ঢাকা ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে দেশবাসীর প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের আহবান Logo দেশের পুনর্গঠনে তারেক রহমানের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে যুবদল: রুহুল কবির রিজভী Logo বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনকে ডা. জুবাইদার আহ্বান Logo ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১১ মৃত্যু, ১০ মাসে প্রাণ গেল ৪০০ জনের Logo জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ Logo দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা ও রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo পাকিস্তান এবার অলআউট ১১০ রানে Logo বাজারে আসতে না আসতেই আইফোন ডুওর পর্দায় ফাটল Logo খিটখিটে মেজাজের সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করতে করণীয় Logo ‘সিআইডি’র স্রষ্টা বিপি সিং মারা গেছেনব্রিজেন্দ্র পাল সিং
এনডিটিভির বিশ্লেষণ

রাহুল গান্ধীর ‘আউটসাইডার নীতি’, ক্ষোভ বাড়ছে কংগ্রেসে

এখানে ‘আউটসাইডার’ বা ‘বাইরের মানুষ’ বলতে সবসময় এমন কাউকে বোঝায় না যিনি গতকালই দলে যোগ দিয়েছেন। কখনো কখনো এর অর্থ হলো— যিনি ঐতিহ্যগত রাজ্য-স্তরের সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থেকে এসেছেন। আবার কখনো এর অর্থ কোনো প্রযুক্তিবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, সাবেক আমলা, পেশাজীবী, এনজিও-ভাবাপন্ন রাজনৈতিক কর্মী বা ব্যক্তিগত সহকারী— যারা জেলা কমিটি, যুব কংগ্রেস, প্রদেশ কংগ্রেস কিংবা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির চেনা পথ মাড়িয়ে, উপদলীয় আনুগত্য বা নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজনীতিতে আসেননি।
সহজ কথায়, এটি এমন একদল মানুষকে বোঝায় যাদের প্রতি রাহুলের অন্ধ বিশ্বাস আছে, কিন্তু মূল দল বা সাধারণ কর্মীদের মনে তাদের প্রতি কোনো সমীহ নেই।
এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেন আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতম।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা ও দলিত অ্যাক্টিভিস্ট রাজেন্দ্র পাল গৌতমকে নির্বাচনি রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ‘এআইসিসি ইনচার্জ’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অবিনাশ পান্ডের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
গৌতম একই সঙ্গে কংগ্রেসের তফসিলি জাতি বিভাগেরও প্রধান এবং রাহুল গান্ধীর সামাজিক ন্যায়বিচার ও দলিত ভাবমূর্তি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের বহু হেভিওয়েট নেতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
কংগ্রেসের জন্য উত্তরপ্রদেশ কোনো সাধারণ রাজ্য নয়। এটি সেই মাটি যেখানে একটি জাতীয় শক্তি হিসেবে কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল, যেখানে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের রাজনীতি একসময় গণ-বৈধতা পেয়েছিল এবং এখানেই দলটির পতন সবচেয়ে বেশি অপমানজনক হয়েছে।
২০১৯ সালে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তাকে পূর্ব উত্তরপ্রদেশের এবং জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর আজ, দলটির উত্তরপ্রদেশের প্রধান চালিকাশক্তি হলেন রাজেন্দ্র পাল গৌতম— যিনি একজন নবাগত এবং এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক বা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কোনো হেভিওয়েট নেতাও নন।
এটি কেবল একটি সাধারণ নিয়োগ নয়, এটি আসলে একটি পরিষ্কার বার্তা। রাহুল স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কংগ্রেসের পুরনো কাঠামোর ভবিষ্যৎ কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার বা উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি আরও বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে— মতাদর্শিক অবস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার, দলিতদের কাছে পৌঁছানো এবং বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তিনি কোনো পরিশ্রান্ত ‘ইনসাইডার’ বা ঘরের মানুষের চেয়ে একজন নব্য দীক্ষিত ‘আউটসাইডার’কে বেশি বিশ্বাস করেন।
এখন প্রশ্ন হলো— এটি রাহুলের রাজনৈতিক সাহস, নাকি সিদ্ধান্তহীনতার বিভ্রান্তি, নাকি নতুন এক ধরনের কোটারি বা বলয় কেন্দ্রিক রাজনীতি?
