ঢাকা ১২:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় যুক্তরাজ্য : ব্রিটিশ হাইকমিশনার Logo ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলের সদর দপ্তর পরিদর্শন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের Logo ১৯ কার্গো এলএনজি আসছে ঘাটতির আশংকা নেই Logo দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের প্রতি সহায়তার আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo বিএনপি সরকারের উদ্যোগ : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু Logo বাংলাদেশের বিপক্ষে শক্তিশালী স্কোয়াড ঘোষণা করল অস্ট্রেলিয়া Logo ফোন নীরবে যে ৪ কাজ করে Logo ডেঙ্গু প্রতিরোধ ঘর থেকেই শুরু হোক Logo মনের জটিল জট খোলার মতো ১০টি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমা

ভারত কেন তারেক রহমানের সফরের জন্য এত উদগ্রীব

চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো খুব সাধারণ একটি ই-মেইল কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নজর কেড়েছিল, ওই ই-মেইলে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি ভবনে সপ্তাহান্তের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার জন্য সময় প্রয়োজন।
বিবিসির প্রতিবেদনর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,“কিন্তু তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে তখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আনতে ভারত কতটা আগ্রহী।
তবে তারেক রহমান এখনো সফরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেননি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ বিবিসিকে বলেছেন, ‘সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জয় পাওয়ার পর সরকার গঠন করে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। ওই আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন। এরপর হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।
হাসিনাকে সরিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে।
তাই দিল্লি এখন আশা করছে, তারেক রহমানের সরকার দুদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান বিষয়টিকে কঠিন করে তুলছে। সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তার মৃত্যুদ-ের রায় দিয়েছে। যদিও হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ বলেন, ‘আমরা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনাকে দ্রুত প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’ ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি তারা বিবেচনা করছে।
তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ভারত তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।
তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ এবং ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ত্রিবেদী।
বাংলাদেশের মতো কোনো প্রতিবেশী দেশের নেতাকে ভারত এতটা জোরালোভাবে সফরের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে—এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘আমার ধারণা, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে। কারণ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া বাংলাদেশকে কাছে টানতে তারা প্রায় সব ধরনের উদ্যোগই নিয়েছে।’
শরণ বলেন, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক কিছু প্রয়োজন মেটাতেও ভারত এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসা ভিসা দেওয়া এবং বাণিজ্য সহজ করতে দুই দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থাকে আবার সক্রিয় করার বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, পাশাপাশি রয়েছে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক। গত বছর দুদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার বেশিরভাগই ভারতের পক্ষে গেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও যাতায়াত বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় দুদেশের সরকার সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে।
দুদেশ নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। বাংলাদেশে থাকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হাসিনা সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। ভারত দাবি করেছিল, এসব গোষ্ঠী বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তবে হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো ভারত উপেক্ষা করেছে।
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান দুদেশের সম্পর্কের পুরোনো উত্তেজনাকে এখনো জিইয়ে রেখেছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হাসিনা। তিনি জানান, ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি তারেক রহমানের বিএনপি সরকারকে নিজের সমর্থকদের দমন করার অভিযোগ করেন। হাসিনাকে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ‘ক্ষুব্ধ’ বলে প্রতিক্রিয়া জানায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের ‘কোনো ভূমিকা ছিল না’ এবং সেখানে বলা কোনো বক্তব্য—বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকার সম্পর্কে মন্তব্য—তারা সমর্থন করে না।
যদিও সময়টিও ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন জানান, হাসিনার ওই বক্তব্যের আগে খবর ছিল যে, তারেক রহমান ভারত সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
তিনি বলেন, ‘এতে (হাসিনার বক্তব্য) বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দুদেশের সম্পর্ক নতুন করে গড়তে সত্যিই আন্তরিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’
ফলে হাসিনা ভারতে থাকাবস্থায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর করলে বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করতে ভারতের আগ্রহের পেছনে শুধু শেখ হাসিনার বিষয়টি নেই। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা শুরু করেছে।
ঢাকা ও ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের সামরিক প্রতিনিধিদলের সফর হয়েছে। দুদেশ প্রকাশ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেছে। দিল্লি এসব ঘটনাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
সম্প্রতি ঘোষিত ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়েও বাংলাদেশে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—তিনটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশ এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
