ঢাকা ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সোমেশ^রী নদী পারাপারে ভরসা কাঠের সেতু নির্মাণ করে দিচ্ছেন ডেপুটি স্পিকার Logo রায়পুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দেয়াল ভাঙচুর, চার দোকানে তালা ও মালামাল লুটের অভিযোগ! Logo দুপচাঁচিয়া ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের উদ্বোধন Logo মৌলভীবাজারে রুমনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর নামে ২ কোটি ৬ লক্ষ টাকা আতœসাতের অভিযোগ Logo মৌচাক কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি: এর ৩২তম বার্ষিক সাধারণ সভা Logo জগন্নাথপুরে যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা Logo দিনাজপুরে ৪২ বিজিবির রাতভর অভিযান, ভারতীয় মাদক উদ্ধার Logo ঈশ্বরগঞ্জে কৃষি ব্যাংকে লুট চেষ্টার ঘটনায় নতুন মোড়, এবার নিরাপত্তাকর্মী গ্রেপ্তার Logo আমন্ত্রণপত্রে সকাল ১১টা-জুড়ীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি শুরু ১০টায় Logo কুলিয়ার মধ্যেপাড়ায় চেয়ারম্যান প্রার্থী ডা. মেহেদী হাসান মেহেরের উঠান বৈঠক
কুমিল্লার হৃদয়ে আজও জীবন্ত কবি নজরুল

জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে তিন দিনের অনুষ্ঠানমালা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় হলেও, তার জীবন, প্রেম, সংগ্রাম ও সৃষ্টির এক অনন্য অধ্যায় জড়িয়ে আছে কুমিল্লার সঙ্গে।
অল্প সময়ের জন্য কুমিল্লায় অবস্থান করলেও এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে তিনি স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। কবির পদচারণায় মুখরিত কুমিল্লার নানা স্থান আজও বহন করছে তার স্মৃতি, প্রেম ও বিদ্রোহের ইতিহাস।
১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুমিল্লার ‘নজরুল স্মৃতি’ সংরক্ষণের দাবি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ মে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কুমিল্লা শহর ও কবিতীর্থ দৌলতপুরে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী নানান অনুষ্ঠান।
একই সঙ্গে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দাবিও জোরালোভাবে তুলেছেন স্থানীয় গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা।
জন্মদিনকে ঘিরে কুমিল্লার গবেষক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নজরুলকে তারা শুধু জাতীয় কবি হিসেবেই দেখেন না, বরং কুমিল্লার মানুষ তাকে নিজেদের একজন হিসেবেই মনে করেন। তাদের বিশ্বাস, কুমিল্লার মাটি, মানুষ ও পরিবেশ নজরুলকে দিয়েছে সৃষ্টির নতুন দিগন্ত। তার বহু কালজয়ী কবিতা ও গান রচিত হয়েছে এই জনপদে বসেই।
স্থানীয়দের মতে, কবির প্রেম, বিপ্লব, সাহিত্যচর্চা ও সংগ্রামের বহু স্মৃতি ছড়িয়ে আছে কুমিল্লার পথে-প্রান্তরে। ফলে কুমিল্লার মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনাচরণেও নানা মাত্রায় উপস্থিত রয়েছেন নজরুল।
কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়ি, ধর্মসাগর পাড়, রাণীর দীঘি, মহেশাঙ্গন, দারোগাবাড়ি, টাউন হল ময়দান, সংগীতজ্ঞ শচীনদেব বর্মনের চর্থার রাজবাড়ি এবং নবাববাড়িসহ নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে কবির পদচিহ্ন। এসব স্থান আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বাসসকে বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে কুমিল্লা।
এখানকার অভিজ্ঞতা, প্রেম ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে একদিকে যেমন দ্রোহের কবিতে পরিণত করেছে, অন্যদিকে প্রেম ও মানবতার কবি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি জানান, ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় প্রায় ১১ মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেন নজরুল। এই সময়টিকেই কবির জীবনের মোড় পরিবর্তনের অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন গবেষকরা।
বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা যায়, ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতা আগমন উপলক্ষে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডাকা হরতালে অংশ নিতে নজরুল কুমিল্লার রাজগঞ্জে প্রতিবাদী গান গেয়ে মিছিলে যোগ দেন। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে তার সেই অংশগ্রহণের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গবেষকদের মতে, পরবর্তী সময়ে তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পেছনে এ অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল গভীর।
কবির ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও রচিত হয়েছে কুমিল্লায়। জেলার মুরাদনগরের দৌলতপুরে খাঁ বাড়ির নার্গিস আসার খানম এবং কুমিল্লা শহরের পশ্চিম কান্দিরপাড়ের আশালতা সেনগুপ্ত ওরফে প্রমীলা—এই দুই নারীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি।
তাদের প্রভাব কবির সাহিত্য ও সংগীতচর্চায় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