রাহুল গান্ধীর এই আউটসাইডার প্রীতির পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে।
যখন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তখন তার চারপাশে ছিল পুরনো কংগ্রেসের এক বিশাল বহর— জেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা, উপদলীয় কোন্দলের পরিচালক, গান্ধী পরিবারের পুরোনো অনুগত, প্রদেশ কংগ্রেসের বলিষ্ঠ প্রবীণ দলনেতা এবং দিল্লির মধ্যস্থতাকারী; যারা দলের পুনরুজ্জীবনের কথা ভুলে কেবল নিজেদের টিকিয়ে রাখার বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন।
তাদের অনেকেই রাহুলকে একজন যোগ্য ‘নেতা’ হিসেবে না দেখে কেবল ‘উত্তরাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তারা প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখালেও গোপনে ছিলেন অবজ্ঞাপূর্ণ এবং সর্বদা সুযোগসন্ধানী। ফলে রাহুল কেন তাদের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠবেন, তা বোঝা মোটেও কঠিন নয়।
রাহুলের চোখে, এই পুরনো কংগ্রেস মানেই হলো ক্ষমতার সঙ্গে আপস, উচ্চবর্ণের আধিপত্য এবং বিজেপির মতো নরম হিন্দুত্বের রাজনীতি করা।
অন্যদিকে, বাইরের মানুষরা তার কাছে কংগ্রেসের ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির দ্বারা কলুষিত নন বলে মনে হয়। ঠিক এই কারণেই শশীকান্ত সেন্থিল, শচীন রাও, কৃষ্ণ আল্লাভারু, কে রাজু, প্রবীণ চক্রবর্তী, অলংকার সাওয়াই, কে বি বাইজু এবং কনিষ্ক সিংয়ের মতো ব্যক্তিরা রাহুলের বলয়ে বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
তবে এই মানুষগুলো সবাই এক প্রকৃতির নন। এই যেমন,
শশীকান্ত সেন্থিল: সাবেক আইএএস অফিসার, যিনি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাংগঠনিক ওয়ার রুমের প্রধান ছিলেন এবং পরবর্তীতে তামিলনাড়ু থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শচীন রাও: প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শ বিষয়ক ব্যক্তিত্ব, যার প্রভাব দলের ভেতরের ভাবধারায় স্পষ্ট।
কৃষ্ণ আল্লাভারু: ফুল-টাইম রাজনীতিতে আসার আগে করপোরেট সেক্টরে ছিলেন। রাহুলের যুব কংগ্রেসের হাত ধরে উঠে এসে এখন বড় সাংগঠনিক কাজ সামলাচ্ছেন।
কে রাজু: সাবেক আমলা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাহুলের সামাজিক ন্যায়বিচার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
প্রবীণ চক্রবর্তী: যিনি দলে ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং পেশাদার ক্লাসের রাজনীতি নিয়ে এসেছেন।
অলংকার সাওয়াই ও কে বি বাইজু: রাহুলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ইনার-অফিসের প্রতিনিধি— যারা মূলত সাক্ষাৎ, লজিস্টিকস, ইন্টেলিজেন্স এবং শেষ মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ সামলান।