চুক্তিটির বিস্তারিত এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ওপর কী ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটি ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি—অর্থাৎ কোনো একটি সদস্য আক্রান্ত হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে আমাদেরও এতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়।’ তিনি বলেন, বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ভারতের জন্য এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার আমলে যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, দিল্লি এখন আর ধরে নিতে পারে না যে সেই সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে।”
কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন একটি নতুন মোড় নিচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবালের একটি বিতর্কিত মন্তব্য ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবালের একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট সোমবার কানওয়াল সিবাল তার ভেরিফাইড এক্স হ্যান্ডল (@কধহধিষঝরনধষ) থেকে একটি পোস্ট করেন।
এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, “ঐব (ঞধৎরয়ঁব জধযসধহ) যধং ফঁম ধ যড়ষব ভৎড়স যিরপয যব রিষষ হড়ঃ নব ধনষব ঃড় বীঃৎরপধঃব যরসংবষভ. খরহশরহম যরং ারংরঃ ঃড় ওহফরধ ঃড় ঐধংরহধ’ং বীঃৎধফরঃরড়হ রং ঢ়ষধুরহম যধৎফনধষষ. ঞযরং রং ঢ়বঃঁষধহপব, হড়ঃ ফরঢ়ষড়সধপুৃ’ অর্থাৎ ‘তারেক রহমান এমন এক গর্ত খুঁড়ছেন (নিজের কবর নিজে খুঁড়ছেন অর্থে), যেখান থেকে তিনি আর বের হতে পারবেন না। তার ভারত সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করাটা একটি কঠোর অবস্থান। এটি কোনো কূটনীতি নয়, বরং খামখেয়ালিপনা।’
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা একজন সাবেক শীর্ষ কূটনীতিকের মুখ থেকে এমন অসংবেদনশীল ও অসৌজন্যমূলক বক্তব্য স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের প্রতি চরম অসম্মান এবং স্পষ্ট কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন।
ভারতীয় কিছু পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের বাড়াবাড়ি : একইসঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কিছু পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের অতি-উৎসাহী এবং অতিরঞ্জিত প্রচারণা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। গণমাধ্যমগুলো দুই দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক কূটনৈতিক দরকষাকষিকে ‘চূড়ান্ত সংঘাত’ হিসেবে চিত্রায়িত করার এক ধরনের বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো একে রাজনৈতিক অহংকার ও একপেশে দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচার করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের নীতি রক্ষা করা অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সাবেক কর্মকর্তাদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের অহেতুক উসকানি কোনোভাবেই দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য কল্যাণকর নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব নতুন কিছু নয়। ভারতের ওপর কূটনৈতিক দিক থেকে অতি-চাপ কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের বহু নজির রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পষ্ট উদাহরণ ছিল ২০১৮ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ভারত সফর।
অসৌজন্যমূলক আচরণের নজির : ২০১৮ সালের সফরের সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ট্রুডোকে অত্যন্ত শীতল বা হালকা অভ্যর্থনা (ঝহঁন) জানানো হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জি-২০ (এ২০) সম্মেলনে যোগ দিতেও ভারত সফর করেছিলেন। ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনের সময়ও ট্রুডোর সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক টানাপড়েন দৃশ্যমান ছিল। সম্মেলন শেষে তার বিমান যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়লে তিনি প্রায় দুই দিন ভারতে আটকে ছিলেন। তখন ভারতের পক্ষ থেকে তাকে অন্য একটি বিমান ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও কানাডা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ব্যাকআপ বিমান আসার আগ পর্যন্ত হোটেলেই অবস্থান করেছিল। সামগ্রিকভাবে ট্রুডোর ভারত সফরগুলোর সময় ভারত সরকার তাকে কোনো বাড়তি খাতির না দেখিয়ে বরং খালিস্তান ইস্যুতে অত্যন্ত কড়া ও দূরত্বের কূটনৈতিক অবস্থান প্রদর্শন করেছিল।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো আট দিনের এক দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু তার পুরো সফরে ভারত সরকারের যে ধরনের অপেশাদার ও অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখা গিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। ট্রুডোকে সফরের শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির (বিশেষ করে শিখ ও খালিস্তান ইস্যু) জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রীয় সফরে অতিথি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল কৌশলে ট্রুডোকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চাপ সৃষ্টির রহস্য : কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ভারত যেমন নিজ স্বার্থ উদ্ধারে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ ও কূটনৈতিক শীতলতা দেখিয়েছিল, ঠিক তেমনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতের অতিরিক্ত আগ্রহ ও চাপ তৈরি করা একই ধরনের ভিন্ন এক কৌশলের অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে যখন শীর্ষ নেতৃত্ব ‘উপযুক্ত পরিবেশ’-এর কথা বলছেন, তখন তড়িঘড়ি করে সফর চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দেওয়া কোনো শুভ লক্ষণ নয়। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ ও শর্ত অনুকূল হওয়ার আগেই সফর সম্পন্ন করিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতে পারে এ চাপের মূল লক্ষ্য।
