ঢাকা ০৯:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কেরানীগঞ্জে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সেরা দোলেশ্বর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় টপ-ফিফটিন মেধাবী শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করল উপজেলা প্রশাসন Logo কালিয়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালন Logo দুর্গাপুরে বিশ্ব হাতধোয়া দিবস পালিত Logo গলাচিপায় (সি-পি-পি) স্বেচ্ছা সেবক দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ Logo উখিয়ায় নলকূপের পাইপ দিয়ে গ্যাস নির্গমনের আগুন জ্বলবে আরো ১ সপ্তাহ, ২০০ মিটারের বাসিন্দাদের সরানোর পরামর্শ বাপেক্সের Logo কালীগঞ্জে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: লুট হওয়া বৈদ্যুতিক সামগ্রী উদ্ধার, গ্রেফতার ২ Logo স্বরূপকাঠি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সেনা সদস্য সফিকুল ইসলাম Logo ফুলতলায় বরণপাড়া বায়োগ্যাস পল্লী উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি Logo টঙ্গী পশ্চিম থানা যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য মিছিল Logo মধুপুরের বংশাই নদী জোর কদমে চলছে পুনরুদ্ধারের কাজ

দেশ পেরিয়ে বিদেশেও বাড়ছে নরসিংদীর লটকনের চাহিদা

এক সময়ের জংলি ফল হিসেবে পরিচিত টক-মিষ্টি স্বাদের লটকন এখন নরসিংদী জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এনেছে পারিবারিক স্বচ্ছলতা। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই জেলায় বাণিজ্যিকভাবে লটকনের আবাদ ও নতুন নতুন বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, লটকনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-এর কোনো দৃশ্যমান ফুল বা পাপড়ি ঝরে না। সরাসরি গাছের কান্ড ও শাখা-প্রশাখা থেকে ছড়ায় ছড়ায় এই ফল বের হয়। ইতোমধ্যেই ‘বুগি’ নামে পরিচিত লটকন ফলটি নরসিংদী জেলার জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, লটকনে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘বি-টু’, ভিটামিন ‘সি’, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। মানবদেহের দৈনিক ভিটামিন ‘সি’র চাহিদার বেশিরভাগই মাত্র তিন-চারটি লটকনেই মেটাতে সক্ষম। সূত্রটি আরো জানায়, জেলার শিবপুর, বেলাবো, রায়পুরা ও মনোহরদী উপজেলার লাল রঙের উচু মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান থাকায় এখানকার মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট এক হাজার ৮’শ হেক্টর জমিতে লটকনের বাগান করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিক টন হিসেবে মোট ৩০ হাজার মেট্রিক টন লটকন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পাইকারি বাজারদর অনুযায়ী যার মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ২শত ৪০ কোটি টাকার ছাড়িয়ে যাবে। জেলার শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নকে ‘লটকনের রাজা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ এখানকার সমতল ও পাহাড়ি সব ধরনের জমিতেই লটকনের ব্যাপক আবাদ হয়ে থাকে। চর-বেলাবো গ্রামের লটকন চাষী মো: হযরত আলী জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামে মৃত হাছেন আলী ভূঁইয়া প্রথম এই লটকনের চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে বেলাবো ও শিবপুরের লালমাটি এলাকায় এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। লটকন চাষে জটিলতা ও খরচ দুই-ই কম। বেলে ও দো-আঁশ মাটিতে স্ত্রী গাছ রোপণের তিন বছরের মধ্যে ফলন আসতে শুরু করে এবং তা টানা ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের ৬০ দিন আগে গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সাথে মিশিয়ে গোড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা ও আকার বৃদ্ধি পায়। লটকনের বাজারজাতকরণ পদ্ধতিও বেশ চমৎকার। সাধারণত কাঁচা থাকা অবস্থাতেই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে পাইকারি দরে পুরো বাগান কিনে নেন। বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি মণ লটকন ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫’শ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১’শ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। নরসিংদীর লটকন খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এটি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে লটকন কিনে ট্রাকযোগে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছেন। বেলাবো উপজেলার পাহাড় উজিলাব গ্রামের লটকন চাষি ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চু মিয়া জানান, ৬০ বিঘা জমির বাগান থেকে ইতোমধ্যে তিনি ৪৯ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছেন। লাখপুর গ্রামের নুরুল হাসান ভূঁইয়ার ৩০ বিঘা এবং শিবপুরের আব্দুল সালাম মাস্টারের ১০ বিঘা জমির বাগান থেকে এবার লাখ লাখ টাকার লটকন বিক্রি হয়েছে। মরজাল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, এই অঞ্চলের লটকন মানসম্মত হওয়ায় ঢাকা হয়ে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারেও পাঠানো হচ্ছে। নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: আজিজল হক জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারনে লটকনের বাম্পার ফলন হয়েছে। চাষীরা ন্যায্য মূল্য পেয়ে বেশ লাভবান। কৃষি বিভাগ লটকন চাষীদের সর্বাত্বক বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কেরানীগঞ্জে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সেরা দোলেশ্বর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় টপ-ফিফটিন মেধাবী শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করল উপজেলা প্রশাসন

