সুস্থ থাকতে চান প্রায় সবাই। কিন্তু, বাস্তবে সুস্থ থাকা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা নয়। একদিকে জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসাব্যবস্থা, অন্যদিকে নানা ধরনের ‘ওয়েলনেস’ পণ্য, ডায়েট ও জীবনযাপন বিষয়ক পরামর্শ—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য নিয়ে অনেকেই আরো বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
চিকিৎসাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা—চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ, তাড়াহুড়োর মধ্যে ডাক্তার দেখানো এবং রোগীর প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগের অভাব—অনেক মানুষকে বিকল্প ‘ওয়েলনেস’ সমাধানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু, এসব সমাধানের অনেকগুলো যে কার্যকর বা প্রয়োজনীয়, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ওয়াশিংটন ডিসিতে ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আসছেন চিকিৎসক ডা. লুসি ম্যাকব্রাইড। তার নতুন বই ‘বিয়ন্ড দ্য প্রেসক্রিপশন’-এ তিনি দেখিয়েছেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে মানুষ চিকিৎসাব্যবস্থার সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারে।
ম্যাকব্রাইডের মতে, এর শুরু হওয়া উচিত একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে—আপনার কাছে সুস্থ থাকার অর্থ কী?
কারো কাছে সুস্থ থাকা মানে দীর্ঘায়ু পাওয়ার জন্য কঠোর অনুশীলন ও নিয়ম মেনে চলা। আবার কারো কাছে এর অর্থ হতে পারে জীবনে ভারসাম্য রাখা এবং মাঝেমধ্যে পছন্দের খাবার উপভোগ করার স্বাধীনতা।
ম্যাকব্রাইড বলেন, “একজন রোগী ও তার প্রাথমিক চিকিৎসকের মধ্যে ভালো সম্পর্ক মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচগুলোর একটি হতে পারে। অথচ বর্তমানে সেই সম্পর্কটিই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিষয়টাকে আমরা কি অতিরিক্ত জটিল করে ফেলছি?
মানবদেহের মৌলিক চাহিদা খুব একটা বদলায়নি। শরীরচর্চা, নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ—সুস্থ থাকার জন্য এগুলোই এখনো মূল বিষয়।
কিন্তু, বাস্তবে এই সহজ বিষয়গুলো মেনে চলাই অনেকের জন্য কঠিন। কারো ব্যায়াম শুরু করা দরকার, কারো খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন যোগ করা, আবার কারো অ্যালকোহল ছেড়ে দেওয়া জরুরি হতে পারে।
মানুষ অনেক সময় নির্দিষ্ট নিয়মের জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেমন—ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা নির্দিষ্ট সময় মেনে খাওয়া। কিন্তু, এসব নিয়ম বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে দীর্ঘদিন মেনে চলা সম্ভব হয় না। ফলে, একসময় ব্যর্থতার অনুভূতি তৈরি হয়। বরং যে জীবনযাপন বাস্তবে সম্ভব, সেটাকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একজন মানুষের জীবনযাপনের সীমাবদ্ধতা বুঝে তার সঙ্গে মানানসই, টেকসই এবং প্রয়োজনমতো সহায়তাপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করাই বেশি কার্যকর।
সবার কাছে সুস্থতার সংজ্ঞা কি এক?
ম্যাকব্রাইডের মতে, “নিজের কাছে ‘সুস্থ’ থাকার অর্থ কী, সেটা নির্ধারণ করা। কারণ আপনি নিজে তা নির্ধারণ না করলে অন্য কেউ আপনার হয়ে সেটি ঠিক করে দেবে।”
চিকিৎসা ব্যবস্থা হয়তো স্বাস্থ্যকে রক্ত পরীক্ষার ফলাফল বা কোনো রোগে আক্রান্ত না হওয়ার মাধ্যমে দেখবে। অন্যদিকে, ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি বলতে পারে নির্দিষ্ট ডায়েট, জীবনযাপনের নিয়ম, শরীরের গঠন বা নির্দিষ্ট ওজন অর্জন করাই সুস্থতার লক্ষণ। কিন্তু, আসলে আপনাকেই ঠিক করতে হবে, আপনি কী চান এবং কেন চান।
এক বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান? কেমন অনুভব করতে চান? ওজন কমানো আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? নাকি কিছুটা বেশি ওজন নিয়েও ভালো থাকতে চান? আবার কেউ হয়তো ওজন কমানোর জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠে জিমে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দেবেন, এমনকি এতে ঘুমের সময়ও কিছুটা কমে যায়।
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষের মূল্যবোধ ও লক্ষ্য আলাদা হতে পারে। সমস্যা হলো, নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য অনেকের কাছেই থাকে না।
চিকিৎসকের কাছ থেকে বেশি সুবিধা পেতে কী করবেন?
