ঢাকা ০১:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা বাদীকে হত্যার হুমকি, বিচার দাবিতে মানববন্ধন Logo বোয়ালমারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৫ শতাধিক ছাত্রীর জন্য শিক্ষক মাত্র ৩ জন: ১২ পদের ৯টিই শূন্য Logo বদলগাছীতে জাতীয় কবি “ নজরুল বর্ষের “ সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ Logo কয়রায় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও র‌্যালি Logo ঘাটাইলে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি Logo আগৈলঝাড়ায় র‌্যালি ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উদযাপিত Logo মানবিক বিবেচনায় ছাড় না দিলে কঠোর কর্মসূচি আগামীতে Logo শতবর্ষী কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির একাডেমিক ভবনঘেঁষে ময়লার ভাগাড়, ছয় মাস ধরে বন্ধ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান Logo কালীগঞ্জে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে র‌্যালি-আলোচনা Logo প্রবীণরা বোঝা নয় তারা আমাদের শিকড়-আবুজার ইজাজুল হক

আত্মকেন্দ্রিকতা আত্মার নীরব ব্যাধি

আত্মকেন্দ্রিকতা এমন এক মানসিক অবস্থার নাম, যেখানে ব্যক্তি নিজের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং চাওয়া-পাওয়াকে অধিক গুরুত্ব দেয়। অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শুধু পৃথিবীকে দেখেন এবং অন্যদের মতামত বা আবেগের প্রতি সংবেদনশীল হতে প্রায়শই ব্যর্থ হন।
আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো কিংবা মানুষের উপকারে আসার চেয়ে নিজের জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করেন। অন্যের প্রয়োজন ও কষ্টের প্রতি উদাসীন হলেও কৌশলে নিজের স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারে থাকেন অত্যন্ত সচেতন, যা মূলত ইসলামবিরোধী নীতি।
ইসলামের দৃষ্টিতে নিজেকে ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়; এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে এসেছে, ‘এবং মানুষের মধ্যে কৃপণতা বিদ্যমান রয়েছে।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ১২৮)
আর প্রতিটি ব্যক্তি সাধারণত নিজ নিজ স্বার্থের খাতিরে কৃপণ ও লোভী হয়ে ওঠে। কিন্তু এই আত্মপ্রেম বা স্বার্থসচেতনতা এমন মাত্রায় হতে দেওয়া যাবে না, যা অন্যের অধিকার গ্রাস করে ফেলবে। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ যেমন স্বভাবজাত কারণে নিজের কল্যাণ চায়, তেমনি অন্য ভাইয়ের কল্যাণ চাইতে হবে। এটাই ঈমানের দাবি।
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, হাদিসে নিজের জন্য ভালোবাসাকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং সেই ভালোবাসার পরিধি অন্যের কাছেও সম্প্রসারিত করতে বলা হয়েছে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিকতা ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা পৃথিবীর সবকিছুর ওপর নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়।
কিন্তু মুমিন বান্দারা নিজের স্বার্থ ও ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর হুকুম ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নতকে প্রাধান্য দেয়। তাদের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রেম। যেই প্রেম ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত মুমিন হতে পারে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, মা-বাবা ও সমস্ত মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।’ (বুখারি, হাদিস ১৫)
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা মানুষকে মানবিক করে তোলে। ফলে তারা আত্মকেন্দ্রিকার ধারালো জিঞ্জির ছিঁড়ে একজন সোনার মানুষে পরিণত হয়। যাদের হৃদয়ে সংকীর্ণতার স্থান নেই। যারা আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে দ্বিধাবোধ করে না। মহানবী (সা.)-এর সোহবতের বরকতে তাঁর সাহাবিরাও এ রকম সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। যাদের সুনাম করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা ফুটে উঠেছে। যারা আত্মকেন্দ্রিকতার মূল উপাদান মনের কার্পণ্য থেকে পবিত্র হতে পারবে, তারাই সফল হবে। সুবহানাল্লাহ! আর যারা তা থেকে বঞ্চিত হবে, তাদের আত্মা-প্রেতাত্মা হয়ে ওঠে, তাদের কাছে কোনো পাপই পাপ মনে হয় না। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা সব করতে পারে। নাউজুবিল্লাহ!
তাই মুমিনের উচিত, আত্মকেন্দ্রিকতামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা। আল্লাহর ভালোবাসাকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা, নিয়মিত দান-সদকা করা, বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের কাছে প্রতিদিন এই প্রশ্ন করা ‘আজ আমি কার উপকার করেছি?’ কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের উপকার করে।
বস্তুত মানুষ তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন সে নিজের কল্যাণের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণও কামনা করে। আত্মপ্রেম মানবিক; কিন্তু আত্মকেন্দ্রিকতা ধ্বংসাত্মক। আর যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পারে, কোরআনের ভাষায় সেই ব্যক্তিই প্রকৃত সফলকাম।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা বাদীকে হত্যার হুমকি, বিচার দাবিতে মানববন্ধন

