ঢাকা ১১:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে মালদ্বীপের সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo জাপানে টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী Logo হানিফের মৃত্যুদণ্ড , ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড Logo ​নানা আয়োজনে বোরহানউদ্দিন যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন Logo মন্টেনেগ্রোকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ Logo ডিসকর্ডে থাকা আপনার ব্যক্তিগত বার্তাও চলে যেতে পারে গুগল সার্চে Logo ডায়াবেটিস থাকলে আঙুর নাকি আপেল খাবেন? Logo শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকর্ম নিয়ে নতুন সিনেমা Logo মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ১০ উপায় Logo আমার ছেলে আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলা হয়েছে : তাহসিফের বাবা

‘অনুবাদক’ থেকে কৌশলের সম্রাট: মরিনহোর প্রত্যাবর্তনের গল্প

বার্সেলোনার সমর্থকেরা বহুদিন ধরেই হোসে মরিনহোকে খোঁটা দিয়ে আসছেন। তাদের সবচেয়ে পরিচিত বিদ্রূপাত্মক ডাকনাম হলো ‘ট্রাডাক্টর’, যার স্প্যানিশ অর্থ অনুবাদক। এর মাধ্যমে তারা রিয়াল মাদ্রিদের এই কোচের শুরুর দিনগুলোর মনে করিয়ে দিতে চান।
ক্যারিয়ারের শুরুতে কিংবদন্তি কোচ স্যার ববি রবসনের দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন মরিনহো। স্পোর্টিং লিসবন থেকে পোর্তো এবং পরে ১৯৯৬ সালে বার্সেলোনায় রবসনের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। চার বছর পর বেনফিকার প্রধান কোচ হন মরিনহো, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার কোচিং জীবনের যাত্রা, যা তাকে দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়সহ ইংল্যান্ড, ইতালি ও স্পেনে অসংখ্য সাফল্য এনে দেয়।
মরিনহো কখনোই কেবল একজন অনুবাদক ছিলেন না। বার্সেলোনায় থাকা সময়েও তার মধ্যে ছিল কঠোর পরিশ্রম, অদম্য সংকল্প, আত্মবিশ্লেষণের ক্ষমতা, বিশৃঙ্খলার মধ্যেও সফল হওয়ার দক্ষতা এবং অসাধারণ কৌশলগত জ্ঞান। তার দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় সাফল্যই এ গুণগুলোর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
গত সপ্তাহান্তে রিয়াল মাদ্রিদ যখন বার্সেলোনাকে ২-১ গোলে হারায়, তখন আবারও দেখা যায় মরিনহোর সেই তীক্ষ্ণ কৌশলগত মস্তিষ্ক। ফুটবল বিশ্ব যখন তার কৌশলের প্রশংসায় মেতেছিল, তখন সেটি ছিল ২৬ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকানোরও উপযুক্ত মুহূর্ত।
এই এল ক্লাসিকোতে রিয়াল খেলেছিল ৪-৪-২ ফর্মেশনে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিষিদ্ধ থাকায় তাকে পাওয়া যায়নি। ডান-ব্যাকে খেলেন ফেদেরিকো ভালভার্দে। মিডফিল্ডে অরেলিয়েঁ চুয়ামেনির সঙ্গী ছিলেন বার্নার্দো সিলভা। দুই উইংয়ে খেলেন আরদা গুলের ও ইয়ান দিয়োমান্দে। আর জুড বেলিংহ্যাম ছিলেন কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে আক্রমণভাগে।
বড় ম্যাচগুলোতে যেমনটি তিনি প্রায়ই করেন, এবারও মরিনহো তার পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের একজনকে বিশেষ দায়িত্ব দেন। বার্সেলোনার মিডফিল্ডার পেদ্রিকে ম্যান-মার্কিংয়ের দায়িত্ব পান বার্নার্দো সিলভা। কাজটি সহজ ছিল না, কিন্তু এর ফলে পেদ্রির প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
