দক্ষিণ কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথদীঘির মাছ চাষের ইজারাদারদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। ফলে সুবিধা নিচ্ছে কতিপয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখায় লাভ হচ্ছে না চিওড়া মৎসচাষী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্যদের। একা লাভবান হওয়ার লোভে সভাপতি ফখরুল ইসলাম নানামুখী মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বড় বড় মাছ এবং মোটা অঙ্কের টাকা উপহার দিয়ে সমিতির অন্য সদস্যদের হয়রানী করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর ফখরুল ইসলাম ও সফিউল ইসলামসহ মোট ২০ জন সদস্য নিয়ে সকল সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে রেজুলেশন এবং যাবতীয় নিয়ম মেনে চিওড়া মৎসচাষী সমবায় সমিতি গঠন করা হয়। এরপর চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সমবায় অফিসার বরাবর রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করে। আবেদনের প্রেক্ষিতে সমিতি নিবন্ধনভুক্ত হয়, যার নং-২০২৪.১.০২.১৯১৩.০৪১২। সমিতির নিবন্ধন পাওয়ার পূর্বে ধোড়করা বাজারে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামে যৌথ এ্যাকাউন্ট খোলা হয়। তখন সিদ্ধান্ত হয়, সমিতির সকল অর্থনৈতিক লেনদেন যৌথ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে হবে। পরবর্তীতে জগন্নাথদীঘি জলমহাল সমিতির নামে ইজারা নেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেয় সদস্যরা। সভাপতি হিসেবে ফখরুল ইসলামকে জলমহাল ইজারা নেওয়ার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহন করাসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়। এতে সকল সদস্য তাকে সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে হিসেবে ফখরুল ইসলাম জগন্নাথদীঘি জলমহাল ইজারায় অংশগ্রহন করে এবং ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কুমিল্লার আদেশে গত বছরের ১৩ এপ্রিল জগন্নাথদীঘি ৬ বছরের জন্য চিওড়া মৎসচাষী সমবায় সমিতি লিঃ এর নামে ইজারা পায়। এরপর ইজারা মূল্য, ভ্যাট ও আয়করের অর্থ সকল সদস্যের মৌখিক সম্মতিক্রমে ফখরুল ইসলাম চালানের মাধ্যমে সরকারী কোষাগারে জমা দিয়ে চুক্তিপত্র সম্পাদন করে। জগন্নাথদীঘির নির্ধারিত সীমানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দখল বুজিয়ে দেয়। জগন্নাথদীঘি আয়তনে বিশাল ও লাভজনক হওয়ায় ফখরুল ইসলাম লোভ ও হিংসায় তার পরিবারের সদস্য আপন ছোট ভাই মহিবুল্লাহ সালেম, ছোট বোন সালমা আক্তার, চাচাতো ভাই হেদায়েতুল ইসলাম, হোসাইন আহম্মেদ জামিল, মোশারফ হোসেন, রেহানুল করিম খোন্দকার, তাজুল ইসলাম ও আয়েত আলীকে সমিতির গঠনতন্ত্র বর্হিভূত সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। জালিয়াতির মাধ্যমে সমিতির বৈধ ও নিবন্ধনকালীন সাধারণ সম্পাদক সফিউল ইসলাম, সদস্য এয়াকুব হোসেন, শাহাদাৎ মাহমুদ, এনামুল হক, ইউসুফ সাদ্দাম আল বাবর, সাইয়্যেদ রেজাউল করিম, জুবায়ের হোসেন ও তৌহিদুল আলমকে বাদ দেয়া হয়। এরই মধ্যে সমিতির সদস্য ইকবাল হোসেন মাসুম ইন্তেকাল করেন। জগন্নাথদীঘি ইজারা নেয়ার পর অপর সদস্যরা ফখরুল ইসলামকে সমিতির কার্যক্রম ও জগনাথদীঘি পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য একাধিকবার অনুরোধ করে। কিন্তু ফখরুল ইসলাম অনুরোধের বিষয়টি কর্ণপাত না করে সময় ক্ষেপনের পাশাপাশি টালবাহানা করতে থাকে। ইজারা নেওয়ার সময় সরকারী কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থ ফখরুল ইসলামকে অপর সদস্যরা ফেরৎ দিতে চাইলে সে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ায় টাকা দিতে পারেনি। ফখরুল ইসলাম বিভিন্নভাবে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিফলেট পোস্ট করে গত বছরের ১০-১১ অক্টোবর দুইদিন ব্যাপী জগন্নাথদীঘিতে বড়শী দ্বারা মাছ ধরার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রতি টিকেট আটাইশ হাজার করে ৯৪টি টিকেট ছাব্বিশ লক্ষ বত্রিশ হাজার টাকায় বিক্রি করে। একক সিদ্ধান্তে ফখরুল ইসলাম অন্যায়ভাবে বড়শী প্রতিযোগিতার আয়োজন করায় সফিউল ইসলাম বাদি