বিশ্ব আজ এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: সবকিছুর কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি। শিল্পায়ন ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে জ্বালানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ক্ষতির কারণে এই চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব? এর উত্তর নিহিত রয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তির মধ্যে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তেল, গ্যাস ও কয়লা: এই তিনটি উৎস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে চালিত করেছে। কিন্তু এগুলোর মজুদ সীমিত এবং উত্তোলন ও ব্যবহার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দ্বিতীয়ত, ভূরাজনৈতিক সংঘাত জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। কোনো একটি অঞ্চলে যুদ্ধ বা উত্তেজনা দেখা দিলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে। তৃতীয়ত, দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে জ্বালানির চাহিদা এমনভাবে বেড়েছে, যা প্রচলিত উৎস দিয়ে পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকটের প্রভাব আরও স্পষ্ট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গ্যাসের মজুদ দ্রুত কমে আসছে। ফলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, এবং বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ: সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানির ঘাটতি শিল্প-উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য শক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, পানিববিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস: এসব উৎস পরিবেশবান্ধব এবং প্রায় অসীম। বিশেষ করে সৌরশক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অনন্য অবস্থানে রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি বছরে প্রচুর সূর্যালোক পায়, যা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
গত এক দশকে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সৌর হোম সিস্টেম ছড়িয়ে পড়েছে, যা বিদ্যুৎবিহীন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করেছে। এছাড়া কিছু বড় সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির অবদান এখনো মোট জ্বালানি মিশ্রণে খুবই কম। এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আরও পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে গেলে প্রথমেই প্রয়োজন নীতিগত অঙ্গীকার। সরকারের একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতি থাকতে হবে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য কর সুবিধা, সহজ ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে এই খাতে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই খাতে সম্পৃক্ত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের পাশাপাশি সেটি সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা প্রয়োজন। স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এছাড়া ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তির উন্নয়ন নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
চতুর্থত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। সাধারণ মানুষকে নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। বাড়িতে সৌর প্যানেল স্থাপন, শক্তিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার: এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ালে সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদা কমানো সম্ভব।
নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার শুধু জ্বালানি সংকট সমাধানেই সহায়ক নয়, এটি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পায়, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করে।
বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, তাই পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকাটা কেবল অর্থনৈতিক নয়, অস্তিত্বের প্রশ্নও।
তবে এই পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি। এছাড়া প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও দক্ষতার অভাবও একটি বড় বাধা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগ লাভজনক এবং টেকসই। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে সফলভাবে এগিয়ে গেছে। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশও একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে। আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজন। এই দুইয়ের সমন্বয় করতে হলে প্রচলিত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন পথ খুঁজতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
সবশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হলেও এটি একই সঙ্গে একটি সুযোগও। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশ একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারে। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি। এখন প্রয়োজন কেবল দৃঢ় অঙ্গীকার ও সমন্বিত উদ্যোগ। তাহলেই সম্ভব একটি আলোকিত, টেকসই ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার, হ্যালিবার্টন ইনক। (যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি)
kazialborhan.cuet@gmail.com
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তিই টেকসই সমাধান
-
কাজী মো. আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী - আপডেট সময় ০৩:৩২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- 501
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