বার্সেলোনার তীব্র প্রেসিং এবং বলের দিকে দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতাকে কাজে লাগায় রিয়াল। তারা উইংয়ে প্রতিপক্ষকে টেনে এনে মাঠের বিপরীত পাশে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে। কখনো ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে, কখনো লম্বা পাসে আক্রমণ গড়ে তোলে তারা। বিশেষ করে ডান প্রান্ত থেকে বাম দিকে বল সুইচ করার সময় বার্সেলোনার রক্ষণ ভাঙতে সফল হয় রিয়াল।
ম্যাচ শেষে মরিনহো তার স্বভাবের ব্যতিক্রম ঘটান। সাধারণত প্রকাশ্যে কৌশলগত বিশ্লেষণে তিনি খুব একটা যান না। কিন্তু এবার তিনি ব্যাখ্যা করেন যে তার মিডফিল্ডারদের গভীর দৌড়ই বার্সেলোনার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনকে প্রায়ই মাঠের লড়াইয়েরই ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। সম্ভবত ভবিষ্যতে বার্সেলোনার প্রতিপক্ষরা যেন তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সেই আশাতেই নিজের পরিকল্পনা উন্মোচন করেন।
উঁচু ডিফেন্স লাইনের পেছনের ফাঁকা জায়গায় বারবার দৌড়ে গিয়ে রিয়াল, হান্সি ফ্লিকের আক্রমণাত্মক কৌশলকে ভেঙে দেয়।
বড় ম্যাচে কৌশলী জয় এনে দেওয়ার জন্য মরিনহো প্রশংসা পান। কিন্তু তার সামগ্রিক ফুটবল-দর্শন সবসময় সেই স্বীকৃতি পায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্দিষ্ট কৌশল, স্পষ্ট প্যাটার্ন ও স্থির পজিশনভিত্তিক খেলার জন্য অনেক কোচকে ফুটবলের প্রতিভাবান মস্তিষ্ক বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
মরিনহোর পথ আলাদা। তিনি তার খেলোয়াড়দের গুণগত মানের ওপর ভরসা করেন এবং যে ক্লাবেই থাকুন না কেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলে নেন। এই নমনীয় ধরন বাইরে থেকে বিশ্লেষণ করা কঠিন, ফলে অনেক সময় তার কাজকে ভুল বোঝা হয়।
মরিনহো অনুসরণ করেন ‘ট্যাকটিক্যাল পিরিওডাইজেশন’ নামের একটি ফুটবল দর্শন, যার উদ্ভাবক ভিতর ফ্রাদে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পোর্তোতে রবসনের সঙ্গে কাজ করার সময় ফ্রাদেও কোচিং স্টাফে ছিলেন।
মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও সিস্টেম তত্ত্ব থেকে ধারণা নিয়ে গড়ে ওঠা এই দর্শন মনে করে, ফুটবলের টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল, শারীরিক ও মানসিক দিকগুলোকে আলাদাভাবে দেখা যায় না। কারণ ম্যাচ চলাকালীন এগুলো একসঙ্গেই কাজ করে।
এই মৌসুমে রিয়ালের দায়িত্ব নেওয়ার পর জানা যায়, মরিনহো অনুশীলনকে ছোট কিন্তু অনেক বেশি তীব্র করেছেন। প্রতিটি সেশনেই বল ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। এমনকি খেলোয়াড়দের ম্যাচ-ফিটনেসও বল পায়ে রেখেই উন্নত করা হয়েছে।
ফুটবলে সাধারণত দুই ধরনের কোচ দেখা যায়। কেউ ম্যাচের বিশৃঙ্খলা কমানোর চেষ্টা করেন, আবার কেউ তা মেনে নিয়ে নিজেদের মানিয়ে নেন। মরিনহো দ্বিতীয় ধারার প্রতিনিধি।
ক্যারিয়ারের শুরুতেই পোর্তোর হয়ে উয়েফা কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়, চেলসিকে ইংল্যান্ডের শক্তিধর দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা, ইন্টার মিলানকে ট্রেবল এনে দেওয়া এবং রিয়ালের হয়ে লা লিগা জয় তাকে সর্বকালের সেরা কোচদের একজন করে তুলেছে।
তবে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তার কাজের ক্ষেত্র ছিল তুলনামূলক কম প্রত্যাশার ক্লাবগুলো। ২০১৭ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ইএফএল কাপ ও ইউরোপা লিগ জয়ের পর তার একমাত্র শিরোপা ছিল ২০২২ সালে রোমার হয়ে জেতা কনফারেন্স লিগ।
এই সময়ে ফুটবলে সফল ছিলেন মূলত সেই কোচরা, যারা ম্যাচের বিশৃঙ্খলা কমাতে পেরেছেন। তাদের দল বেশি বল দখলে রাখত, নির্দিষ্ট কাঠামোতে খেলত এবং খেলোয়াড়দের ভূমিকা ছিল পরিষ্কার।