দেশ পেরিয়ে বিদেশেও বাড়ছে নরসিংদীর লটকনের চাহিদা

আপডেট সময় ০৪:০৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

এক সময়ের জংলি ফল হিসেবে পরিচিত টক-মিষ্টি স্বাদের লটকন এখন নরসিংদী জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এনেছে পারিবারিক স্বচ্ছলতা। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই জেলায় বাণিজ্যিকভাবে লটকনের আবাদ ও নতুন নতুন বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, লটকনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-এর কোনো দৃশ্যমান ফুল বা পাপড়ি ঝরে না। সরাসরি গাছের কান্ড ও শাখা-প্রশাখা থেকে ছড়ায় ছড়ায় এই ফল বের হয়। ইতোমধ্যেই ‘বুগি’ নামে পরিচিত লটকন ফলটি নরসিংদী জেলার জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, লটকনে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘বি-টু’, ভিটামিন ‘সি’, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। মানবদেহের দৈনিক ভিটামিন ‘সি’র চাহিদার বেশিরভাগই মাত্র তিন-চারটি লটকনেই মেটাতে সক্ষম। সূত্রটি আরো জানায়, জেলার শিবপুর, বেলাবো, রায়পুরা ও মনোহরদী উপজেলার লাল রঙের উচু মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান থাকায় এখানকার মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট এক হাজার ৮’শ হেক্টর জমিতে লটকনের বাগান করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিক টন হিসেবে মোট ৩০ হাজার মেট্রিক টন লটকন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পাইকারি বাজারদর অনুযায়ী যার মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ২শত ৪০ কোটি টাকার ছাড়িয়ে যাবে। জেলার শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নকে ‘লটকনের রাজা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ এখানকার সমতল ও পাহাড়ি সব ধরনের জমিতেই লটকনের ব্যাপক আবাদ হয়ে থাকে। চর-বেলাবো গ্রামের লটকন চাষী মো: হযরত আলী জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামে মৃত হাছেন আলী ভূঁইয়া প্রথম এই লটকনের চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে বেলাবো ও শিবপুরের লালমাটি এলাকায় এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। লটকন চাষে জটিলতা ও খরচ দুই-ই কম। বেলে ও দো-আঁশ মাটিতে স্ত্রী গাছ রোপণের তিন বছরের মধ্যে ফলন আসতে শুরু করে এবং তা টানা ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের ৬০ দিন আগে গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সাথে মিশিয়ে গোড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা ও আকার বৃদ্ধি পায়। লটকনের বাজারজাতকরণ পদ্ধতিও বেশ চমৎকার। সাধারণত কাঁচা থাকা অবস্থাতেই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে পাইকারি দরে পুরো বাগান কিনে নেন। বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি মণ লটকন ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫’শ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১’শ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। নরসিংদীর লটকন খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এটি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে লটকন কিনে ট্রাকযোগে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছেন। বেলাবো উপজেলার পাহাড় উজিলাব গ্রামের লটকন চাষি ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চু মিয়া জানান, ৬০ বিঘা জমির বাগান থেকে ইতোমধ্যে তিনি ৪৯ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছেন। লাখপুর গ্রামের নুরুল হাসান ভূঁইয়ার ৩০ বিঘা এবং শিবপুরের আব্দুল সালাম মাস্টারের ১০ বিঘা জমির বাগান থেকে এবার লাখ লাখ টাকার লটকন বিক্রি হয়েছে। মরজাল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, এই অঞ্চলের লটকন মানসম্মত হওয়ায় ঢাকা হয়ে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারেও পাঠানো হচ্ছে। নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: আজিজল হক জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারনে লটকনের বাম্পার ফলন হয়েছে। চাষীরা ন্যায্য মূল্য পেয়ে বেশ লাভবান। কৃষি বিভাগ লটকন চাষীদের সর্বাত্বক বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে।