মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌরুটের ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝনদীতে এলোপাতাড়ি জাহাজ নোঙর করে রাখায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সিমেন্ট কারখানাগুলোর ক্লিংকার ও সিমেন্টবাহী জাহাজ দিনের পর দিন নদীতে নোঙর করে থাকায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে নৌপথ। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। সরেজমিনে গত কয়েক দিন ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, সিমেন্ট কারখানাগুলোর সামনে নদীর মাঝামাঝি এলাকায় সারি সারি ক্লিংকার ও সিমেন্টবাহী জাহাজ নোঙর করে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো জাহাজ দিনের পর দিন একই স্থানে অবস্থান করছে। এতে নৌপথের স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমে গেছে। লঞ্চ, কার্গো ও অন্যান্য নৌযানকে এসব জাহাজ এড়িয়ে চলতে হচ্ছে। নৌযান চালকদের ভাষ্য, এলোমেলোভাবে জাহাজ নোঙর করে রাখার কারণে দিনের বেলায়ও নৌযান চালাতে সমস্যা হয়। রাতে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিপরীত দিক থেকে একাধিক নৌযান এলে সংকীর্ণ চ্যানেলে নিরাপদে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় নৌপথে এলোপাতাড়ি জাহাজ নোঙর বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু জরিমানা নয়, জাহাজ নোঙরের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে মানানো প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নৌপথ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন সময়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নদীতে মনিটরিং করা হচ্ছে। এলোপাতাড়ি নোঙর করা জাহাজের বিরুদ্ধে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানাও করা হয়েছে। তবে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও একইভাবে জাহাজ নোঙর করার অভিযোগ রয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা——- ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা নৌরুটে অতীতেও একাধিক বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুই বছর আগে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০২২ সালের ২১ মার্চ একই রুটে এমভি রূপসীর সঙ্গে অপর একটি লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষে একটি লঞ্চ ডুবে যায়। ওই দুর্ঘটনায় ১১ জন যাত্রী মারা যান। বারবার দুর্ঘটনার পরও নৌপথে জাহাজ নোঙরের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। সচেতন মহলের মতে, নৌপথ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চালকদের অভিযোগ, রাতে ঝুঁকি বাড়ে—-এই নৌরুটে চলাচলকারী কয়েকজন লঞ্চচালক বলেন, দিনের বেলায়ই এলোমেলো জাহাজের কারণে লঞ্চ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। রাতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় সামনে থাকা জাহাজ এড়িয়ে চলতে গিয়ে ঝুঁকি নিতে হয়। প্রশাসনের আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যাত্রীদের অভিযোগ, নদীর মাঝখানে ইচ্ছেমতো জাহাজ নোঙর করে রাখায় রাতে যাতায়াতের সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। নৌপথ নিরাপদ রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁদের। নোঙরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণের উদ্যোগ বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাহাজ নোঙরের জন্য সোনারগাঁয়ের শম্ভুপুরা এলাকায় নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত বছর এ বিষয়ে একটি সার্ভেও করা হয়। সেই সার্ভের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখভাল করবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। মুন্সিগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম জানান, আমি নিজে দেখেছি জাহাজ গুলো মাঝ নদীতে এলোপাতাড়ি নোঙর করা। আমি মালিক কর্তৃপক্ষদের ঢেকে এনে বলে দিয়েছিলাম। তারপরো এমনটা হলে শীঘ্রই আবারো অভিযানে নামবে জেলা প্রশাসন। নৌপুলিশের ডিআইজি মো. আলমগীর হোসেন ভোরের কাগজ কে বলেন, মালিক সমিতির সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আমরা বসেছি। এলোমেলোভাবে যেন জাহাজ রাখা না হয়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপরও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, আবারও তাঁদের চিঠি দেওয়া হবে। নৌপথে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা যথেষ্ট তৎপর। বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ ( ট্রাফিক জোন) ‘র দেওয়া বক্তব্যে বলা হয়েছে, জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট সীমানায় রেখে নোঙর করতে বলা হয়েছে। মাঝ নদীতে নয়। নৌযান চলাচলে বিঘœ ঘটে এমন কিছু করা যাবে না। তারপরো আমরা বিষয়টি দেখছি। প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও নির্দেশনার পরও যদি নদীর মাঝনদীতে এভাবে জাহাজ নোঙর চলতে থাকে, তাহলে নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা ঠেকাতে আগেই নৌপথকে বাধামুক্ত ও নিরাপদ রাখা জরুরি।
সংবাদ শিরোনাম
মাঝ নদীতে এলোপাতাড়ি জাহাজ নৌপথে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
-
হুমায়ুন কবির মুন্সিগঞ্জ - আপডেট সময় ০৩:২৪:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- 49
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