কিন্তু সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিং বেড়ে যাওয়ায় ম্যাচগুলো আবারও বেশি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। এতে মরিনহোর দর্শন নতুন করে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রাদের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, বিশৃঙ্খলা ফুটবল থেকে কখনো আলাদা করা যায় না। তাই খেলোয়াড়দের এমনভাবে গড়ে তুলতে হয়, যেন তারা মুহূর্তেই সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে পারে।
সম্ভবত এ কারণেই মরিনহোর দলগুলো কঠিন পরিস্থিতিতে, আন্ডারডগ অবস্থায় বা বড় মঞ্চে বারবার সাফল্য পেয়েছে। তিনি খেলোয়াড়দের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান না। বরং তাদের এমনভাবে প্রস্তুত করেন, যাতে তারা নিজেরাই সমাধান বের করতে পারে।
বার্সেলোনার বিপক্ষে সেটিই দেখা গেছে। বেলিংহ্যাম, এমবাপে ও বার্নার্দো সিলভা নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে উজ্জ্বল ছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে দলীয় পরিকল্পনার অংশও ছিলেন।
এমবাপে শেষ লাইনে আক্রমণ করে সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছেন। বেলিংহ্যাম দ্বৈরথে ছিলেন লড়াকু, আবার ড্রিবলিংয়ে ছিলেন নান্দনিক। আর বার্নার্দো সিলভা বার্সেলোনার প্রেসিংয়ের মধ্যে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন।
মরিনহোর ক্যারিয়ারের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যাবর্তন। বেনফিকায় তার কোচিং ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল, আর ২৫ বছর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আবার সেই ক্লাবেই ফেরেন। চেলসিতে টানা দুটি লিগ জয়ের পর ছয় বছর পর ফিরে এসে আরেকটি শিরোপা জিতেছিলেন। আর এখন, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম অধ্যায় শেষ হওয়ার ১৩ বছর পর আবারও রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্বে।
তাই বদলে যাওয়া ফুটবল বিশ্ব যদি তাকে আরেকটি নতুন সুযোগ এনে দেয়, সেটি হবে তার কৌশলগত দর্শনেরও আরেকটি সফল ‘সিক্যুয়েল’। সূত্র: বাসস

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে মালদ্বীপের সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

‘অনুবাদক’ থেকে কৌশলের সম্রাট: মরিনহোর প্রত্যাবর্তনের গল্প

আপডেট সময় ১০:৪৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বার্সেলোনার সমর্থকেরা বহুদিন ধরেই হোসে মরিনহোকে খোঁটা দিয়ে আসছেন। তাদের সবচেয়ে পরিচিত বিদ্রূপাত্মক ডাকনাম হলো ‘ট্রাডাক্টর’, যার স্প্যানিশ অর্থ অনুবাদক। এর মাধ্যমে তারা রিয়াল মাদ্রিদের এই কোচের শুরুর দিনগুলোর মনে করিয়ে দিতে চান।
ক্যারিয়ারের শুরুতে কিংবদন্তি কোচ স্যার ববি রবসনের দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন মরিনহো। স্পোর্টিং লিসবন থেকে পোর্তো এবং পরে ১৯৯৬ সালে বার্সেলোনায় রবসনের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। চার বছর পর বেনফিকার প্রধান কোচ হন মরিনহো, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার কোচিং জীবনের যাত্রা, যা তাকে দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়সহ ইংল্যান্ড, ইতালি ও স্পেনে অসংখ্য সাফল্য এনে দেয়।
মরিনহো কখনোই কেবল একজন অনুবাদক ছিলেন না। বার্সেলোনায় থাকা সময়েও তার মধ্যে ছিল কঠোর পরিশ্রম, অদম্য সংকল্প, আত্মবিশ্লেষণের ক্ষমতা, বিশৃঙ্খলার মধ্যেও সফল হওয়ার দক্ষতা এবং অসাধারণ কৌশলগত জ্ঞান। তার দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় সাফল্যই এ গুণগুলোর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