কনিষ্ক সিং: রাহুলের একজন পুরোনো বিশ্বস্ত সহযোগী, যিনি অনেক আগে থেকেই এই ঘরানার প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এর সঙ্গে অতীতে জি মোহন গোপাল, মোহন প্রকাশ এবং মধুসূদন মিস্ত্রির মতো নামগুলো যোগ করলে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা নকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাহুল বারবার এমন কিছু মানুষকে খুঁজে নেন যারা নিজেদের ক্ষমতার জন্য কংগ্রেসের পুরনো প্রাদেশিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নন; বরং তারা সরাসরি রাহুলের কাছে দায়বদ্ধ। তারা রাহুলকে সেটাই বলেন যা রাহুল শুনতে ভালোবাসেন— অর্থাৎ, যারা দলটির পতন ডেকে এনেছে তাদের বাইপাস বা এড়িয়ে গিয়েও নতুন করে দল পুনর্গঠন করা সম্ভব।
তবে কংগ্রেসের আজীবন একনিষ্ঠ কর্মীরা এই পুরো বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে দেখেন।
তাদের মতে, সমস্যাটি এমন নয় যে ঘরের মানুষেরা রাহুলকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং আসল সমস্যা হলো— রাহুল ঘরের মানুষদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাজ্য থেকে রাজ্যান্তরে এই একই ক্ষোভ বিরাজ করছে: যারা মোদির উত্থানের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে, ইডি-সিবিআইয়ের চাপ, বিজেপির আগ্রাসন, মতাদর্শগত আক্রমণ এবং একের পর এক পরাজয়ের মধ্যেও দল ছেড়ে যাননি— আজ তাদের অবহেলা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নবাগত বা রাহুলের ব্যক্তিগত অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কংগ্রেসের অনুগত কর্মীরা এক অদ্ভুত অবহেলার শিকার। যখন কোনো প্রতিবাদ, পদযাত্রা, বুথ মিটিং, গ্রেফতার বরণ কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মতো কঠিন লড়াইয়ের মাঠ তৈরি হয়, তখন তাদের ডাক পড়ে। কিন্তু যখন কোনো পদ দেওয়া হয়, রাজ্যসভার টিকিট বণ্টন করা হয়, নির্বাচনি ওয়ার রুম তৈরি হয় কিংবা কোনো রাজ্যের ইনচার্জ বেছে নেওয়া হয়, তখন তারা দেখেন যে অচেনা কিছু মুখ তাদের ডিঙিয়ে শীর্ষস্থানে বসে গেছে।
এই যেমন, হরিয়ানার রাজ্যসভা নির্বাচন এই অসন্তোষকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। রাহুল শিবির এক প্রথাগত হেভিওয়েট হরিয়ানভি নেতাকে বাদ দিয়ে করমবীর সিং বৌদ্ধ নামের এক অপরিচিত দলিত মুখকে সমর্থন দেয়।
এক নাটকীয় লড়াইয়ের পর বৌদ্ধ শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেও, এই পুরো প্রক্রিয়া দলের ভেতরের অন্তর্ঘাত, বাতিল ভোট এবং কংগ্রেস বিধায়কদের ক্রস-ভোটিংয়ের নগ্ন রূপকে সামনে এনেছিল।
রাহুলের সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রমাণ; কিন্তু পুরনো ঘরানার নেতাদের মতে, এটি ছিল স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণকে অবজ্ঞা করার চরম পরিণতি।
একই ফাটল দেখা গিয়েছিল মধ্যপ্রদেশেও, যেখানে একজন নিরাপদ ও অভিজ্ঞ প্রবীণ প্রার্থীর চেয়ে রাহুলের অনুগত মীনাক্ষী নটরাজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তামিলনাড়ুতে প্রবীণ চক্রবর্তীর রাজ্যসভার মনোনয়নও রাহুলের এই পেশাদার রাজনীতিরই প্রতিফলন ছিল।
তবে রাজনীতি কেবল প্রতীকের খেলা নয়; রাজনীতি হলো সবাইকে একসঙ্গে এক কামরায় ধরে রাখার শিল্প। বাইরের মানুষরা রাহুলকে হয়তো মুগ্ধ করতে পারেন, কিন্তু তারা সব সময় বিধায়কদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। তারা চমৎকার কৌশলপত্র বা স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে পারেন, কিন্তু জেলা সভাপতিদের বোঝাতে পারেন না। তারা জাতপাতভিত্তিক ন্যায়বিচার, সংবিধান, ডেটা বা দল সংস্কারের আধুনিক ভাষা বলতে পারেন, কিন্তু বালিয়ার ব্লক কমিটি, মোরেনার উপদল কিংবা রোহতকের বুথ নেটওয়ার্ক কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে— সেই বাস্তব খবর তারা রাখেন না।
আর এখানেই কংগ্রেসের চিরাচরিত ট্র্যাজেডি: রাহুল সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারেন যে পুরনো কলকব্জাগুলো ভেঙে গেছে, কিন্তু তিনি প্রায়শই এমন কিছু নতুন যন্ত্র দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করেন যার মাটি বা শেকড়ের সঙ্গে কোনো সংযোগই থাকে না।
কংগ্রেসের ভেতর মূলত দুজন রাহুল গান্ধী বসবাস করেন।
এক রাহুল বিকেন্দ্রীকরণ, দলিত প্রতিনিধিত্ব, যুবকদের কণ্ঠস্বর, অভ্যন্তরীণ সাহস এবং মতাদর্শিক স্পষ্টতার কথা বলেন।
আর অন্য রাহুল এমন এক ব্যবস্থা পরিচালনা করেন যেখানে তার কাছে পৌঁছানোর রাস্তাটি একটি ছোট্ট বৃত্তের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতাদের চেয়ে অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এবং যেখানে আজীবন অনুগত কর্মীরা কেবল আন্দাজ করার চেষ্টা করেন যে কোন দরজাটি দিয়ে ভেতরে ঢোকা সম্ভব।
এই স্ববিরোধিতা রাহুলকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করেছে। একটি রাজনৈতিক দল কেবল পেশাদার উপদেষ্টা, মতাদর্শিক ধর্মান্তরিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত অনুগতদের দিয়ে পুনর্গঠন করা যায় না।
ঠিক তেমনি, শুধু পুরনো ক্লান্ত ব্যবস্থাপকদের দিয়েও তা সম্ভব নয়। দলের জন্য সংস্কার এবং শেকড়— দুটোরই প্রয়োজন। এমন বাইরের মানুষ প্রয়োজন যিনি দক্ষতা আনবেন, আবার এমন ঘরের মানুষও প্রয়োজন যিনি দলের ইতিহাস ও স্মৃতি বয়ে চলবেন।
কংগ্রেসের মূলধারার বাইরে তাকানোর রাহুলের এই প্রবৃত্তি একটি গভীর উপলব্ধি থেকেই এসেছে। তিনি দলের ভেতরের সুবিধাবাদী সংস্কৃতি, উপদলীয় ব্ল্যাকমেইল এবং স্থায়ী অকর্মণ্যতার প্রাচীর ভাঙতে চান। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, কেবল নিজের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠদের বিশ্বাস করতে গিয়ে তিনি নিজেই এক নতুন সুবিধাবাদী বলয় তৈরি করছেন।
ঠিক এই কারণেই দলের ভেতরের ক্ষোভ কিছুতেই কমছে না। একজন বিশ্বস্ত কর্মীর কষ্ট কেবল এটা নয় যে একজন বাইরের মানুষ পুরস্কৃত হচ্ছেন; তার আসল কষ্ট হলো— লড়াইয়ের মাঠে তিনি দরকারি, কিন্তু পুরস্কারের মঞ্চে তিনি অদৃশ্য এবং রণকৌশল নির্ধারণের সময় তিনি অপাংক্তেয়।
যে দলটির কর্মীরা এক দশক ধরে কেবল ত্যাগই স্বীকার করে গেছেন, তাদের কাছে এই অবহেলার অনুভূতি ছোট কোনো আবেগ নয়— এটিই এখন বড় রাজনীতি হয়ে উঠছে।
রাহুল হয়তো আগামী দিনে প্রমাণ করতে পারেন যে তার এই ‘আউটসাইডার রিপাবলিক’ বা বহিরাগতদের সাম্রাজ্যই একটি নতুন কংগ্রেস তৈরি করবে। তবে তার আগে তাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যা প্রতিটি সাধারণ কংগ্রেস কর্মী আজ নীরবে নিজেকে জিজ্ঞেস করছেন: যদি দলের প্রতি আজীবন আনুগত্যের চেয়ে রাহুলের সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈকট্যের মূল্য বেশি হয়, তবে আসলে কিসের পুনর্গঠন চলছে?

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে দেশবাসীর প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের আহবান

এনডিটিভির বিশ্লেষণ

রাহুল গান্ধীর ‘আউটসাইডার নীতি’, ক্ষোভ বাড়ছে কংগ্রেসে

আপডেট সময় ০৯:৪৭:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

এখানে ‘আউটসাইডার’ বা ‘বাইরের মানুষ’ বলতে সবসময় এমন কাউকে বোঝায় না যিনি গতকালই দলে যোগ দিয়েছেন। কখনো কখনো এর অর্থ হলো— যিনি ঐতিহ্যগত রাজ্য-স্তরের সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থেকে এসেছেন। আবার কখনো এর অর্থ কোনো প্রযুক্তিবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, সাবেক আমলা, পেশাজীবী, এনজিও-ভাবাপন্ন রাজনৈতিক কর্মী বা ব্যক্তিগত সহকারী— যারা জেলা কমিটি, যুব কংগ্রেস, প্রদেশ কংগ্রেস কিংবা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির চেনা পথ মাড়িয়ে, উপদলীয় আনুগত্য বা নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজনীতিতে আসেননি।
সহজ কথায়, এটি এমন একদল মানুষকে বোঝায় যাদের প্রতি রাহুলের অন্ধ বিশ্বাস আছে, কিন্তু মূল দল বা সাধারণ কর্মীদের মনে তাদের প্রতি কোনো সমীহ নেই।
এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেন আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতম।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা ও দলিত অ্যাক্টিভিস্ট রাজেন্দ্র পাল গৌতমকে নির্বাচনি রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ‘এআইসিসি ইনচার্জ’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অবিনাশ পান্ডের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
গৌতম একই সঙ্গে কংগ্রেসের তফসিলি জাতি বিভাগেরও প্রধান এবং রাহুল গান্ধীর সামাজিক ন্যায়বিচার ও দলিত ভাবমূর্তি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের বহু হেভিওয়েট নেতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
কংগ্রেসের জন্য উত্তরপ্রদেশ কোনো সাধারণ রাজ্য নয়। এটি সেই মাটি যেখানে একটি জাতীয় শক্তি হিসেবে কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল, যেখানে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের রাজনীতি একসময় গণ-বৈধতা পেয়েছিল এবং এখানেই দলটির পতন সবচেয়ে বেশি অপমানজনক হয়েছে।
২০১৯ সালে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তাকে পূর্ব উত্তরপ্রদেশের এবং জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর আজ, দলটির উত্তরপ্রদেশের প্রধান চালিকাশক্তি হলেন রাজেন্দ্র পাল গৌতম— যিনি একজন নবাগত এবং এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক বা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কোনো হেভিওয়েট নেতাও নন।
এটি কেবল একটি সাধারণ নিয়োগ নয়, এটি আসলে একটি পরিষ্কার বার্তা। রাহুল স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কংগ্রেসের পুরনো কাঠামোর ভবিষ্যৎ কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার বা উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি আরও বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে— মতাদর্শিক অবস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার, দলিতদের কাছে পৌঁছানো এবং বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তিনি কোনো পরিশ্রান্ত ‘ইনসাইডার’ বা ঘরের মানুষের চেয়ে একজন নব্য দীক্ষিত ‘আউটসাইডার’কে বেশি বিশ্বাস করেন।
এখন প্রশ্ন হলো— এটি রাহুলের রাজনৈতিক সাহস, নাকি সিদ্ধান্তহীনতার বিভ্রান্তি, নাকি নতুন এক ধরনের কোটারি বা বলয় কেন্দ্রিক রাজনীতি?
