ঢাকা ১১:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহির তাফসির শাস্ত্রে অবদান

ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যাঁদের সাধনা সমকালীন ও পরবর্তী শতাব্দীর জন্য বিষ্ময় হয়ে থাকে। মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহি (১৮৬৩-১৯৩০) এমনই বিরলদের একজন।
উনিশ শতকের শেষার্ধে যখন ঔপনিবেশিক শাসনের চাপে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম জ্ঞানকাঠামো একদিকে ভেঙে পড়ছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার আগ্রাসনে ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই আজমগড়ের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে নেতৃত্বের আসনে উঠে আসেন এই মহা মনীষী, যিনি কোরআন বোঝার গোটা পদ্ধতিকেই নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজান। তাঁর পুরো জীবনের সাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘কোরআন’ ও কোরআনের প্রতিটি শব্দ-বর্ণ, আয়াত ও বিষয়ের অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র, যাকে তিনি নাম দেন ‘নজম’। এই একটি ধারণাকে ঘিরেই তিনি গড়ে তোলেন ভাষাতত্ত্ব, বালাগাত, তাফসির-পদ্ধতি ও কোরআনি জ্ঞানতত্ত্বের এক সুবিন্যস্ত ও বিস্তীর্ণ এক জগৎ।
ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলায় ১৮৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহি।
তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক আল্লামা শিবলি নোমানির নিকটাত্মীয় এবং তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি লখনউ ও পরে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। যেখানে আল্লামা শিবলি নোমানির সান্নিধ্য ও তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক সাহিত্যিক মনোভাব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে একসময় তিনি হায়দ্রাবাদের দারুল উলুমে এবং লাহোরের ইসলামিয়া কলেজেও অধ্যাপনা শুরু করেন।
যেখানে তাঁর পাণ্ডিত্য ও শিক্ষাদান পদ্ধতি ছাত্রমহলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল একটিই ‘কোরআন’ ও কোরআনের প্রতিটি শব্দ-বর্ণ, আয়াত ও বিষয়ের অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র বা নাজমুল কোরআন আবিষ্কার। তাই জীবনের এক পর্যায়ে তিনি আজমগড়ের সরাইমির শহরে চলে আসেন এবং আল্লামা শিবলি নোমানির সঙ্গে যৌথ চিন্তার ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাতুল ইসলাহে আমৃত্যু শিক্ষকতা করেন।
৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এক নিভৃত পল্লী জীবনে বসে আরবি ভাষায় তাঁর মৌলিক গবেষণাকর্ম রচনা করেছেন। তাঁর আরবি ভাষাজ্ঞান এমন উচ্চমানের ছিল যে আরব বিশ্বের প্রখ্যাত সংস্কারক রশিদ রিদা তাঁর রচনার প্রশংসা করেছিলেন বলে জানা যায়, যা একজন অনারব আলেমের জন্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ স্বীকৃতি।
প্রচলিত পাঠ ও মতবাদকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ না করে যুক্তি ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রতিটি বিষয় যাচাই করার যে মানস, যাকে বলা যায় ‘মুজতাহিদানা’ মনন, আল্লামা ফারাহির জীবনে তা ছিল পূর্ণমাত্রায়।
ফারাহির রচনাবলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘আসালিবুল কোরআন’, ‘তাওয়িলুল ফুরকান বি আসালিবিল কোরআন’, ‘ইমআন ফি আকসামিল কোরআন’ এবং ‘দালাইলুন নিজাম’। এই গ্রন্থগুলোতে তিনি নিজের ভাষাতাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত অবস্থান বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী তাঁর বিভিন্ন সুরার তাফসির লিখন সংকলিত করে প্রকাশ করেন ‘মাজমুআ তাফাসিরে ফারাহি’ নামে।
তাঁর সম্পর্কে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. আকরাম নদভি বলেন, ‘ফারাহির চিন্তাদর্শন ও তাঁর রচনাবলি তাঁর জীবদ্দশায় খুব বেশি প্রচারিত ও আলোচিত হয়নি, কারণ তাঁর লেখা ও চিন্তা ছিল এতটাই গভীর যে সাধারণ পাঠক তো দূরের কথা, যেকোনো সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন আলেমের পক্ষেও তা বোঝা সহজ ছিল না; তাঁর ভাষা অনুধাবন করতে হলে গভীর শাস্ত্রীয় মালুমাত থাকা জরুরি।
ফলে তাঁর মৌলিক রচনাবলি ও চিন্তাধারা তৎকালীন সময়ে ততটা প্রসারিত হয়নি। ফারাহির চিন্তা ও দর্শন প্রচার ও প্রসার লাভ করে তাঁর সবচেয়ে স্নেহধন্য ছাত্র মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহির মাধ্যমে। তিনি তাঁর বিখ্যাত ৯ খণ্ডের তাফসির ‘তাদাব্বুরে কোরআন’-এ, যা নজমতত্ত্বকে গোটা কোরআনের ওপর প্রয়োগ করে এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত করেন।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহির তাফসির শাস্ত্রে অবদান