গত সপ্তাহান্তে রিয়াল মাদ্রিদ যখন বার্সেলোনাকে ২-১ গোলে হারায়, তখন আবারও দেখা যায় মরিনহোর সেই তীক্ষ্ণ কৌশলগত মস্তিষ্ক। ফুটবল বিশ্ব যখন তার কৌশলের প্রশংসায় মেতেছিল, তখন সেটি ছিল ২৬ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকানোরও উপযুক্ত মুহূর্ত।
এই এল ক্লাসিকোতে রিয়াল খেলেছিল ৪-৪-২ ফর্মেশনে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিষিদ্ধ থাকায় তাকে পাওয়া যায়নি। ডান-ব্যাকে খেলেন ফেদেরিকো ভালভার্দে। মিডফিল্ডে অরেলিয়েঁ চুয়ামেনির সঙ্গী ছিলেন বার্নার্দো সিলভা। দুই উইংয়ে খেলেন আরদা গুলের ও ইয়ান দিয়োমান্দে। আর জুড বেলিংহ্যাম ছিলেন কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে আক্রমণভাগে।
বড় ম্যাচগুলোতে যেমনটি তিনি প্রায়ই করেন, এবারও মরিনহো তার পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের একজনকে বিশেষ দায়িত্ব দেন। বার্সেলোনার মিডফিল্ডার পেদ্রিকে ম্যান-মার্কিংয়ের দায়িত্ব পান বার্নার্দো সিলভা। কাজটি সহজ ছিল না, কিন্তু এর ফলে পেদ্রির প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
বার্সেলোনার তীব্র প্রেসিং এবং বলের দিকে দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতাকে কাজে লাগায় রিয়াল। তারা উইংয়ে প্রতিপক্ষকে টেনে এনে মাঠের বিপরীত পাশে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে। কখনো ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে, কখনো লম্বা পাসে আক্রমণ গড়ে তোলে তারা। বিশেষ করে ডান প্রান্ত থেকে বাম দিকে বল সুইচ করার সময় বার্সেলোনার রক্ষণ ভাঙতে সফল হয় রিয়াল।
ম্যাচ শেষে মরিনহো তার স্বভাবের ব্যতিক্রম ঘটান। সাধারণত প্রকাশ্যে কৌশলগত বিশ্লেষণে তিনি খুব একটা যান না। কিন্তু এবার তিনি ব্যাখ্যা করেন যে তার মিডফিল্ডারদের গভীর দৌড়ই বার্সেলোনার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনকে প্রায়ই মাঠের লড়াইয়েরই ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। সম্ভবত ভবিষ্যতে বার্সেলোনার প্রতিপক্ষরা যেন তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সেই আশাতেই নিজের পরিকল্পনা উন্মোচন করেন।
উঁচু ডিফেন্স লাইনের পেছনের ফাঁকা জায়গায় বারবার দৌড়ে গিয়ে রিয়াল, হান্সি ফ্লিকের আক্রমণাত্মক কৌশলকে ভেঙে দেয়।
বড় ম্যাচে কৌশলী জয় এনে দেওয়ার জন্য মরিনহো প্রশংসা পান। কিন্তু তার সামগ্রিক ফুটবল-দর্শন সবসময় সেই স্বীকৃতি পায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্দিষ্ট কৌশল, স্পষ্ট প্যাটার্ন ও স্থির পজিশনভিত্তিক খেলার জন্য অনেক কোচকে ফুটবলের প্রতিভাবান মস্তিষ্ক বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
মরিনহোর পথ আলাদা। তিনি তার খেলোয়াড়দের গুণগত মানের ওপর ভরসা করেন এবং যে ক্লাবেই থাকুন না কেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলে নেন। এই নমনীয় ধরন বাইরে থেকে বিশ্লেষণ করা কঠিন, ফলে অনেক সময় তার কাজকে ভুল বোঝা হয়।
মরিনহো অনুসরণ করেন ‘ট্যাকটিক্যাল পিরিওডাইজেশন’ নামের একটি ফুটবল দর্শন, যার উদ্ভাবক ভিতর ফ্রাদে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পোর্তোতে রবসনের সঙ্গে কাজ করার সময় ফ্রাদেও কোচিং স্টাফে ছিলেন।
মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও সিস্টেম তত্ত্ব থেকে ধারণা নিয়ে গড়ে ওঠা এই দর্শন মনে করে, ফুটবলের টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল, শারীরিক ও মানসিক দিকগুলোকে আলাদাভাবে দেখা যায় না। কারণ ম্যাচ চলাকালীন এগুলো একসঙ্গেই কাজ করে।
