ঢাকা ১১:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo আজ বুধবার বিজয়া দশমী Logo পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে-এমপি হাফিজ ইব্রাহিম Logo এম ক্যাশ লিঃ-এর বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত Logo বোরহানউদ্দিনে ২০টি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, ৯০০ পরিবারের হাতে উপহার ও নগদ অর্থ দিলেন এমপি হাফিজ ইব্রাহিম Logo বিকেবি অফিসার কল্যাণ সমিতির বরিশাল বিভাগীয় সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত Logo নাজিরপুরে পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলার ডুবির ঘটনায় ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সুমন মঞ্জুর Logo বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে আওয়ামী লীগ-স্পিকার হাফিজ Logo টঙ্গীতে সেতু বন্ধন বরিশাল বিভাগীয় জনকল্যাণ সমিতির কার্যকরী কমিটির প্রথম সভা Logo ঈশ্বরগঞ্জে লাঠি-বৈঠা হাতে নিয়ে নিষিদ্ধ আ.লীগের বিক্ষোভ মিছিল Logo গঙ্গাচড়ায় ঝুকিপুর্ণ নোহালী ইউপি ভবনে চলছে কার্যক্রম

কৃষকের কান্না, দেশের কান্না

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। যুগ যুগ ধরে এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আজও দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের ওপর। অথচ সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলোÑযে মানুষটি আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, সেই কৃষকই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও অসহায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়,মাধ্যমে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয়, আজ একজন সাধারণ ধানের ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, বরং হাজারো কৃষকের কষ্টের সাক্ষী হয়ে আপনাদের কাছে এই আকুল আবেদন জানাচ্ছি। আমি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার এলাকার একজন ধানের ব্যবসায়ী। আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ব্যবসা করি না; প্রতিদিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলি, তাদের ঘামের মূল্যহীনতা দেখি, তাদের চোখের জল দেখি। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আজ এই কথাগুলো বলছি। একজন দিনমজুর বা কামলার দৈনিক মজুরি প্রায় ৭০০ টাকা। তার সঙ্গে দুই বেলার খাবারের খরচও যোগ করতে হয়। অথচ একজন কৃষক যখন এক মণ ধান বিক্রি করতে বাজারে যান, তখন অনেক সময় মাত্র ৮০০ টাকার মতো দাম পান। এই সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি কীভাবে শ্রমিকের মজুরি দেবেন? কীভাবে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ মেটাবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ দেবেন? বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কিনবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজ কৃষকের কাছে নেই। ধান উৎপাদনের জন্য কৃষককে বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, খরাÑসব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি ফসল ফলান। কিন্তু যখন সেই ফসল বিক্রির সময় আসে, তখন বাজারমূল্য এতটাই কম থাকে যে উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। ফলাফলÑঋণের বোঝা, হতাশা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন। একজন কৃষক যদি তার ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে তিনি আর কতদিন কৃষিকাজে আগ্রহী থাকবেন? যদি কৃষক জমি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়াবে? কৃষকের দুর্দশা শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আজ প্রয়োজন কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সরকারিভাবে আরও বেশি পরিমাণে ধান সংগ্রহ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। কৃষক যদি তার ঘামের ন্যায্য মূল্য পান, তাহলে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো দেশই উপকৃত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বহুবার কৃষকের উন্নয়নের কথা বলেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো অনেক কৃষকের জন্য অত্যন্ত কঠিন। তাই বিনীতভাবে অনুরোধ, মাঠের মানুষের কান্না শুনুন। কৃষকের চোখের জল যেন আর অবহেলার ইতিহাস না হয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার কৃষক। কারণ কৃষক বেঁচে থাকলে দেশ বাঁচবে, খাদ্য বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক যদি ভেঙে পড়েন, তাহলে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন এবং গর্ব করে বলতে পারবেনÑ“আমি কৃষক, আমি দেশের প্রাণ।” কৃষকের হাসিই হোক বাংলাদেশের সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রতীক। কারণ যে দেশের কৃষক সুখে থাকে, সেই দেশ কখনো ক্ষুধার কাছে পরাজিত হয় না।
মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

আজ বুধবার বিজয়া দশমী

কৃষকের কান্না, দেশের কান্না

আপডেট সময় ০২:৪১:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। যুগ যুগ ধরে এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আজও দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের ওপর। অথচ সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলোÑযে মানুষটি আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, সেই কৃষকই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও অসহায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়,মাধ্যমে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয়, আজ একজন সাধারণ ধানের ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, বরং হাজারো কৃষকের কষ্টের সাক্ষী হয়ে আপনাদের কাছে এই আকুল আবেদন জানাচ্ছি। আমি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার এলাকার একজন ধানের ব্যবসায়ী। আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ব্যবসা করি না; প্রতিদিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলি, তাদের ঘামের মূল্যহীনতা দেখি, তাদের চোখের জল দেখি। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আজ এই কথাগুলো বলছি। একজন দিনমজুর বা কামলার দৈনিক মজুরি প্রায় ৭০০ টাকা। তার সঙ্গে দুই বেলার খাবারের খরচও যোগ করতে হয়। অথচ একজন কৃষক যখন এক মণ ধান বিক্রি করতে বাজারে যান, তখন অনেক সময় মাত্র ৮০০ টাকার মতো দাম পান। এই সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি কীভাবে শ্রমিকের মজুরি দেবেন? কীভাবে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ মেটাবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ দেবেন? বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কিনবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজ কৃষকের কাছে নেই। ধান উৎপাদনের জন্য কৃষককে বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, খরাÑসব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি ফসল ফলান। কিন্তু যখন সেই ফসল বিক্রির সময় আসে, তখন বাজারমূল্য এতটাই কম থাকে যে উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। ফলাফলÑঋণের বোঝা, হতাশা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন। একজন কৃষক যদি তার ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে তিনি আর কতদিন কৃষিকাজে আগ্রহী থাকবেন? যদি কৃষক জমি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়াবে? কৃষকের দুর্দশা শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আজ প্রয়োজন কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সরকারিভাবে আরও বেশি পরিমাণে ধান সংগ্রহ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। কৃষক যদি তার ঘামের ন্যায্য মূল্য পান, তাহলে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো দেশই উপকৃত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বহুবার কৃষকের উন্নয়নের কথা বলেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো অনেক কৃষকের জন্য অত্যন্ত কঠিন। তাই বিনীতভাবে অনুরোধ, মাঠের মানুষের কান্না শুনুন। কৃষকের চোখের জল যেন আর অবহেলার ইতিহাস না হয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার কৃষক। কারণ কৃষক বেঁচে থাকলে দেশ বাঁচবে, খাদ্য বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক যদি ভেঙে পড়েন, তাহলে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন এবং গর্ব করে বলতে পারবেনÑ“আমি কৃষক, আমি দেশের প্রাণ।” কৃষকের হাসিই হোক বাংলাদেশের সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রতীক। কারণ যে দেশের কৃষক সুখে থাকে, সেই দেশ কখনো ক্ষুধার কাছে পরাজিত হয় না।
মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।