কূটনীতি চলে সমমর্যাদা, পারস্পারিক শ্রদ্ধা এবং সুবিধাজনক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে। জোরপূর্বক কোনো শীর্ষ সম্মেলন বা সফর কোনো দেশের জন্য সুফল বয়ে আনে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, ভারত নিজ স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে যেমন কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না, তেমনি নিজের সুবিধার জন্য অন্যায্য চাপ সৃষ্টিতেও পিছপা হয় না। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে নিজস্ব স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং সঠিক সময়ের হিসাব কষেই ভারতে সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কোনো বাহ্যিক চাপের মুখে নয়।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারত কেন তারেক রহমানের সফরের জন্য এত উদগ্রীব

আপডেট সময় ০৬:৫৪:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো খুব সাধারণ একটি ই-মেইল কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নজর কেড়েছিল, ওই ই-মেইলে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি ভবনে সপ্তাহান্তের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার জন্য সময় প্রয়োজন।
বিবিসির প্রতিবেদনর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,“কিন্তু তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে তখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আনতে ভারত কতটা আগ্রহী।
তবে তারেক রহমান এখনো সফরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেননি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ বিবিসিকে বলেছেন, ‘সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জয় পাওয়ার পর সরকার গঠন করে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। ওই আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন। এরপর হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।
হাসিনাকে সরিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে।
তাই দিল্লি এখন আশা করছে, তারেক রহমানের সরকার দুদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান বিষয়টিকে কঠিন করে তুলছে। সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তার মৃত্যুদ-ের রায় দিয়েছে। যদিও হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ বলেন, ‘আমরা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনাকে দ্রুত প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’ ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি তারা বিবেচনা করছে।
তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি থাকা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ভারত তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।
তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ এবং ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ত্রিবেদী।
বাংলাদেশের মতো কোনো প্রতিবেশী দেশের নেতাকে ভারত এতটা জোরালোভাবে সফরের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে—এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘আমার ধারণা, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে। কারণ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া বাংলাদেশকে কাছে টানতে তারা প্রায় সব ধরনের উদ্যোগই নিয়েছে।’
শরণ বলেন, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক কিছু প্রয়োজন মেটাতেও ভারত এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসা ভিসা দেওয়া এবং বাণিজ্য সহজ করতে দুই দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থাকে আবার সক্রিয় করার বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, পাশাপাশি রয়েছে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক। গত বছর দুদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার বেশিরভাগই ভারতের পক্ষে গেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও যাতায়াত বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় দুদেশের সরকার সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে।
দুদেশ নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। বাংলাদেশে থাকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হাসিনা সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। ভারত দাবি করেছিল, এসব গোষ্ঠী বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তবে হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো ভারত উপেক্ষা করেছে।
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান দুদেশের সম্পর্কের পুরোনো উত্তেজনাকে এখনো জিইয়ে রেখেছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হাসিনা। তিনি জানান, ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি তারেক রহমানের বিএনপি সরকারকে নিজের সমর্থকদের দমন করার অভিযোগ করেন। হাসিনাকে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ‘ক্ষুব্ধ’ বলে প্রতিক্রিয়া জানায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের ‘কোনো ভূমিকা ছিল না’ এবং সেখানে বলা কোনো বক্তব্য—বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকার সম্পর্কে মন্তব্য—তারা সমর্থন করে না।
যদিও সময়টিও ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন জানান, হাসিনার ওই বক্তব্যের আগে খবর ছিল যে, তারেক রহমান ভারত সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
তিনি বলেন, ‘এতে (হাসিনার বক্তব্য) বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দুদেশের সম্পর্ক নতুন করে গড়তে সত্যিই আন্তরিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’
ফলে হাসিনা ভারতে থাকাবস্থায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর করলে বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করতে ভারতের আগ্রহের পেছনে শুধু শেখ হাসিনার বিষয়টি নেই। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা শুরু করেছে।
ঢাকা ও ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের সামরিক প্রতিনিধিদলের সফর হয়েছে। দুদেশ প্রকাশ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেছে। দিল্লি এসব ঘটনাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
সম্প্রতি ঘোষিত ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়েও বাংলাদেশে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—তিনটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশ এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