এই মৌসুমে রিয়ালের দায়িত্ব নেওয়ার পর জানা যায়, মরিনহো অনুশীলনকে ছোট কিন্তু অনেক বেশি তীব্র করেছেন। প্রতিটি সেশনেই বল ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। এমনকি খেলোয়াড়দের ম্যাচ-ফিটনেসও বল পায়ে রেখেই উন্নত করা হয়েছে।
ফুটবলে সাধারণত দুই ধরনের কোচ দেখা যায়। কেউ ম্যাচের বিশৃঙ্খলা কমানোর চেষ্টা করেন, আবার কেউ তা মেনে নিয়ে নিজেদের মানিয়ে নেন। মরিনহো দ্বিতীয় ধারার প্রতিনিধি।
ক্যারিয়ারের শুরুতেই পোর্তোর হয়ে উয়েফা কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়, চেলসিকে ইংল্যান্ডের শক্তিধর দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা, ইন্টার মিলানকে ট্রেবল এনে দেওয়া এবং রিয়ালের হয়ে লা লিগা জয় তাকে সর্বকালের সেরা কোচদের একজন করে তুলেছে।
তবে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তার কাজের ক্ষেত্র ছিল তুলনামূলক কম প্রত্যাশার ক্লাবগুলো। ২০১৭ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ইএফএল কাপ ও ইউরোপা লিগ জয়ের পর তার একমাত্র শিরোপা ছিল ২০২২ সালে রোমার হয়ে জেতা কনফারেন্স লিগ।
এই সময়ে ফুটবলে সফল ছিলেন মূলত সেই কোচরা, যারা ম্যাচের বিশৃঙ্খলা কমাতে পেরেছেন। তাদের দল বেশি বল দখলে রাখত, নির্দিষ্ট কাঠামোতে খেলত এবং খেলোয়াড়দের ভূমিকা ছিল পরিষ্কার।
কিন্তু সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিং বেড়ে যাওয়ায় ম্যাচগুলো আবারও বেশি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। এতে মরিনহোর দর্শন নতুন করে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রাদের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, বিশৃঙ্খলা ফুটবল থেকে কখনো আলাদা করা যায় না। তাই খেলোয়াড়দের এমনভাবে গড়ে তুলতে হয়, যেন তারা মুহূর্তেই সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে পারে।
সম্ভবত এ কারণেই মরিনহোর দলগুলো কঠিন পরিস্থিতিতে, আন্ডারডগ অবস্থায় বা বড় মঞ্চে বারবার সাফল্য পেয়েছে। তিনি খেলোয়াড়দের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান না। বরং তাদের এমনভাবে প্রস্তুত করেন, যাতে তারা নিজেরাই সমাধান বের করতে পারে।
বার্সেলোনার বিপক্ষে সেটিই দেখা গেছে। বেলিংহ্যাম, এমবাপে ও বার্নার্দো সিলভা নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে উজ্জ্বল ছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে দলীয় পরিকল্পনার অংশও ছিলেন।
এমবাপে শেষ লাইনে আক্রমণ করে সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছেন। বেলিংহ্যাম দ্বৈরথে ছিলেন লড়াকু, আবার ড্রিবলিংয়ে ছিলেন নান্দনিক। আর বার্নার্দো সিলভা বার্সেলোনার প্রেসিংয়ের মধ্যে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন।
মরিনহোর ক্যারিয়ারের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যাবর্তন। বেনফিকায় তার কোচিং ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল, আর ২৫ বছর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আবার সেই ক্লাবেই ফেরেন। চেলসিতে টানা দুটি লিগ জয়ের পর ছয় বছর পর ফিরে এসে আরেকটি শিরোপা জিতেছিলেন। আর এখন, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম অধ্যায় শেষ হওয়ার ১৩ বছর পর আবারও রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্বে।
তাই বদলে যাওয়া ফুটবল বিশ্ব যদি তাকে আরেকটি নতুন সুযোগ এনে দেয়, সেটি হবে তার কৌশলগত দর্শনেরও আরেকটি সফল ‘সিক্যুয়েল’। সূত্র: বাসস