আপডেট সময় ১১:২৭:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যাঁদের সাধনা সমকালীন ও পরবর্তী শতাব্দীর জন্য বিষ্ময় হয়ে থাকে। মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহি (১৮৬৩-১৯৩০) এমনই বিরলদের একজন।
উনিশ শতকের শেষার্ধে যখন ঔপনিবেশিক শাসনের চাপে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম জ্ঞানকাঠামো একদিকে ভেঙে পড়ছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার আগ্রাসনে ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই আজমগড়ের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে নেতৃত্বের আসনে উঠে আসেন এই মহা মনীষী, যিনি কোরআন বোঝার গোটা পদ্ধতিকেই নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজান। তাঁর পুরো জীবনের সাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘কোরআন’ ও কোরআনের প্রতিটি শব্দ-বর্ণ, আয়াত ও বিষয়ের অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র, যাকে তিনি নাম দেন ‘নজম’। এই একটি ধারণাকে ঘিরেই তিনি গড়ে তোলেন ভাষাতত্ত্ব, বালাগাত, তাফসির-পদ্ধতি ও কোরআনি জ্ঞানতত্ত্বের এক সুবিন্যস্ত ও বিস্তীর্ণ এক জগৎ।
ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলায় ১৮৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহি।
তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক আল্লামা শিবলি নোমানির নিকটাত্মীয় এবং তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি লখনউ ও পরে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। যেখানে আল্লামা শিবলি নোমানির সান্নিধ্য ও তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক সাহিত্যিক মনোভাব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে একসময় তিনি হায়দ্রাবাদের দারুল উলুমে এবং লাহোরের ইসলামিয়া কলেজেও অধ্যাপনা শুরু করেন।
যেখানে তাঁর পাণ্ডিত্য ও শিক্ষাদান পদ্ধতি ছাত্রমহলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল একটিই ‘কোরআন’ ও কোরআনের প্রতিটি শব্দ-বর্ণ, আয়াত ও বিষয়ের অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র বা নাজমুল কোরআন আবিষ্কার। তাই জীবনের এক পর্যায়ে তিনি আজমগড়ের সরাইমির শহরে চলে আসেন এবং আল্লামা শিবলি নোমানির সঙ্গে যৌথ চিন্তার ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাতুল ইসলাহে আমৃত্যু শিক্ষকতা করেন।
৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এক নিভৃত পল্লী জীবনে বসে আরবি ভাষায় তাঁর মৌলিক গবেষণাকর্ম রচনা করেছেন। তাঁর আরবি ভাষাজ্ঞান এমন উচ্চমানের ছিল যে আরব বিশ্বের প্রখ্যাত সংস্কারক রশিদ রিদা তাঁর রচনার প্রশংসা করেছিলেন বলে জানা যায়, যা একজন অনারব আলেমের জন্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ স্বীকৃতি।
প্রচলিত পাঠ ও মতবাদকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ না করে যুক্তি ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রতিটি বিষয় যাচাই করার যে মানস, যাকে বলা যায় ‘মুজতাহিদানা’ মনন, আল্লামা ফারাহির জীবনে তা ছিল পূর্ণমাত্রায়।
ফারাহির রচনাবলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘আসালিবুল কোরআন’, ‘তাওয়িলুল ফুরকান বি আসালিবিল কোরআন’, ‘ইমআন ফি আকসামিল কোরআন’ এবং ‘দালাইলুন নিজাম’। এই গ্রন্থগুলোতে তিনি নিজের ভাষাতাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত অবস্থান বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী তাঁর বিভিন্ন সুরার তাফসির লিখন সংকলিত করে প্রকাশ করেন ‘মাজমুআ তাফাসিরে ফারাহি’ নামে।
তাঁর সম্পর্কে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. আকরাম নদভি বলেন, ‘ফারাহির চিন্তাদর্শন ও তাঁর রচনাবলি তাঁর জীবদ্দশায় খুব বেশি প্রচারিত ও আলোচিত হয়নি, কারণ তাঁর লেখা ও চিন্তা ছিল এতটাই গভীর যে সাধারণ পাঠক তো দূরের কথা, যেকোনো সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন আলেমের পক্ষেও তা বোঝা সহজ ছিল না; তাঁর ভাষা অনুধাবন করতে হলে গভীর শাস্ত্রীয় মালুমাত থাকা জরুরি।
ফলে তাঁর মৌলিক রচনাবলি ও চিন্তাধারা তৎকালীন সময়ে ততটা প্রসারিত হয়নি। ফারাহির চিন্তা ও দর্শন প্রচার ও প্রসার লাভ করে তাঁর সবচেয়ে স্নেহধন্য ছাত্র মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহির মাধ্যমে। তিনি তাঁর বিখ্যাত ৯ খণ্ডের তাফসির ‘তাদাব্বুরে কোরআন’-এ, যা নজমতত্ত্বকে গোটা কোরআনের ওপর প্রয়োগ করে এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত করেন।