধ ও নিরসনে স্টেকহোল্ডার বা পক্ষগুলোর সংলাপ কার্যকর ভূমিকা রাখে। সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল সমস্যা সমাধান করা যায়। ভবিষ্যতেও যেকোনো সংঘাত প্রতিরোধ ও নিরসনে সংলাপই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে’। বিল্লাল হোসেনের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় সংঘাতের শুরু অনেক সময় খুব ছোট একটি বিরোধ থেকে। সেই বিরোধ যদি সময়মতো আলোচনার টেবিলে আসে, তাহলে হয়তো একটি প্রাণ বাঁচতে পারে, একটি পরিবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। তাই শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য সংলাপ শুধু একটি কৌশল নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব। সংঘাতের আগে সংলাপ, প্রতিশোধের আগে সমঝোতা এবং সহিংসতার আগে মানবিকতার চর্চাই পারে আমাদের সমাজকে আরও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করে তুলতে। অস্থির এই পৃথিবীতে সংলাপ তাই কেবল উন্নত চরিত্রের পরিচয় নয়, মানবসভ্যতার টিকে থাকারও এক অপরিহার্য দাবি।
সংবাদ শিরোনাম
সংঘাত থামাতে সংলাপের বিকল্প নেই
-
মোঃ এমদাদ উল্যাহ - আপডেট সময় ০৭:২৪:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 63
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























