ঢাকা ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া মননশীল রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা তৈরি হয় না:এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের Logo বোয়ালমারী প্রাণিসম্পদ দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ; প্রশ্নের মুখে উন্নয়ন বরাদ্দ ও মাঠসেবা Logo ঈশ্বরগঞ্জে গভীর রাতে কৃষি ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টা-যুবক গ্রেফতার Logo সাংবাদিক আলিফ হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে জামালপুরে মানববন্ধন Logo বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলা কল্যাণ সমিতি, সিলেটের নতুন কমিটি গঠন Logo সুনামগঞ্জের ৪৪৪টি পূজামন্ডপে সম্পন্ন হলো শারদীয় দুর্গাপূজা, প্রতিমা বির্সজনে সমাপ্ত Logo স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর প্রচেষ্টায় সেই জলকদর খালে এবার নির্মিত হবে পাকা সেতু Logo রাউজান কদলপুরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রাক্তন ছাত্র সমিতির বই বিতরণ Logo মতলবে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, ৬৪ বছরের বৃদ্ধ গ্রেপ্তার Logo জগন্নাথকাঠীতে রাতের অন্ধকারে সন্ত্রাসী কায়দায় প্রতিষ্ঠানে তালা!

কোরবানির মাংস সংরক্ষণের বিধান

কোরবানি শুধু পশু জবাই করার নাম নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা ত্যাগ, আনুগত্য ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষা লাভ করে।
প্রতি বছর ঈদুল আজহায় লাখো মুসলমান কোরবানি আদায় করেন এবং কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। তবে অনেকের ধারণা—কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
কোরবানিদাতা সাধারণত কোরবানির মাংসের একটি অংশ গরিব-মিসকিনদের দান করেন, কিছু অংশ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেন এবং অবশিষ্ট অংশ নিজের পরিবারের জন্য রেখে দেন।
বর্তমান সময়ে ফ্রিজ ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন মাংস সংরক্ষণ করা খুবই সহজ। ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানির মাংস যত দিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করে রাখা এবং পরে খাওয়া বৈধ। শরিয়তে এর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে একটি বিশেষ পরিস্থিতির কারণে তিন দিনের বেশি মাংস সংরক্ষণ করতে নিষেধ করা হয়েছিল।
মহানবী (সা.)-এর যুগে একবার অনেক দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষ মদিনায় আগমন করেন। তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মহানবী (সা.) মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন তারা কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি জমিয়ে না রাখে। বরং অতিরিক্ত মাংস গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়। এ নির্দেশ ছিল সাময়িক এবং বিশেষ পরিস্থিতিনির্ভর। পরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
পরবর্তীতে যখন সেই বিশেষ পরিস্থিতি আর বিদ্যমান থাকল না, তখন মহানবী (সা.) নিজেই পূর্বের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র আগন্তুকদের কথা বিবেচনা করে আমি তোমাদের সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সংরক্ষণও করতে পারো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৭১)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এর কোনো সময়সীমা শরিয়ত নির্ধারণ করে দেয়নি। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ইবনে আবদিল বার (রহ.) বলেন, আলেমরা এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে তিন দিনের পরেও কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা বৈধ এবং এ-সংক্রান্ত পূর্বের নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে।’(আত-তামহিদ : ৩/২১৬)
শরিয়তের দৃষ্টিতে কেউ চাইলে কোরবানির সমস্ত মাংস নিজের জন্য সংরক্ষণ করেও রাখতে পারেন। এতে কোরবানি আদায়ে কোনো সমস্যা হয় না। ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো—গরিব, অসহায়, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। তাই কোরবানির মাংসের একটি অংশ অন্যদের মধ্যে বিতরণ করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ। তাই কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা বা বিতরণ করা—উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের কল্যাণ।
অতএব, কোরবানির মাংস যত দিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করা এবং পরে খাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। তবে কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য হলো আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে এই নেয়ামত ভাগাভাগি করা। কোরবানির মাংস শুধু খাদ্য নয়; এটি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও তাকওয়ার এক উজ্জ্বল প্রতীক। আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরবানিকে কবুল করুন এবং এর প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র : (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৪, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩০০, বাহরুর রায়েক : ৮/২০৩, নাইলুল আওতার : ৬/২৬৭)

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া মননশীল রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা তৈরি হয় না:এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

কোরবানির মাংস সংরক্ষণের বিধান

আপডেট সময় ০৭:৩৪:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

কোরবানি শুধু পশু জবাই করার নাম নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা ত্যাগ, আনুগত্য ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষা লাভ করে।
প্রতি বছর ঈদুল আজহায় লাখো মুসলমান কোরবানি আদায় করেন এবং কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। তবে অনেকের ধারণা—কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
কোরবানিদাতা সাধারণত কোরবানির মাংসের একটি অংশ গরিব-মিসকিনদের দান করেন, কিছু অংশ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেন এবং অবশিষ্ট অংশ নিজের পরিবারের জন্য রেখে দেন।
বর্তমান সময়ে ফ্রিজ ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন মাংস সংরক্ষণ করা খুবই সহজ। ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানির মাংস যত দিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করে রাখা এবং পরে খাওয়া বৈধ। শরিয়তে এর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে একটি বিশেষ পরিস্থিতির কারণে তিন দিনের বেশি মাংস সংরক্ষণ করতে নিষেধ করা হয়েছিল।
মহানবী (সা.)-এর যুগে একবার অনেক দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষ মদিনায় আগমন করেন। তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মহানবী (সা.) মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন তারা কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি জমিয়ে না রাখে। বরং অতিরিক্ত মাংস গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়। এ নির্দেশ ছিল সাময়িক এবং বিশেষ পরিস্থিতিনির্ভর। পরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
পরবর্তীতে যখন সেই বিশেষ পরিস্থিতি আর বিদ্যমান থাকল না, তখন মহানবী (সা.) নিজেই পূর্বের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র আগন্তুকদের কথা বিবেচনা করে আমি তোমাদের সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সংরক্ষণও করতে পারো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৭১)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এর কোনো সময়সীমা শরিয়ত নির্ধারণ করে দেয়নি। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ইবনে আবদিল বার (রহ.) বলেন, আলেমরা এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে তিন দিনের পরেও কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা বৈধ এবং এ-সংক্রান্ত পূর্বের নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে।’(আত-তামহিদ : ৩/২১৬)
শরিয়তের দৃষ্টিতে কেউ চাইলে কোরবানির সমস্ত মাংস নিজের জন্য সংরক্ষণ করেও রাখতে পারেন। এতে কোরবানি আদায়ে কোনো সমস্যা হয় না। ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো—গরিব, অসহায়, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। তাই কোরবানির মাংসের একটি অংশ অন্যদের মধ্যে বিতরণ করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ। তাই কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা বা বিতরণ করা—উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের কল্যাণ।
অতএব, কোরবানির মাংস যত দিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করা এবং পরে খাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। তবে কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য হলো আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে এই নেয়ামত ভাগাভাগি করা। কোরবানির মাংস শুধু খাদ্য নয়; এটি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও তাকওয়ার এক উজ্জ্বল প্রতীক। আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরবানিকে কবুল করুন এবং এর প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র : (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৪, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩০০, বাহরুর রায়েক : ৮/২০৩, নাইলুল আওতার : ৬/২৬৭)