গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা নাজমুল হককে ঘিরে তাঁর পদ-পদবি, দায়িত্ব পালন, পদায়ন এবং চাকরির বৈধতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বে থাকলেও অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় তাঁর বর্তমান পদটির অবস্থান কীÑতা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নাজমুল হকের মূল পদ ছিল উপজেলা সচিব। গফরগাঁও উপজেলা থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর-সংক্রান্ত প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময় তাঁর পদায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পরে তিনি গাজীপুর পৌরসভায় যোগদানের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় গাজীপুর পৌরসভার সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন আবুল বাশার। পদায়নসংক্রান্ত জটিলতার কারণে নাজমুল হক উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পদে যোগদান না করে ‘সমাজবিজ্ঞানী’ হিসেবে গাজীপুর পৌরসভায় যোগদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত জনবল কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কার্যকর হলে তাঁর পদ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়। অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় পদটির অবস্থান কোথায়? অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে নাজমুল হকের পদটি না থাকায় তাঁকে একপর্যায়ে রাজস্ব বিভাগের ‘উদ্বৃত্ত কর্মচারী’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এরপরও তিনি কী প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছেনÑতা স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, কোনো কর্মকর্তা যদি অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থাকেন, তাহলে তাঁর পদায়ন, দায়িত্ব অর্পণ, বেতন-ভাতা প্রদান এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ভিত্তি কী? এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক আদেশ, নিয়োগপত্র, পদায়ন আদেশ, জনবল কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। বদলি ও পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন আরও অভিযোগ রয়েছে, নাজমুল হককে রাজস্ব বিভাগের একটি পদে বদলির জন্য তৎকালীন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বিভিন্ন মহলে তদবির করেছিলেন। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, নাজমুল হকের বর্তমান দায়িত্বের ক্ষেত্রে কোনো লিখিত পদায়ন আদেশ বা প্রশাসনিক অনুমোদন রয়েছে কি না। থাকলে সেটি কোন কর্তৃপক্ষ জারি করেছে এবং তা অনুমোদিত জনবল কাঠামো ও প্রচলিত বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি নাÑতা প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। মামলার বিষয়ে ভূমিকা রাখার অভিযোগ নাজমুল হকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোনাবাড়ী জোনে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মেয়র কিরণের সময়ে অধ্যাপক এম এ মান্নানকে ঘিরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলা ও উচ্চ আদালতের কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় তিনি নজরুল ইসলাম, তৎকালীন পানি শাখায় কর্মরত আনিসুর রহমানসহ কয়েকজনের সঙ্গে সমন্বয় করে মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এমনকি উচ্চ আদালতে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর এক স্বজন, যিনি উচ্চ আদালতের আইনজীবী বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব বিষয়ে তাঁকে সহযোগিতা করতেন বলেও দাবি রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, আদালতের আদেশ বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই করা যায়নি। ফলে বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। অফিসে হাতাহাতির অভিযোগ, তদন্ত কমিটির দাবি নাজমুল হকের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, কোনাবাড়ী জোনে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সিনিয়র কর কর্মকর্তা হারুন রশিদের সঙ্গে অফিসের ভেতরে তাঁর হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা পেয়েছিল। তবে তদন্ত প্রতিবেদন, কমিটির সুপারিশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা কী ছিলÑএ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ওই ঘটনার পর নাজমুল হককে প্রায় নয় মাসের জন্য পূবাইল জোন-২-এ পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও বহাল অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন এলেও নাজমুল হক এখনো গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। তাঁর প্রভাব ও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগের কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে রয়েছেন বলেও কেউ কেউ দাবি করছেন। তবে এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি। যে নথিগুলো যাচাই করা জরুরি নাজমুল হকের পদ ও চাকরির বৈধতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছেÑ তাঁর মূল নিয়োগপত্র ও যোগদানের নথি; গফরগাঁও উপজেলা থেকে গাজীপুর পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনে পদায়নসংক্রান্ত সরকারি আদেশ; ‘সমাজবিজ্ঞানী’ পদে তাঁর যোগদানের অনুমোদন ও নিয়োগসংক্রান্ত নথি; গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত জনবল কাঠামো; তাঁর বর্তমান পদায়ন ও দায়িত্ব অর্পণের অফিস আদেশ; বেতন-ভাতা ও চাকরির জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণসংক্রান্ত নথি; কোনাবাড়ী ও পূবাইল জোনে তাঁর দায়িত্ব পালনের অফিস আদেশ; হারুন রশিদের সঙ্গে কথিত ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন; সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালতের মামলার নথি ও আদেশ।
এসব নথি প্রকাশ্যে এলে নাজমুল হকের বর্তমান পদ, দায়িত্ব ও চাকরির প্রশাসনিক বৈধতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নাজমুল হকের বক্তব্য এসব অভিযোগের বিষয়ে নাজমুল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরপত্রে প্রতিবেদকের সঙ্গে কোন তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে তাঁর বর্তমান পদ-পদবি, নিয়োগ ও পদায়নের বৈধতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র ও প্রশাসনিক আদেশের ভিত্তিতে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের দাবি সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীর অভিযোগ-প্রতিআভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক নথি ও সরকারি বিধিমালার আলোকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করে থাকলে তার প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি কীÑতা স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অসদাচরণ, মামলাসংক্রান্ত ভূমিকা এবং পদায়ন নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোরও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়োগপত্র থেকে বর্তমান পদায়ন পর্যন্ত পুরো চাকরির নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অভিযোগের সত্যতা যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি প্রকৃতপক্ষে কোনো অনিয়ম না থাকলে নাজমুল হকের বিরুদ্ধেও ওঠা প্রশ্নের অবসান ঘটবে।
সংবাদ শিরোনাম
পদ-পদবি ও চাকরির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
-
বশির আলম (টঙ্গী) গাজীপুর : - আপডেট সময় ০৮:৩৮:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 71
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