রাহুল গান্ধীর এই আউটসাইডার প্রীতির পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে।
যখন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তখন তার চারপাশে ছিল পুরনো কংগ্রেসের এক বিশাল বহর— জেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা, উপদলীয় কোন্দলের পরিচালক, গান্ধী পরিবারের পুরোনো অনুগত, প্রদেশ কংগ্রেসের বলিষ্ঠ প্রবীণ দলনেতা এবং দিল্লির মধ্যস্থতাকারী; যারা দলের পুনরুজ্জীবনের কথা ভুলে কেবল নিজেদের টিকিয়ে রাখার বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন।
তাদের অনেকেই রাহুলকে একজন যোগ্য ‘নেতা’ হিসেবে না দেখে কেবল ‘উত্তরাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তারা প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখালেও গোপনে ছিলেন অবজ্ঞাপূর্ণ এবং সর্বদা সুযোগসন্ধানী। ফলে রাহুল কেন তাদের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠবেন, তা বোঝা মোটেও কঠিন নয়।
রাহুলের চোখে, এই পুরনো কংগ্রেস মানেই হলো ক্ষমতার সঙ্গে আপস, উচ্চবর্ণের আধিপত্য এবং বিজেপির মতো নরম হিন্দুত্বের রাজনীতি করা।
অন্যদিকে, বাইরের মানুষরা তার কাছে কংগ্রেসের ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির দ্বারা কলুষিত নন বলে মনে হয়। ঠিক এই কারণেই শশীকান্ত সেন্থিল, শচীন রাও, কৃষ্ণ আল্লাভারু, কে রাজু, প্রবীণ চক্রবর্তী, অলংকার সাওয়াই, কে বি বাইজু এবং কনিষ্ক সিংয়ের মতো ব্যক্তিরা রাহুলের বলয়ে বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
তবে এই মানুষগুলো সবাই এক প্রকৃতির নন। এই যেমন,
শশীকান্ত সেন্থিল: সাবেক আইএএস অফিসার, যিনি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাংগঠনিক ওয়ার রুমের প্রধান ছিলেন এবং পরবর্তীতে তামিলনাড়ু থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শচীন রাও: প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শ বিষয়ক ব্যক্তিত্ব, যার প্রভাব দলের ভেতরের ভাবধারায় স্পষ্ট।
কৃষ্ণ আল্লাভারু: ফুল-টাইম রাজনীতিতে আসার আগে করপোরেট সেক্টরে ছিলেন। রাহুলের যুব কংগ্রেসের হাত ধরে উঠে এসে এখন বড় সাংগঠনিক কাজ সামলাচ্ছেন।
কে রাজু: সাবেক আমলা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাহুলের সামাজিক ন্যায়বিচার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
প্রবীণ চক্রবর্তী: যিনি দলে ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং পেশাদার ক্লাসের রাজনীতি নিয়ে এসেছেন।
অলংকার সাওয়াই ও কে বি বাইজু: রাহুলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ইনার-অফিসের প্রতিনিধি— যারা মূলত সাক্ষাৎ, লজিস্টিকস, ইন্টেলিজেন্স এবং শেষ মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ সামলান।
কনিষ্ক সিং: রাহুলের একজন পুরোনো বিশ্বস্ত সহযোগী, যিনি অনেক আগে থেকেই এই ঘরানার প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এর সঙ্গে অতীতে জি মোহন গোপাল, মোহন প্রকাশ এবং মধুসূদন মিস্ত্রির মতো নামগুলো যোগ করলে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা নকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাহুল বারবার এমন কিছু মানুষকে খুঁজে নেন যারা নিজেদের ক্ষমতার জন্য কংগ্রেসের পুরনো প্রাদেশিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নন; বরং তারা সরাসরি রাহুলের কাছে দায়বদ্ধ। তারা রাহুলকে সেটাই বলেন যা রাহুল শুনতে ভালোবাসেন— অর্থাৎ, যারা দলটির পতন ডেকে এনেছে তাদের বাইপাস বা এড়িয়ে গিয়েও নতুন করে দল পুনর্গঠন করা সম্ভব।
তবে কংগ্রেসের আজীবন একনিষ্ঠ কর্মীরা এই পুরো বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে দেখেন।
তাদের মতে, সমস্যাটি এমন নয় যে ঘরের মানুষেরা রাহুলকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং আসল সমস্যা হলো— রাহুল ঘরের মানুষদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাজ্য থেকে রাজ্যান্তরে এই একই ক্ষোভ বিরাজ করছে: যারা মোদির উত্থানের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে, ইডি-সিবিআইয়ের চাপ, বিজেপির আগ্রাসন, মতাদর্শগত আক্রমণ এবং একের পর এক পরাজয়ের মধ্যেও দল ছেড়ে যাননি— আজ তাদের অবহেলা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নবাগত বা রাহুলের ব্যক্তিগত অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কংগ্রেসের অনুগত কর্মীরা এক অদ্ভুত অবহেলার শিকার। যখন কোনো প্রতিবাদ, পদযাত্রা, বুথ মিটিং, গ্রেফতার বরণ কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মতো কঠিন লড়াইয়ের মাঠ তৈরি হয়, তখন তাদের ডাক পড়ে। কিন্তু যখন কোনো পদ দেওয়া হয়, রাজ্যসভার টিকিট বণ্টন করা হয়, নির্বাচনি ওয়ার রুম তৈরি হয় কিংবা কোনো রাজ্যের ইনচার্জ বেছে নেওয়া হয়, তখন তারা দেখেন যে অচেনা কিছু মুখ তাদের ডিঙিয়ে শীর্ষস্থানে বসে গেছে।
এই যেমন, হরিয়ানার রাজ্যসভা নির্বাচন এই অসন্তোষকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। রাহুল শিবির এক প্রথাগত হেভিওয়েট হরিয়ানভি নেতাকে বাদ দিয়ে করমবীর সিং বৌদ্ধ নামের এক অপরিচিত দলিত মুখকে সমর্থন দেয়।
এক নাটকীয় লড়াইয়ের পর বৌদ্ধ শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেও, এই পুরো প্রক্রিয়া দলের ভেতরের অন্তর্ঘাত, বাতিল ভোট এবং কংগ্রেস বিধায়কদের ক্রস-ভোটিংয়ের নগ্ন রূপকে সামনে এনেছিল।
রাহুলের সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রমাণ; কিন্তু পুরনো ঘরানার নেতাদের মতে, এটি ছিল স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণকে অবজ্ঞা করার চরম পরিণতি।
একই ফাটল দেখা গিয়েছিল মধ্যপ্রদেশেও, যেখানে একজন নিরাপদ ও অভিজ্ঞ প্রবীণ প্রার্থীর চেয়ে রাহুলের অনুগত মীনাক্ষী নটরাজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তামিলনাড়ুতে প্রবীণ চক্রবর্তীর রাজ্যসভার মনোনয়নও রাহুলের এই পেশাদার রাজনীতিরই প্রতিফলন ছিল।
তবে রাজনীতি কেবল প্রতীকের খেলা নয়; রাজনীতি হলো সবাইকে একসঙ্গে এক কামরায় ধরে রাখার শিল্প। বাইরের মানুষরা রাহুলকে হয়তো মুগ্ধ করতে পারেন, কিন্তু তারা সব সময় বিধায়কদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। তারা চমৎকার কৌশলপত্র বা স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে পারেন, কিন্তু জেলা সভাপতিদের বোঝাতে পারেন না। তারা জাতপাতভিত্তিক ন্যায়বিচার, সংবিধান, ডেটা বা দল সংস্কারের আধুনিক ভাষা বলতে পারেন, কিন্তু বালিয়ার ব্লক কমিটি, মোরেনার উপদল কিংবা রোহতকের বুথ নেটওয়ার্ক কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে— সেই বাস্তব খবর তারা রাখেন না।