কুমিল্লায় অবস্থানকালে নজরুল অসংখ্য কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। এখানকার প্রকৃতি, মানুষ ও সম্পর্ক তার সৃষ্টিশীলতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল বলে জানান স্থানীয় সাহিত্য অনুরাগীরা।
কবির স্মৃতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দিতে কুমিল্লায় বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৯৬০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কবি নজরুল ছাত্রাবাস’।
১৯৬২ সালে কান্দিরপাড় থেকে ফরিদা বিদ্যায়তন পর্যন্ত সড়কের নামকরণ করা হয় ‘নজরুল এভিনিউ’।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নজরুল ললিতকলা পরিষদ’, যা পরবর্তীতে ‘নজরুল পরিষদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
১৯৮৩ সালে কবির অবস্থান করা বিভিন্নস্থানে স্থাপন করা হয় স্মৃতিফলক। পরে ১৯৯২ সালে এসব স্থানে স্থায়ী ফলক নির্মাণ করে সেখানে নজরুল-স্মৃতির বিবরণ তুলে ধরা হয়।
কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির সামনে নির্মিত হয়েছে ‘চেতনায় নজরুল’ স্মৃতিস্তম্ভ। এছাড়া মুরাদনগরের দৌলতপুরে সংরক্ষণ করা হয়েছে খাঁ-বাড়ির কিছু স্মৃতিচিহ্ন।
কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটও।
তবে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষকদের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কবির অনেক স্মৃতিচিহ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তাদের মতে, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
কবিতীর্থ দৌলতপুরের বাসিন্দা এবং কবিপতœী নার্গিসের ভাইয়ের ছেলে বাবলু আলী খান বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে মুরাদনগরের দৌলতপুরের সঙ্গে। এখানেই সৈয়দা খাতুনের প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেন কবি এবং নাম দেন নার্গিস আসার খানম।
তিনি বলেন, দৌলতপুরে বসেই কবি বহু গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে ‘নজরুল মঞ্চ’ ও একটি ম্যুরাল।
ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, কবির প্রেম, বিয়ে, রাজনীতি, কারাবরণ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বহু স্মৃতি ধারণ করে আছে কুমিল্লা শহর। প্রতিবছর জন্মবার্ষিকী এলেই নানা আয়োজন করা হলেও বছরের বাকি সময়ে এসব স্মৃতিচিহ্ন অনেকটাই অবহেলিত থাকে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় কবির স্মৃতিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
নজরুল গবেষক কাজী মাহতাব সুমন বাসসকে বলেন, কুমিল্লা শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নজরুলের স্মৃতিগুলো শুধু ইতিহাস নয়, এগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এসব স্থানের যথাযথ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লা ও দৌলতপুরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণমূলক আয়োজন।
তিনি জানান, দৌলতপুরে নজরুল-নার্গিসের স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশে ভবিষ্যতে আরও নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সোমেশ^রী নদী পারাপারে ভরসা কাঠের সেতু নির্মাণ করে দিচ্ছেন ডেপুটি স্পিকার

কুমিল্লার হৃদয়ে আজও জীবন্ত কবি নজরুল

জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে তিন দিনের অনুষ্ঠানমালা

আপডেট সময় ১১:০৬:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় হলেও, তার জীবন, প্রেম, সংগ্রাম ও সৃষ্টির এক অনন্য অধ্যায় জড়িয়ে আছে কুমিল্লার সঙ্গে।
অল্প সময়ের জন্য কুমিল্লায় অবস্থান করলেও এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে তিনি স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। কবির পদচারণায় মুখরিত কুমিল্লার নানা স্থান আজও বহন করছে তার স্মৃতি, প্রেম ও বিদ্রোহের ইতিহাস।
১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুমিল্লার ‘নজরুল স্মৃতি’ সংরক্ষণের দাবি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ মে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কুমিল্লা শহর ও কবিতীর্থ দৌলতপুরে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী নানান অনুষ্ঠান।
একই সঙ্গে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দাবিও জোরালোভাবে তুলেছেন স্থানীয় গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা।
জন্মদিনকে ঘিরে কুমিল্লার গবেষক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নজরুলকে তারা শুধু জাতীয় কবি হিসেবেই দেখেন না, বরং কুমিল্লার মানুষ তাকে নিজেদের একজন হিসেবেই মনে করেন। তাদের বিশ্বাস, কুমিল্লার মাটি, মানুষ ও পরিবেশ নজরুলকে দিয়েছে সৃষ্টির নতুন দিগন্ত। তার বহু কালজয়ী কবিতা ও গান রচিত হয়েছে এই জনপদে বসেই।
স্থানীয়দের মতে, কবির প্রেম, বিপ্লব, সাহিত্যচর্চা ও সংগ্রামের বহু স্মৃতি ছড়িয়ে আছে কুমিল্লার পথে-প্রান্তরে। ফলে কুমিল্লার মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনাচরণেও নানা মাত্রায় উপস্থিত রয়েছেন নজরুল।
কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়ি, ধর্মসাগর পাড়, রাণীর দীঘি, মহেশাঙ্গন, দারোগাবাড়ি, টাউন হল ময়দান, সংগীতজ্ঞ শচীনদেব বর্মনের চর্থার রাজবাড়ি এবং নবাববাড়িসহ নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে কবির পদচিহ্ন। এসব স্থান আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বাসসকে বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে কুমিল্লা।
এখানকার অভিজ্ঞতা, প্রেম ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে একদিকে যেমন দ্রোহের কবিতে পরিণত করেছে, অন্যদিকে প্রেম ও মানবতার কবি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি জানান, ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় প্রায় ১১ মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেন নজরুল। এই সময়টিকেই কবির জীবনের মোড় পরিবর্তনের অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন গবেষকরা।
বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা যায়, ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতা আগমন উপলক্ষে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডাকা হরতালে অংশ নিতে নজরুল কুমিল্লার রাজগঞ্জে প্রতিবাদী গান গেয়ে মিছিলে যোগ দেন। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে তার সেই অংশগ্রহণের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গবেষকদের মতে, পরবর্তী সময়ে তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পেছনে এ অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল গভীর।
কবির ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও রচিত হয়েছে কুমিল্লায়। জেলার মুরাদনগরের দৌলতপুরে খাঁ বাড়ির নার্গিস আসার খানম এবং কুমিল্লা শহরের পশ্চিম কান্দিরপাড়ের আশালতা সেনগুপ্ত ওরফে প্রমীলা—এই দুই নারীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি।
তাদের প্রভাব কবির সাহিত্য ও সংগীতচর্চায় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
কুমিল্লায় অবস্থানকালে নজরুল অসংখ্য কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। এখানকার প্রকৃতি, মানুষ ও সম্পর্ক তার সৃষ্টিশীলতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল বলে জানান স্থানীয় সাহিত্য অনুরাগীরা।
কবির স্মৃতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দিতে কুমিল্লায় বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৯৬০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কবি নজরুল ছাত্রাবাস’।
১৯৬২ সালে কান্দিরপাড় থেকে ফরিদা বিদ্যায়তন পর্যন্ত সড়কের নামকরণ করা হয় ‘নজরুল এভিনিউ’।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নজরুল ললিতকলা পরিষদ’, যা পরবর্তীতে ‘নজরুল পরিষদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
১৯৮৩ সালে কবির অবস্থান করা বিভিন্নস্থানে স্থাপন করা হয় স্মৃতিফলক। পরে ১৯৯২ সালে এসব স্থানে স্থায়ী ফলক নির্মাণ করে সেখানে নজরুল-স্মৃতির বিবরণ তুলে ধরা হয়।
কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির সামনে নির্মিত হয়েছে ‘চেতনায় নজরুল’ স্মৃতিস্তম্ভ। এছাড়া মুরাদনগরের দৌলতপুরে সংরক্ষণ করা হয়েছে খাঁ-বাড়ির কিছু স্মৃতিচিহ্ন।
কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটও।
তবে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষকদের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কবির অনেক স্মৃতিচিহ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তাদের মতে, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
কবিতীর্থ দৌলতপুরের বাসিন্দা এবং কবিপতœী নার্গিসের ভাইয়ের ছেলে বাবলু আলী খান বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে মুরাদনগরের দৌলতপুরের সঙ্গে। এখানেই সৈয়দা খাতুনের প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেন কবি এবং নাম দেন নার্গিস আসার খানম।
তিনি বলেন, দৌলতপুরে বসেই কবি বহু গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে ‘নজরুল মঞ্চ’ ও একটি ম্যুরাল।
ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, কবির প্রেম, বিয়ে, রাজনীতি, কারাবরণ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বহু স্মৃতি ধারণ করে আছে কুমিল্লা শহর। প্রতিবছর জন্মবার্ষিকী এলেই নানা আয়োজন করা হলেও বছরের বাকি সময়ে এসব স্মৃতিচিহ্ন অনেকটাই অবহেলিত থাকে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় কবির স্মৃতিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
নজরুল গবেষক কাজী মাহতাব সুমন বাসসকে বলেন, কুমিল্লা শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নজরুলের স্মৃতিগুলো শুধু ইতিহাস নয়, এগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এসব স্থানের যথাযথ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লা ও দৌলতপুরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণমূলক আয়োজন।
তিনি জানান, দৌলতপুরে নজরুল-নার্গিসের স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশে ভবিষ্যতে আরও নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।