মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো নারী শিক্ষক না থাকায় প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী চরম সংকটে পড়েছে। ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত উপজেলার একমাত্র সরকারি বালিকা বিদ্যালয়টিতে নারী শিক্ষক শূন্য থাকায় শিক্ষার্থীদের মানসিক, শারীরিক ও শিক্ষাগত নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী অধ্যয়ন করলেও সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে পাঁচটি। বর্তমানে বিদ্যালয়টি স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমেও এতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, নারী শিক্ষক না থাকায় কিশোরী বয়সী শিক্ষার্থীরা বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য সমস্যা, ব্যক্তিগত বিষয় কিংবা মানসিক সংকট নিয়ে পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ বোধ করছে। ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিনা জানায়, মাসিকজনিত সমস্যা, শারীরিক অস্বস্তি কিংবা জরুরি ব্যক্তিগত বিষয় পুরুষ শিক্ষকদের কাছে বলা যায় না। নারী শিক্ষক থাকলে তারা সহজে সহায়তা পেতো। অষ্টম শ্রেণির জয়া রবি জানায়, জাতীয় দিবস, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে পোশাক ও প্রস্তুতি নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। দশম শ্রেণির লুবাবা বলেন, উপজেলা, জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের খেলাধুলা ও অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেলে নারী শিক্ষক না থাকায় সীমাহীন ভোগান্তি তৈরি হয়। অভিভাবক মিলন মিয়া, জামিলা খাতুন, রিপন দাস ও আবুল হোসেন জানান, স্কুলে হঠাৎ শারীরিক সমস্যা হলে মেয়েরা লজ্জায় কিছু বলতে পারে না। অন্তত একজন বা দুজন নারী শিক্ষক থাকলে তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব হতো। অভিভাকরা আরো বলেন, শহরের প্রাণকেন্দ্র মৌলভীবাজার রোডে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরু থেকেই নারী শিক্ষকের অভাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নারী শিক্ষকের জন্য অনেকবার কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করলেও কোন সুরাহা হয়নি। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিকে তাকালে দেখবেন উল্টো চিত্র। ছেলেদের চেয়ে মেয়ে শিক্ষকই অধিক। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি শ্রীমঙ্গলের সাবেক সভাপতি শিক্ষক দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উপজেলার একমাত্র সরকারি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষক নেই। সব জায়গাতেই নারীদের একটি নিদিষ্ট কোটা থাকলেও মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজনও নেই নারী শিক্ষক। মেয়েদের মানসিক বিকাশ ও সমস্যা বোঝার জন্য নারী শিক্ষকের বিকল্প নেই। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী বলেন, ২০২৩ সালে নারী শিক্ষক মৃত্যুবরণ করার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে আর কোনো নারী শিক্ষক নেই। বর্তমানে ১৯ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ১৪ জন কর্মরত আছেন। নারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সিলেট আঞ্চলিক পরিচালক এবং মহাপরিচালক বরাবর একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১০ মার্চ নারী শিক্ষক চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান জানান, বিষয়টি জেনেছেন এবং জেলা পর্যায়ের সভায় আলোচনা করে নারী শিক্ষক পদায়নের চেষ্টা করবেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সিলেট অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. দিদার চৌধুরী বলেন, বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, সামনে নতুন নিয়োগ হলে এ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক পদায়নের চেষ্টা করা হবে। উপজলার সচেতন মহলের দাবি মতে, নারী শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত নারী শিক্ষক পদায়ন এখন সময়ের দাবি।
সংবাদ শিরোনাম
শ্রীমঙ্গলে শতবর্ষী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে একজনও নারী শিক্ষক নেই
-
এহসান বিন মুজাহির (শ্রীমঙ্গল) মৌলভবাজার - আপডেট সময় ০৯:০৯:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
- 221
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