আত্মকেন্দ্রিকতা আত্মার নীরব ব্যাধি

আপডেট সময় ০৯:৩০:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

আত্মকেন্দ্রিকতা এমন এক মানসিক অবস্থার নাম, যেখানে ব্যক্তি নিজের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং চাওয়া-পাওয়াকে অধিক গুরুত্ব দেয়। অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শুধু পৃথিবীকে দেখেন এবং অন্যদের মতামত বা আবেগের প্রতি সংবেদনশীল হতে প্রায়শই ব্যর্থ হন।
আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো কিংবা মানুষের উপকারে আসার চেয়ে নিজের জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করেন। অন্যের প্রয়োজন ও কষ্টের প্রতি উদাসীন হলেও কৌশলে নিজের স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারে থাকেন অত্যন্ত সচেতন, যা মূলত ইসলামবিরোধী নীতি।
ইসলামের দৃষ্টিতে নিজেকে ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়; এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে এসেছে, ‘এবং মানুষের মধ্যে কৃপণতা বিদ্যমান রয়েছে।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ১২৮)
আর প্রতিটি ব্যক্তি সাধারণত নিজ নিজ স্বার্থের খাতিরে কৃপণ ও লোভী হয়ে ওঠে। কিন্তু এই আত্মপ্রেম বা স্বার্থসচেতনতা এমন মাত্রায় হতে দেওয়া যাবে না, যা অন্যের অধিকার গ্রাস করে ফেলবে। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ যেমন স্বভাবজাত কারণে নিজের কল্যাণ চায়, তেমনি অন্য ভাইয়ের কল্যাণ চাইতে হবে। এটাই ঈমানের দাবি।
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, হাদিসে নিজের জন্য ভালোবাসাকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং সেই ভালোবাসার পরিধি অন্যের কাছেও সম্প্রসারিত করতে বলা হয়েছে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিকতা ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা পৃথিবীর সবকিছুর ওপর নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়।
কিন্তু মুমিন বান্দারা নিজের স্বার্থ ও ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর হুকুম ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নতকে প্রাধান্য দেয়। তাদের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রেম। যেই প্রেম ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত মুমিন হতে পারে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, মা-বাবা ও সমস্ত মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।’ (বুখারি, হাদিস ১৫)
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা মানুষকে মানবিক করে তোলে। ফলে তারা আত্মকেন্দ্রিকার ধারালো জিঞ্জির ছিঁড়ে একজন সোনার মানুষে পরিণত হয়। যাদের হৃদয়ে সংকীর্ণতার স্থান নেই। যারা আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে দ্বিধাবোধ করে না। মহানবী (সা.)-এর সোহবতের বরকতে তাঁর সাহাবিরাও এ রকম সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। যাদের সুনাম করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা ফুটে উঠেছে। যারা আত্মকেন্দ্রিকতার মূল উপাদান মনের কার্পণ্য থেকে পবিত্র হতে পারবে, তারাই সফল হবে। সুবহানাল্লাহ! আর যারা তা থেকে বঞ্চিত হবে, তাদের আত্মা-প্রেতাত্মা হয়ে ওঠে, তাদের কাছে কোনো পাপই পাপ মনে হয় না। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা সব করতে পারে। নাউজুবিল্লাহ!
তাই মুমিনের উচিত, আত্মকেন্দ্রিকতামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা। আল্লাহর ভালোবাসাকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা, নিয়মিত দান-সদকা করা, বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের কাছে প্রতিদিন এই প্রশ্ন করা ‘আজ আমি কার উপকার করেছি?’ কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের উপকার করে।
বস্তুত মানুষ তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন সে নিজের কল্যাণের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণও কামনা করে। আত্মপ্রেম মানবিক; কিন্তু আত্মকেন্দ্রিকতা ধ্বংসাত্মক। আর যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পারে, কোরআনের ভাষায় সেই ব্যক্তিই প্রকৃত সফলকাম।