চুক্তিটির বিস্তারিত এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ওপর কী ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটি ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি—অর্থাৎ কোনো একটি সদস্য আক্রান্ত হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে আমাদেরও এতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়।’ তিনি বলেন, বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ভারতের জন্য এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার আমলে যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, দিল্লি এখন আর ধরে নিতে পারে না যে সেই সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে।”
কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন একটি নতুন মোড় নিচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবালের একটি বিতর্কিত মন্তব্য ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবালের একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট সোমবার কানওয়াল সিবাল তার ভেরিফাইড এক্স হ্যান্ডল (@কধহধিষঝরনধষ) থেকে একটি পোস্ট করেন।
এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, “ঐব (ঞধৎরয়ঁব জধযসধহ) যধং ফঁম ধ যড়ষব ভৎড়স যিরপয যব রিষষ হড়ঃ নব ধনষব ঃড় বীঃৎরপধঃব যরসংবষভ. খরহশরহম যরং ারংরঃ ঃড় ওহফরধ ঃড় ঐধংরহধ’ং বীঃৎধফরঃরড়হ রং ঢ়ষধুরহম যধৎফনধষষ. ঞযরং রং ঢ়বঃঁষধহপব, হড়ঃ ফরঢ়ষড়সধপুৃ’ অর্থাৎ ‘তারেক রহমান এমন এক গর্ত খুঁড়ছেন (নিজের কবর নিজে খুঁড়ছেন অর্থে), যেখান থেকে তিনি আর বের হতে পারবেন না। তার ভারত সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করাটা একটি কঠোর অবস্থান। এটি কোনো কূটনীতি নয়, বরং খামখেয়ালিপনা।’
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা একজন সাবেক শীর্ষ কূটনীতিকের মুখ থেকে এমন অসংবেদনশীল ও অসৌজন্যমূলক বক্তব্য স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের প্রতি চরম অসম্মান এবং স্পষ্ট কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন।
ভারতীয় কিছু পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের বাড়াবাড়ি : একইসঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কিছু পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের অতি-উৎসাহী এবং অতিরঞ্জিত প্রচারণা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। গণমাধ্যমগুলো দুই দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক কূটনৈতিক দরকষাকষিকে ‘চূড়ান্ত সংঘাত’ হিসেবে চিত্রায়িত করার এক ধরনের বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো একে রাজনৈতিক অহংকার ও একপেশে দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচার করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের নীতি রক্ষা করা অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সাবেক কর্মকর্তাদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের অহেতুক উসকানি কোনোভাবেই দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য কল্যাণকর নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব নতুন কিছু নয়। ভারতের ওপর কূটনৈতিক দিক থেকে অতি-চাপ কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের বহু নজির রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পষ্ট উদাহরণ ছিল ২০১৮ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ভারত সফর।
অসৌজন্যমূলক আচরণের নজির : ২০১৮ সালের সফরের সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ট্রুডোকে অত্যন্ত শীতল বা হালকা অভ্যর্থনা (ঝহঁন) জানানো হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জি-২০ (এ২০) সম্মেলনে যোগ দিতেও ভারত সফর করেছিলেন। ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনের সময়ও ট্রুডোর সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক টানাপড়েন দৃশ্যমান ছিল। সম্মেলন শেষে তার বিমান যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়লে তিনি প্রায় দুই দিন ভারতে আটকে ছিলেন। তখন ভারতের পক্ষ থেকে তাকে অন্য একটি বিমান ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও কানাডা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ব্যাকআপ বিমান আসার আগ পর্যন্ত হোটেলেই অবস্থান করেছিল। সামগ্রিকভাবে ট্রুডোর ভারত সফরগুলোর সময় ভারত সরকার তাকে কোনো বাড়তি খাতির না দেখিয়ে বরং খালিস্তান ইস্যুতে অত্যন্ত কড়া ও দূরত্বের কূটনৈতিক অবস্থান প্রদর্শন করেছিল।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো আট দিনের এক দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু তার পুরো সফরে ভারত সরকারের যে ধরনের অপেশাদার ও অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখা গিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। ট্রুডোকে সফরের শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির (বিশেষ করে শিখ ও খালিস্তান ইস্যু) জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রীয় সফরে অতিথি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল কৌশলে ট্রুডোকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চাপ সৃষ্টির রহস্য : কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ভারত যেমন নিজ স্বার্থ উদ্ধারে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ ও কূটনৈতিক শীতলতা দেখিয়েছিল, ঠিক তেমনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতের অতিরিক্ত আগ্রহ ও চাপ তৈরি করা একই ধরনের ভিন্ন এক কৌশলের অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে যখন শীর্ষ নেতৃত্ব ‘উপযুক্ত পরিবেশ’-এর কথা বলছেন, তখন তড়িঘড়ি করে সফর চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দেওয়া কোনো শুভ লক্ষণ নয়। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ ও শর্ত অনুকূল হওয়ার আগেই সফর সম্পন্ন করিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতে পারে এ চাপের মূল লক্ষ্য।
কূটনীতি চলে সমমর্যাদা, পারস্পারিক শ্রদ্ধা এবং সুবিধাজনক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে। জোরপূর্বক কোনো শীর্ষ সম্মেলন বা সফর কোনো দেশের জন্য সুফল বয়ে আনে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, ভারত নিজ স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে যেমন কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না, তেমনি নিজের সুবিধার জন্য অন্যায্য চাপ সৃষ্টিতেও পিছপা হয় না। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে নিজস্ব স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং সঠিক সময়ের হিসাব কষেই ভারতে সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কোনো বাহ্যিক চাপের মুখে নয়।