আর এখানেই কংগ্রেসের চিরাচরিত ট্র্যাজেডি: রাহুল সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারেন যে পুরনো কলকব্জাগুলো ভেঙে গেছে, কিন্তু তিনি প্রায়শই এমন কিছু নতুন যন্ত্র দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করেন যার মাটি বা শেকড়ের সঙ্গে কোনো সংযোগই থাকে না।
কংগ্রেসের ভেতর মূলত দুজন রাহুল গান্ধী বসবাস করেন।
এক রাহুল বিকেন্দ্রীকরণ, দলিত প্রতিনিধিত্ব, যুবকদের কণ্ঠস্বর, অভ্যন্তরীণ সাহস এবং মতাদর্শিক স্পষ্টতার কথা বলেন।
আর অন্য রাহুল এমন এক ব্যবস্থা পরিচালনা করেন যেখানে তার কাছে পৌঁছানোর রাস্তাটি একটি ছোট্ট বৃত্তের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতাদের চেয়ে অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এবং যেখানে আজীবন অনুগত কর্মীরা কেবল আন্দাজ করার চেষ্টা করেন যে কোন দরজাটি দিয়ে ভেতরে ঢোকা সম্ভব।
এই স্ববিরোধিতা রাহুলকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করেছে। একটি রাজনৈতিক দল কেবল পেশাদার উপদেষ্টা, মতাদর্শিক ধর্মান্তরিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত অনুগতদের দিয়ে পুনর্গঠন করা যায় না।
ঠিক তেমনি, শুধু পুরনো ক্লান্ত ব্যবস্থাপকদের দিয়েও তা সম্ভব নয়। দলের জন্য সংস্কার এবং শেকড়— দুটোরই প্রয়োজন। এমন বাইরের মানুষ প্রয়োজন যিনি দক্ষতা আনবেন, আবার এমন ঘরের মানুষও প্রয়োজন যিনি দলের ইতিহাস ও স্মৃতি বয়ে চলবেন।
কংগ্রেসের মূলধারার বাইরে তাকানোর রাহুলের এই প্রবৃত্তি একটি গভীর উপলব্ধি থেকেই এসেছে। তিনি দলের ভেতরের সুবিধাবাদী সংস্কৃতি, উপদলীয় ব্ল্যাকমেইল এবং স্থায়ী অকর্মণ্যতার প্রাচীর ভাঙতে চান। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, কেবল নিজের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠদের বিশ্বাস করতে গিয়ে তিনি নিজেই এক নতুন সুবিধাবাদী বলয় তৈরি করছেন।
ঠিক এই কারণেই দলের ভেতরের ক্ষোভ কিছুতেই কমছে না। একজন বিশ্বস্ত কর্মীর কষ্ট কেবল এটা নয় যে একজন বাইরের মানুষ পুরস্কৃত হচ্ছেন; তার আসল কষ্ট হলো— লড়াইয়ের মাঠে তিনি দরকারি, কিন্তু পুরস্কারের মঞ্চে তিনি অদৃশ্য এবং রণকৌশল নির্ধারণের সময় তিনি অপাংক্তেয়।
যে দলটির কর্মীরা এক দশক ধরে কেবল ত্যাগই স্বীকার করে গেছেন, তাদের কাছে এই অবহেলার অনুভূতি ছোট কোনো আবেগ নয়— এটিই এখন বড় রাজনীতি হয়ে উঠছে।
রাহুল হয়তো আগামী দিনে প্রমাণ করতে পারেন যে তার এই ‘আউটসাইডার রিপাবলিক’ বা বহিরাগতদের সাম্রাজ্যই একটি নতুন কংগ্রেস তৈরি করবে। তবে তার আগে তাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যা প্রতিটি সাধারণ কংগ্রেস কর্মী আজ নীরবে নিজেকে জিজ্ঞেস করছেন: যদি দলের প্রতি আজীবন আনুগত্যের চেয়ে রাহুলের সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈকট্যের মূল্য বেশি হয়, তবে আসলে কিসের পুনর্গঠন চলছে?