ঢাকা ০৫:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সলঙ্গা-তাড়াশ সড়কের বেহাল দশা: দুর্ভোগে যাত্রী ও চালক, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি Logo কীট সংকটে কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ Logo জাংগালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ডেঙ্গু মশা নিধন সম্পর্কে র‌্যালি ও আলোচনা Logo নবীনগর দেওয়ানী আদালত পরিদর্শন করেন দুই হাইকোটের বিচারপতি Logo মনোহরগঞ্জে ২০ মাসেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ দুর্ভোগে কয়েক হাজার মানুষ Logo ধনবাড়ীতে পুলিশের অভিযানে ৭৮ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার Logo পাঁচবিবিতে মাওড়িতলা ব্রিজে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল, লাইট পোস্ট দাবি Logo স্পিকারের এপিএস সবুজকে ঘিরে অপপ্রচার, প্রতিবাদ Logo স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর প্রচেষ্টায় উপকুলবাসী পেল ইউবিইএসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চুড়ান্ত অনুমোদন Logo মৌলভীবাজারে চাঞ্চল্যকর নাঈম হত্যা মামলায় ৪ জনের ফাঁসি, ৫ জন খালাস

টাই স্যূটের আড়ালে: অমানবিকতার অন্ধকার

পারস্যের কবি, শেখ সাদীর জীবনর গল্প আমরা সবাই জানি। একবার শেখ সাদী সাধারণ ও মলিন পোশাক পরে এক ধনী ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য যান। বাড়ির লোকজন তার সাধারণ বেশভূষা দেখে তাকে অবহেলা করে এবং সামান্য খাবার দেয়। এর কিছুদিন পর রাজদরবার থেকে ফেরার পথে বাদশাহর দেওয়া অত্যন্ত দামি ও জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে আবার ওই একই ব্যক্তির বাড়িতে উপস্থিত হন তিনি। এবার সেই ধনী ব্যক্তি ও তার লোকজন শেখ সাদীকে অত্যন্ত সমাদর করে এবং সুস্বাদু খাবারে আপ্যায়ন করে। তখন শেখ সাদী খাবার মুখে না তুলে পকেটে বা জামার ভাঁজে পুরতে থাকেন। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে এর কারণ জানতে চায়।
শেখ সাদী শান্তভাবে বলেন, “এই খাবার আমার জন্য নয়, আমার এই দামি পোশাকের জন্য। কারণ আমি যখন সাধারণ পোশাকে এসেছিলাম, তখন তোমরা আমাকে কোনো পাত্তা দেওয়নি। আর দামি পোশাক পরায় আজ তোমরা আমাকে সম্মান ও সুস্বাদু খাবার দিচ্ছ। তাই এই খাবার পোশাকেরই প্রাপ্য!” গল্পের শিক্ষামানুষের বাহ্যিক রূপ বা পোশাক দেখে তার গুণ বা মর্যাদা বিচার করা উচিত নয়। মানুষের আসল পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার জ্ঞানে ও চরিত্রে।
আমাদের এ কথিত সভ্য সমাজে স্যুট-টাই পরা আধুনিক বস্তুবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত এক শ্রেণির মানুষ, তাদের ভিতরের লোভ, লালসার প্রতিফলন ঘুষ-দুর্নীতির মতো অপরাধ পোশাকের আড়ালে ঢেকে রাখেন।
আবার তারাই প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। সভা-সমাবেশে দুর্নীতিমুক্ত সমাজের অঙ্গীকার শুনি, বক্তৃতায় সুশাসনের কথা শুনি, আইনের শাসনের কথা শুনি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুর্নীতি শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে ঢুকে পড়া এক ভয়ংকর ব্যাধি। এ ব্যাধিতে আক্রান্ত কথিত শিক্ষিত সাহেব-বাবুরাই।
অমানবিকতার অন্ধকারে তাদের মানবিকআত্মা মরে গেছে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, নিষ্ঠুরতা, অবিচার এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতার অভাবগ্রস্ত এ লোকেরা যখন বড় দায়িত্ব ও চেয়ার পায় মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যায় এবং হিংস্রতা বা স্বার্থপরতা প্রধান হয়ে ওঠে।
মূর্খ মানুষ সাধারণত দুর্নীতির জটিল হিসাব জানে না। দিনমজুর সারাদিন শ্রম দিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। কৃষক মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায়। তাদের জীবনে প্রতারণা বা দুর্নীতির সুযোগ যেমন সীমিত, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের ক্ষমতাও তাদের হাতে নেই। অথচ সমাজের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে বড় ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষিত, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী একটি শ্রেণি। এখানেই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে শিক্ষা মানুষের বিবেক জাগ্রত করার কথা, সেই শিক্ষাই কখনো কখনো দুর্নীতির কৌশল শেখানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। যে কলম দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেই কলমেই তৈরি হচ্ছে অনিয়মের নথি। যে পদ মানুষের সেবা করার জন্য, সেই পদই অনেকের কাছে হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার সিঁড়ি। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—আমাদের সমাজ অপরাধের বিচারও অনেক সময় মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান দেখে করতে চায়। পেটের দায়ে কোনো দরিদ্র মানুষ পাঁচ টাকার একটি পণ্য চুরি করলে তাকে ধরে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়, অপমান করা হয়। কিন্তু কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সে যদি দামি পোশাক পরে, গাড়িতে চড়ে, প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করে—তাহলে সমাজের একটি অংশ তাকে এখনও সম্মানের চোখে দেখে। গরিবের চুরি অপরাধ, আর ক্ষমতাবানের লুটপাটকে যদি আমরা কৌশল বলে পাশ কাটিয়ে যাই—তাহলে সেই সমাজে ন্যায়বিচার কোথায়? একজন মানুষের গায়ে টাই আছে বলেই তিনি সৎ—এমন কোনো নিয়ম পৃথিবীতে নেই। আবার একজন শ্রমিকের গায়ে পুরোনো পোশাক থাকলেই তিনি অসৎ—এমন কথাও সত্য নয়। মানুষের পরিচয় পোশাকে নয়, চরিত্রে। মানুষের মর্যাদা সম্পদে নয়, সততায়। কিন্তু আমাদের সামাজিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টো চিত্র দেখায়। যার টাকা আছে, তার কথার মূল্য বেশি।
যার ক্ষমতা আছে, তার পরিচিতির পরিধি বড়। যার গাড়ি আছে, তার জন্য দরজা খুলে যায়। আর যার হাতে শুধু শ্রমের শক্তি, তার কথা অনেক সময় শোনার মানুষও পাওয়া যায় না। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; দুর্নীতি ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাসকে ধ্বংস করে। একজন সাধারণ নাগরিক যখন দেখে যোগ্যতা নয়, ঘুষ ও পরিচয় কাজ পাওয়ার চাবিকাঠি; ন্যায় নয়, প্রভাবশালীর কথাই শেষ কথা—তখন তার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়।
তরুণ প্রজন্মের মনে জন্ম নেয় হতাশা। তারা ভাবতে শেখে, সততার কোনো মূল্য নেই। এই ধারণাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা বড় বড় প্রকল্প দিয়ে হয় না। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে তখনই, যখন মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ, সততা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে তাই শুধু দুর্নীতিবাজ ধরলেই হবে না; দুর্নীতিকে যারা প্রশ্রয় দেয়, তাদের বিরুদ্ধেও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঘুষ নেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের কাজ আদায়ের জন্য ঘুষ দেওয়াকেও স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। দুর্নীতির অর্থে গড়ে ওঠা বিলাসী জীবন দেখে মুগ্ধ হওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান। দরিদ্রের অপরাধ যেমন অপরাধ, ধনীর অপরাধও তেমনি অপরাধ। খালি পায়ের মানুষের বিচার যেমন হবে, টাই পরা মানুষের বিচারও একই আইনে হতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একজন দিনমজুর হয়তো রাষ্ট্রের কোটি টাকা চুরি করতে পারে না, কিন্তু তার একদিনের শ্রম দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। একজন কৃষক হয়তো বড় বড় প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করতে পারে না, কিন্তু তার ঘামেই দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান আসে। তাদের অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আজ প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার পোশাক, পদবি কিংবা সম্পদ দিয়ে নয়—তার সততা, মানবিকতা ও কর্ম দিয়ে। টাইয়ের আড়ালে থাকা দুর্নীতিকে সম্মান আর খালি পায়ের ক্ষুদ্র অপরাধকে নির্মম শাস্তি—এই দ্বৈতনীতি কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। আমরা যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, তাহলে প্রথমে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। দুর্নীতিবাজের অর্থ নয়, তার চরিত্র দেখতে হবে। ক্ষমতা নয়, সত্যকে সম্মান করতে হবে। আর আইনকে হতে হবে অন্ধ—যাতে সে মানুষের পোশাক দেখে নয়, অপরাধ দেখে বিচার করে। কারণ শেষ পর্যন্ত সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, নাকি শুধু দুর্বল মানুষের অপরাধের বিরুদ্ধে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের সমাজ কতটা সভ্য, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা মানবিক। ( মতামত লেখকের নিজস্ব) লেখক: মোঃ বদরুল ইসলাম.মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সলঙ্গা-তাড়াশ সড়কের বেহাল দশা: দুর্ভোগে যাত্রী ও চালক, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