হয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, এসিল্যান্ড ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর ৭ অক্টোবর লিখিত আবেদন করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকরী প্রদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রতিযোগিতার টিকেট কিনে প্রতারিত হওয়া ক্রেতাগণ, সমিতির বাদ দেয়া সদস্যগণ ও স্থানীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে দীঘিতে থাকা মাছের মাচা ভাংচুর এবং মহাসড়ক অবরোধ করে ফখরুল ইসলামকে খুঁজতে থাকলে সে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর ফখরুল ইসলাম অপর সদস্যদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে হুমকি ধমকি প্রদান করে। ফখরুল ইসলামের অনিয়মের বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিকট বিচার প্রার্থী হলে সে থানায় অভিযোগ দায়ের করে। তৎকালীন ওসি হিলাল উদ্দিন আহমেদের উপস্থিতিতে শালিশ বৈঠকে ফখরুল ইসলাম নিজের ভুল স্বীকার করে। সেখানে ফখরুল ইসলাম এক সপ্তাহের মধ্যে বাদ দেয়া সদস্যদের অন্তর্ভুক্তসহ ঠিকভাবে দীঘি পরিচালনা করবে বলে মৌখিকভাবে অঙ্গীকার করে। বৈঠকে বিরোধ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফখরুল ইসলাম এবং অন্য সদস্যরা দীঘিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সকলে মেনে নেয়। সেই সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে সমিতির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বাদি হয়ে সাধারণ সম্পাদক সফিউল ইসলাম ও সদস্য তৌহিদুল আলমসহ অজ্ঞাতনামা আরো ১০-১২ জনকে আসামী করে চলতি বছরের গত ১৬ মার্চ কুমিল্লার আদালতে চাঁদাবাজি মামলা করে। এরপর পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে সদস্যদের কাউকে না জানিয়ে গত ২১ ও ২২ এপ্রিল রাতে জাল দিয়ে জগন্নাথদীঘি থেকে প্রায় ১০-১২ লক্ষ টাকার মাছ ধরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ২৩ এপ্রিল ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করে সফিউল ইসলাম। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সবাইকে মাছ ধরতে নিষেধ করে। দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কুমিল্লা জেলা সমবায় পরিদর্শক এবং চৌদ্দগ্রাম ডেস্ক অফিসার এবিএম আবুল কালাম ও যুগ্ম নিবন্ধক আনোয়ার হোসেন সরেজমিন গত ৭ মে পরিদর্শন করে উভয়পক্ষের কথা শুনেন। জগন্নাথদীঘির পাহারাদার বেলাল হোসেন বলেন, ‘চাঁদা দাবির কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে গত বছর দীঘি পরিচালনা অফিসে ভাংচুর হয়েছে’। অভিযোগের বিষয়ে ফখরুল ইসলাম রোববার বলেন, বিষয়টি এখনো সমবাধান হয়নি। জেলা সমবায় অফিস তদন্ত করছে। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন রোববার বলেন, বিষয়টি জেলা অফিস থেকে তদন্ত করছে। তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে উভয়পক্ষের কথা শুনেছে। সে অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবে। কুমিল্লা জেলা সমবায় পরিদর্শক এবং চৌদ্দগ্রাম ডেস্ক অফিসার এবিএম আবুল কালাম বলেন, ‘তদন্ত করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই জেলা সমবায় অফিসারের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবো’। গত বছর দেয়া প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি দেখা করে বক্তব্য নেয়ার কথা বলেন। তদন্তকারী অপর কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত করেছি। তাদের উভয়কে লিখিত বক্তব্য দেয়ার জন্য বলা হয়েছে’। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা জেলা সমবায় কর্মকর্তা সালমান ইকবালের মুঠোফোনে বুধবার, বৃহস্পতিবার ও রোববার একাধিকবার কল ও হোয়াটস্ অ্যাপে ম্যাসেজ দিলেও তিনি কল রিসিভ ও ম্যাসেজের কোন জবাব দেননি।
সংবাদ শিরোনাম
চৌদ্দগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথদীঘির ইজাদারদের দ্বন্দ্বে ব্যাহত মাছ চাষ
-
এমদাদ উল্যাহ (চৌদ্দগ্রাম) কুমিল্লা - আপডেট সময় ০৩:২৮:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- 161
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ



















