মানুষের জীবন কখনো শুধুই ইবাদতের জন্য নয়, আবার শুধুই ভোগ-বিলাস কিংবা দুনিয়ার সাফল্যের জন্যও নয়। মানুষের মধ্যে যেমন আত্মা আছে, তেমনি আছে দেহ; যেমন অনুভূতি আছে, তেমনি আছে বুদ্ধি ও বিবেক; যেমন দুনিয়ার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে আখিরাতের জবাবদিহি।
তাই একজন মুসলিমের প্রকৃত পরিচয় হলো—তিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে এমনভাবে পরিচালনা করবেন, যাতে কোনো একটি দিক অন্য দিককে গ্রাস না করে। আত্মা আল্লাহর ইবাদতে পরিতৃপ্ত হবে, বুদ্ধি সত্য ও কল্যাণের চিন্তায় বিকশিত হবে, দেহ কর্মচঞ্চল থাকবে, হৃদয় ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় সজীব থাকবে, দুনিয়ার দায়িত্ব পালন হবে নিষ্ঠার সঙ্গে এবং একই সঙ্গে আখিরাতের মুক্তির প্রস্তুতিও চলবে সমানতালে। এই পরিমিতি, সামঞ্জস্য ও মধ্যপন্থাই ইসলামের ভাষায় ‘ভারসাম্য’বলে।
ইসলাম মানুষের জীবনে এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে।
মানুষ যেন আহার করে, কাজ করে, পরিবার গড়ে, ভালোবাসে, আনন্দ পায়, দুঃখ সহ্য করে, আল্লাহর ইবাদত করে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করে এবং ভুল করলে অনুতপ্ত হয়ে আবার রবের দিকে ফিরে আসে—এটাই ইসলামের শিক্ষা। এ কারণেই ভারসাম্য ইসলামের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর এভাবেই আমি তোমাদের একটি মধ্যপন্থী (উম্মাতান ওয়াসাতা) জাতি করেছি।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৪৩)
এখানে ‘মধ্যপন্থী’ বলতে শুধু মাঝামাঝি অবস্থান বোঝানো হয়নি; বরং এমন এক ন্যায়পরায়ণ, শ্রেষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ উম্মতকে বোঝানো হয়েছে, যারা চিন্তা, বিশ্বাস, ইবাদত, চরিত্র ও সামাজিক আচরণ—সব ক্ষেত্রেই পরিমিতি অবলম্বন করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলামের আগেও এবং ইসলামের সূচনাকালেও মানুষের মধ্যে দুটি চরম প্রবণতা ছিল। একদল ধর্মীয় কঠোরতার নামে নিজেদের ওপর এমন সব বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যা আল্লাহ কখনো নির্ধারণ করেননি। তারা হালাল ও পবিত্র জিনিসও নিজেদের জন্য হারাম করে ফেলেছিল, শরীরকে কষ্ট দেওয়াকেই ইবাদত মনে করত। অপরদিকে আরেক দল প্রবৃত্তির অনুসরণে এতটাই বেপরোয়া হয়ে পড়েছিল যে নৈতিকতা, বিবেক ও আল্লাহভীতি তাদের জীবন থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম এই দুই চরম অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করে একটি সুষম ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়েছে।
ইসলাম শরীরকে দমন করতে বলেনি, আবার লাগামহীন স্বাধীনতারও অনুমতি দেয়নি; বরং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ এবং জীবনকে শৃঙ্খলিত করার শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য (পরিচ্ছন্ন পোশাক) গ্রহণ করো, খাও ও পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
এই একটি আয়াতেই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলাম মানুষের প্রয়োজনকে অস্বীকার করে না; বরং তা পূরণের ক্ষেত্রে সংযম ও পরিমিতির শিক্ষা দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল এই ভারসাম্যের সর্বোত্তম উদাহরণ। একবার তিনজন সাহাবি তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে এলেন। তাঁর আমল সম্পর্কে শুনে তাঁদের মনে হলো, তাঁরা আরও বেশি ইবাদত করবেন। একজন বললেন, তিনি সারারাত নামাজ পড়বেন। দ্বিতীয়জন বললেন, তিনি সারা বছর রোজা রাখবেন এবং কখনো ইফতার করবেন না। তৃতীয়জন বললেন, তিনি কখনো বিয়ে করবেন না। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সবার চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং বেশি তাকওয়া অবলম্বন করি। কিন্তু আমি রোজাও রাখি, আবার রোজা ছাড়িও; আমি নামাজও পড়ি, আবার বিশ্রামও নিই; আর আমি বিবাহও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৩)
ইসলাম একটি বাস্তবধর্মী জীবনব্যবস্থা। এটি জানে মানুষ দুর্বল হয়, ক্লান্ত হয়, ভুল করে, কখনো পাপেও লিপ্ত হয়। তাই কোরআন মানুষকে নির্ভুল হওয়ার নির্দেশ দেয়নি; বরং ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসার শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
এ আয়াত মুসলিমের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। কারণ ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু ভুলের পর তাওবা করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! যদি তোমরা কোনো গুনাহই না করতে, তবে আল্লাহ তোমাদের সরিয়ে এমন এক জাতিকে আনতেন যারা গুনাহ করবে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৪৯)
একইভাবে ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যেও চমৎকার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসলাম দুনিয়াকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করার শিক্ষা দেয় না, আবার দুনিয়ার মোহে আখিরাতকে বিসর্জন দিতেও নিষেধ করে। বরং এমন জীবন গড়তে শেখায়, যেখানে দুনিয়ার কর্মব্যস্ততার মাঝেও হৃদয় সর্বদা আখিরাতমুখী থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘…আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তার মাধ্যমে আখিরাতের আবাস কামনা করো এবং দুনিয়ায় তোমার অংশও ভুলে যেয়ো না…।’(সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
এই আয়াত একজন মুমিনের জীবনদর্শন নির্ধারণ করে দেয়। তিনি জীবিকা অর্জন করবেন, পরিবার ও সমাজের অধিকার আদায় করবেন, মানুষের উপকারে আসবেন; কিন্তু তাঁর অন্তর সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতার দিকে নিবদ্ধ থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের সৌন্দর্যই হলো ভারসাম্য। এখানে কঠোরতা নেই, আবার শিথিলতাও নেই; এখানে দুনিয়ার প্রতি অন্ধ আসক্তি নেই, আবার দুনিয়াবিমুখ সন্ন্যাসও নেই। ইসলাম মানুষকে ফেরেশতা হতে বলেনি; বরং একজন সচেতন, সংযমী, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হতে শিখিয়েছে। একজন ভারসাম্যপূর্ণ মুসলিম জানেন—ইবাদত যেমন তাঁর কর্তব্য, তেমনি পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও মানবতার প্রতিও তাঁর দায়িত্ব রয়েছে। তিনি সুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন, দুঃখে ধৈর্য ধারণ করেন, ভুল করলে তাওবা করেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন।
সংবাদ শিরোনাম
মুমিনের জীবন হবে ভারসাম্যপূর্ণ
-
ইসলাম ডেস্ক - আপডেট সময় ১২:০১:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
- 84
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