টাই স্যূটের আড়ালে: অমানবিকতার অন্ধকার

আপডেট সময় ০৮:১৪:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পারস্যের কবি, শেখ সাদীর জীবনর গল্প আমরা সবাই জানি। একবার শেখ সাদী সাধারণ ও মলিন পোশাক পরে এক ধনী ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য যান। বাড়ির লোকজন তার সাধারণ বেশভূষা দেখে তাকে অবহেলা করে এবং সামান্য খাবার দেয়। এর কিছুদিন পর রাজদরবার থেকে ফেরার পথে বাদশাহর দেওয়া অত্যন্ত দামি ও জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে আবার ওই একই ব্যক্তির বাড়িতে উপস্থিত হন তিনি। এবার সেই ধনী ব্যক্তি ও তার লোকজন শেখ সাদীকে অত্যন্ত সমাদর করে এবং সুস্বাদু খাবারে আপ্যায়ন করে। তখন শেখ সাদী খাবার মুখে না তুলে পকেটে বা জামার ভাঁজে পুরতে থাকেন। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে এর কারণ জানতে চায়।
শেখ সাদী শান্তভাবে বলেন, “এই খাবার আমার জন্য নয়, আমার এই দামি পোশাকের জন্য। কারণ আমি যখন সাধারণ পোশাকে এসেছিলাম, তখন তোমরা আমাকে কোনো পাত্তা দেওয়নি। আর দামি পোশাক পরায় আজ তোমরা আমাকে সম্মান ও সুস্বাদু খাবার দিচ্ছ। তাই এই খাবার পোশাকেরই প্রাপ্য!” গল্পের শিক্ষামানুষের বাহ্যিক রূপ বা পোশাক দেখে তার গুণ বা মর্যাদা বিচার করা উচিত নয়। মানুষের আসল পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার জ্ঞানে ও চরিত্রে।
আমাদের এ কথিত সভ্য সমাজে স্যুট-টাই পরা আধুনিক বস্তুবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত এক শ্রেণির মানুষ, তাদের ভিতরের লোভ, লালসার প্রতিফলন ঘুষ-দুর্নীতির মতো অপরাধ পোশাকের আড়ালে ঢেকে রাখেন।
আবার তারাই প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। সভা-সমাবেশে দুর্নীতিমুক্ত সমাজের অঙ্গীকার শুনি, বক্তৃতায় সুশাসনের কথা শুনি, আইনের শাসনের কথা শুনি। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুর্নীতি শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে ঢুকে পড়া এক ভয়ংকর ব্যাধি। এ ব্যাধিতে আক্রান্ত কথিত শিক্ষিত সাহেব-বাবুরাই।
অমানবিকতার অন্ধকারে তাদের মানবিকআত্মা মরে গেছে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, নিষ্ঠুরতা, অবিচার এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতার অভাবগ্রস্ত এ লোকেরা যখন বড় দায়িত্ব ও চেয়ার পায় মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যায় এবং হিংস্রতা বা স্বার্থপরতা প্রধান হয়ে ওঠে।
মূর্খ মানুষ সাধারণত দুর্নীতির জটিল হিসাব জানে না। দিনমজুর সারাদিন শ্রম দিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। কৃষক মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায়। তাদের জীবনে প্রতারণা বা দুর্নীতির সুযোগ যেমন সীমিত, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের ক্ষমতাও তাদের হাতে নেই। অথচ সমাজের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে বড় ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষিত, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী একটি শ্রেণি। এখানেই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে শিক্ষা মানুষের বিবেক জাগ্রত করার কথা, সেই শিক্ষাই কখনো কখনো দুর্নীতির কৌশল শেখানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। যে কলম দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেই কলমেই তৈরি হচ্ছে অনিয়মের নথি। যে পদ মানুষের সেবা করার জন্য, সেই পদই অনেকের কাছে হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার সিঁড়ি। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—আমাদের সমাজ অপরাধের বিচারও অনেক সময় মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান দেখে করতে চায়। পেটের দায়ে কোনো দরিদ্র মানুষ পাঁচ টাকার একটি পণ্য চুরি করলে তাকে ধরে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়, অপমান করা হয়। কিন্তু কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সে যদি দামি পোশাক পরে, গাড়িতে চড়ে, প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করে—তাহলে সমাজের একটি অংশ তাকে এখনও সম্মানের চোখে দেখে। গরিবের চুরি অপরাধ, আর ক্ষমতাবানের লুটপাটকে যদি আমরা কৌশল বলে পাশ কাটিয়ে যাই—তাহলে সেই সমাজে ন্যায়বিচার কোথায়? একজন মানুষের গায়ে টাই আছে বলেই তিনি সৎ—এমন কোনো নিয়ম পৃথিবীতে নেই। আবার একজন শ্রমিকের গায়ে পুরোনো পোশাক থাকলেই তিনি অসৎ—এমন কথাও সত্য নয়। মানুষের পরিচয় পোশাকে নয়, চরিত্রে। মানুষের মর্যাদা সম্পদে নয়, সততায়। কিন্তু আমাদের সামাজিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টো চিত্র দেখায়। যার টাকা আছে, তার কথার মূল্য বেশি।
যার ক্ষমতা আছে, তার পরিচিতির পরিধি বড়। যার গাড়ি আছে, তার জন্য দরজা খুলে যায়। আর যার হাতে শুধু শ্রমের শক্তি, তার কথা অনেক সময় শোনার মানুষও পাওয়া যায় না। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; দুর্নীতি ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাসকে ধ্বংস করে। একজন সাধারণ নাগরিক যখন দেখে যোগ্যতা নয়, ঘুষ ও পরিচয় কাজ পাওয়ার চাবিকাঠি; ন্যায় নয়, প্রভাবশালীর কথাই শেষ কথা—তখন তার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়।
তরুণ প্রজন্মের মনে জন্ম নেয় হতাশা। তারা ভাবতে শেখে, সততার কোনো মূল্য নেই। এই ধারণাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা বড় বড় প্রকল্প দিয়ে হয় না। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে তখনই, যখন মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ, সততা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে তাই শুধু দুর্নীতিবাজ ধরলেই হবে না; দুর্নীতিকে যারা প্রশ্রয় দেয়, তাদের বিরুদ্ধেও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঘুষ নেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি নিজের কাজ আদায়ের জন্য ঘুষ দেওয়াকেও স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। দুর্নীতির অর্থে গড়ে ওঠা বিলাসী জীবন দেখে মুগ্ধ হওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান। দরিদ্রের অপরাধ যেমন অপরাধ, ধনীর অপরাধও তেমনি অপরাধ। খালি পায়ের মানুষের বিচার যেমন হবে, টাই পরা মানুষের বিচারও একই আইনে হতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একজন দিনমজুর হয়তো রাষ্ট্রের কোটি টাকা চুরি করতে পারে না, কিন্তু তার একদিনের শ্রম দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। একজন কৃষক হয়তো বড় বড় প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করতে পারে না, কিন্তু তার ঘামেই দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান আসে। তাদের অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আজ প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার পোশাক, পদবি কিংবা সম্পদ দিয়ে নয়—তার সততা, মানবিকতা ও কর্ম দিয়ে। টাইয়ের আড়ালে থাকা দুর্নীতিকে সম্মান আর খালি পায়ের ক্ষুদ্র অপরাধকে নির্মম শাস্তি—এই দ্বৈতনীতি কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। আমরা যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, তাহলে প্রথমে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। দুর্নীতিবাজের অর্থ নয়, তার চরিত্র দেখতে হবে। ক্ষমতা নয়, সত্যকে সম্মান করতে হবে। আর আইনকে হতে হবে অন্ধ—যাতে সে মানুষের পোশাক দেখে নয়, অপরাধ দেখে বিচার করে। কারণ শেষ পর্যন্ত সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, নাকি শুধু দুর্বল মানুষের অপরাধের বিরুদ্ধে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের সমাজ কতটা সভ্য, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা মানবিক। ( মতামত লেখকের নিজস্ব) লেখক: মোঃ বদরুল ইসলাম.মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।