এক দশক পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিমরাইলকান্দি থেকে বিজয়নগর উপজেলার নূরপুর পর্যন্ত প্রায় ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের নির্মাণকাজ। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া ‘নূরপুর জিসি-কালীবাড়ি আরএন্ডএইচ সড়ক’ প্রকল্পটি এখন এলাকাবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে কাদা ও পানি জমে ডোবাসদৃশ অবস্থা। দিনের বেলায় চলাচলে ভোগান্তি আর রাত নামলেই দেখা দিচ্ছে ডাকাতির আতঙ্ক। স্থানীয়ভাবে সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক নামে পরিচিত এ সড়কটি বিজয়নগর উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। এ সড়ক দিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই জেলা শহরে পৌঁছানো সম্ভব হলেও সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে অনেককে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রায় ৩৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ডলি কন্সট্রাকশন ও ইনফ্রাটেক যৌথভাবে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু করে। পরে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২২ সাল পর্যন্ত নেওয়া হয়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি ও নানা জটিলতায় ২০২৬ সালের মে মাসেও প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়নি। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বোয়ালিয়া খালের ওপর নির্মাণাধীন ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু। প্রায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া সেতুটির কাজ ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর আশপাশের কাঁচা রাস্তা এবং লক্ষ্মীপুর-নূরপুর অংশ সামান্য বৃষ্টিতেই কর্দমাক্ত হয়ে মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। খানাখন্দে ভরা সড়কে পানি জমে ডোবার সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীদের অনেক সময় গাড়ি থেকে নেমে কাদা মাড়িয়ে রাস্তা পার হতে হয়। চালকদেরও ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি ঠেলে পারাপার করতে দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীরা। কাদা-পানিতে বইখাতা ও পোশাক নষ্ট হয়ে প্রায়ই তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া জরুরি রোগী ও প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক ও সেতুর বেহাল অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্র। অসম্পূর্ণ সেতু ও নির্জন পরিবেশকে কেন্দ্র করে প্রায়ই রাতের বেলা ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। যানবাহন আটকে যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও মূল্যবান মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বোয়ালিয়া সেতু এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একটি আভিযানিক দলও ডাকাতির শিকার হয়। এ ঘটনায় দুই সদস্যকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি রাতে বিজয়নগরের ইব্রাহীমপুর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান শেষে ফেরার পথে বোয়াইল্লা ব্রিজ এলাকায় একদল সশস্ত্র ডাকাত ডিএনসির সদস্যদের গতিরোধ করে। এ সময় সিপাই মো. ইব্রাহিম খলিল ও হাফেজ মুহাম্মদ সারোয়ারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পরে তাদের হাত-পা ও চোখ বেঁধে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, স্মার্ট ওয়াচ ও মোটরসাইকেলসহ প্রায় ৮৬ হাজার টাকার মালামাল লুট করে নেয় ডাকাত দল। পরে স্থানীয় এক সিএনজি চালক আহতদের উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। এ ঘটনায় ১৫ জানুয়ারি বিজয়নগর থানায় মামলা নং-২৭ দায়ের করা হয়। স্থানীয়রা বলেন, দুই বছর ধরে সেতুর কাজ প্রায় বন্ধ ছিল। এখন নামমাত্র কাজ চলছে। ৯ কিলোমিটার রাস্তা করতে যদি ১০ বছর লাগে, তাহলে মানুষের দুর্ভোগের শেষ কোথায়? জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। তবে এখন দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে পুরো সড়কের কাজ শেষ হবে। এ বিষয়ে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী নির্ভয় প্রকাশনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, “আমি নতুন এসেছি। বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় এ কাজগুলো করা হচ্ছে। কাজ প্রায় শেষের পথে, মাত্র একটি ব্রিজের কাজ বাকি রয়েছে। মেইন রোডের শেষ অংশে ৭০০ মিটার জায়গায় যেখানে ১৮ ফুট প্রশস্ততা থাকার কথা, সেখানে রয়েছে মাত্র ১০ ফুট। বিষয়টি এমপি, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবগত করা হয়েছে। সমাধান না হলে ১০ ফুট ধরেই দ্রুত রাস্তার কাজ শেষ করা হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, এ বিষয়ে মাসিক সভায় আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ রাস্তায় ডাকাতির বিষয়েও আমরা অবগত আছি। পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ পথ দিয়ে চলাচলকারী ভুক্তভোগীদের দাবি, আর কোনো সময়ক্ষেপণ নয়দ্রুততম সময়ে এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতুর কাজ সম্পন্ন করে জনদুর্ভোগ ও ডাকাতির আতঙ্ক থেকে এলাকাবাসীকে মুক্তি দেওয়া হোক।
সংবাদ শিরোনাম
রাতে ডাকাত আতঙ্ক, দিনে কাদার দুর্ভোগ, ১০ বছরেও শেষ হয়নি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সিমনা সড়ক
-
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি - আপডেট সময় ০৩:২৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- 159
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