প্রথমেই নিজের দিকে একটু সময় নিয়ে তাকাতে হবে। এমন কিছু প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে, যেগুলো হয়তো ব্যস্ততার কারণে চিকিৎসক আপনাকে করার সুযোগ পান না। যেমন—আপনার ঘুমের সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক আছে কি না, খাদ্যাভ্যাস রক্তে শর্করার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের কোনো চাপ চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আপনার আচরণকে প্রভাবিত করছে কি না।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে নিজের ওষুধের তালিকা, আগের রোগের ইতিহাস, অ্যালার্জি এবং পারিবারিক রোগের ইতিহাস লিখে রাখা ভালো। তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করে প্রতিবার চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।
ডাক্তারের সামনে নিজেকে ‘ভালো রোগী’ হিসেবে প্রমাণ করার দরকার নেই। বরং আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরি। আপনি যদি সব বিষয়ে বেশি তথ্য জানতে চান, নিজের ওজন নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন কিংবা রাতে ঘুমানোর বদলে ইন্টারনেটে নিজের উপসর্গ খুঁজতে থাকেন—সেটিও চিকিৎসককে জানানো উচিত। নিজের এই অভ্যাস ও মানসিক অবস্থাগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ককে আরো কার্যকর করতে পারে।
কেন অনেকে স্বাস্থ্য নিয়ে এআইয়ের ওপর নির্ভর করছেন?
অনেক মানুষকে এক চিকিৎসক থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। কিন্তু, কেউ হয়তো তাদের কাজের চাপ, খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ডায়াবেটিসের যোগসূত্রটি বুঝিয়ে বলেন না। আবার হাঁটুর ব্যথা, ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার এবং উচ্চ রক্তচাপের মধ্যেও সম্পর্ক থাকতে পারে।
স্বাস্থ্য, জীবনযাপন ও দৈনন্দিন অভ্যাসের এসব বিষয়কে একসঙ্গে দেখার সুযোগ না পাওয়ায় অনেক রোগী সমস্যায় পড়ছেন। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ২৯ শতাংশ মানুষ এখন নিয়মিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শের জন্য চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ওপর নির্ভর করছেন।
ম্যাকব্রাইড তাদের দোষ দিচ্ছেন না। কারণ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভুল হলেও এসব এআই অনেক সময় মানুষের সঙ্গে বেশি সহানুভূতিশীলভাবে কথা বলে। এটি দ্রুত উত্তর দেয় এবং উত্তরগুলোও বেশ সম্পূর্ণ মনে হয়। কিন্তু এখানেই ঝুঁকি।
এআই মূলত উত্তর তৈরি করতে পারে; প্রয়োজনীয় প্রশ্নটি খুঁজে বের করা তার কাজ নয়। ফলে একজন মানুষ হয়তো আরো অনেক তথ্য পাচ্ছেন, কিন্তু সেই তথ্য তাকে ভুল পথেও নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে রোগী নিজেই যখন জানেন না, আসলে তার কোন প্রশ্নটির উত্তর প্রয়োজন।
ম্যাকব্রাইডের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো সেই আসল প্রশ্নটি খুঁজে বের করা। একজন প্রাথমিক চিকিৎসক যদি রোগীকে ভালোভাবে জানেন, তাহলে তিনি রোগীর ব্যক্তিত্ব, শারীরিক সমস্যা এবং জীবনযাপনের মধ্যে সম্পর্কগুলো বুঝতে সাহায্য করতে পারেন। এতে চিকিৎসার ফল ভালো হতে পারে, মানুষ দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারেন এবং চিকিৎসার খরচও কমতে পারে।
শুধু পরীক্ষার রিপোর্টই কি বলে দেয় আপনি কতটা সুস্থ?
স্বাস্থ্যকে শুধু রক্ত পরীক্ষার ফল, সিটি স্ক্যান কিংবা পুরো শরীরের এমআরআই দিয়ে মাপা যায়—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু, বাস্তবে স্বাস্থ্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোনো পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেই একজন মানুষ পুরোপুরি সুস্থ—এমনটা বলা যায় না।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, প্রেক্ষাপট ছাড়া সেই তথ্য শুধু কাগজে লেখা কিছু সংখ্যা। ধরা যাক, কারো কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০২, যেখানে আদর্শ মাত্রা ১০০-এর নিচে। রিপোর্টে সেটা বেশি হিসেবে দেখাতে পারে। কিন্তু ওই ব্যক্তির বয়স, হৃদরোগের ঝুঁকি, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা না করে শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি কি আমাদের আরো চাপ দিচ্ছে?
ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রির কিছু পরামর্শ নিঃসন্দেহে উপকারী। পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও পুষ্টিকর খাবার—এসব সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, এগুলোই যে সুস্থ থাকার সম্পূর্ণ সমাধান, এমন ধারণা সমস্যার তৈরি করতে পারে।
অনেক সময় এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়—রক্তে শর্করা ঠিক রাখুন, ধ্যান করুন, নির্দিষ্ট খাবার খান, শরীরচর্চা করুন; তাহলেই আপনি পুরোপুরি সুস্থ থাকবেন। বাস্তবতা এত সরল নয়। একজন মানুষ নিয়মিত ধ্যান করতে পারেন, রক্তে শর্করাও স্বাভাবিক থাকতে পারে, তারপরও তার বিষণ্নতা, ডায়াবেটিস কিংবা ক্যানসার থাকতে পারে।
ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি অনেক সময় এমন ধারণাও দেয় যে, নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু, স্বাস্থ্যের ওপর জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ভাগ্য এবং এমন অনেক বিষয় প্রভাব ফেলে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই।
অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টও ক্ষতি করতে পারে
সব ধরনের সাপ্লিমেন্ট যে ক্ষতিকর, তা নয়। তবে, কোনো একটি ট্যাবলেট বা সাপ্লিমেন্টই আপনার সব সমস্যার সমাধান করে দেবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
ম্যাকব্রাইড এমন রোগী দেখেছেন, যারা বিষণ্নতা কমানোর আশায় সেন্ট জনস ওয়ার্টের মতো সাপ্লিমেন্ট নিয়েছেন, অথচ তাদের প্রয়োজন ছিল মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও প্রচলিত চিকিৎসা। কিছু সাপ্লিমেন্ট শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি এমন রোগীর কথাও বলেছেন, যাদের গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্টযুক্ত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের পর লিভারের গুরুতর সমস্যা হয়েছে।
আবার ভিটামিন ডি উপকারী শুনে কেউ কেউ ভাবতে পারেন, একটি ভালো হলে পাঁচটি নিলে আরো ভালো হবে। কিন্তু, অতিরিক্ত মাত্রায় সেটাই শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
তাহলে সুস্থ থাকার উপায় কী?
সবকিছু একসঙ্গে ‘অপ্টিমাইজ’ করার চেষ্টা বাদ দিতে হবে। বরং নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা বা প্রয়োজনটি আগে চিহ্নিত করতে হবে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আনা কি আপনার প্রধান লক্ষ্য? ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ? রক্তচাপ কমানো? নাকি জীবনে একটু বেশি শান্তি পাওয়া?
সবকিছু একসঙ্গে ঠিক করার চেষ্টা না করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্য লক্ষ্য বেছে নেওয়া ভালো। সেটি চিকিৎসক পরামর্শ দিতে পারেন, আবার আপনার নিজের পছন্দও হতে পারে। এরপর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবে করা সম্ভব এবং দীর্ঘদিন ধরে মেনে চলা যায়—এমন পরিবর্তন আনতে হবে।
সব সময় নিজেকে আরো ভালো, আরো নিখুঁত করার চাপে থাকার দরকার নেই। মানুষ হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়াও সুস্থ থাকার অংশ।
ম্যাকব্রাইডের ভাষায়, সব সময় নিজের প্রতিটি দিককে নিখুঁত করার চেষ্টা করার ধারণা আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। কারণ প্রতিদিন কত গ্রাম প্রোটিন খেলাম, কতক্ষণ ব্যায়াম করলাম বা সবকিছু কতটা ‘পারফেক্ট’ হলো—এগুলো নিয়েই পুরো জীবন সাজানো বাস্তবসম্মত নয়।
সুস্থ থাকা মানে সবকিছু নিখুঁত করা নয়; বরং নিজের প্রয়োজন বোঝা, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করা এবং সেটি ধরে রাখার মতো জীবনযাপন তৈরি করা।
*দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে
সংবাদ শিরোনাম
কী বলছে গবেষণা: সুস্থ থাকার চাপে আমরা কি আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছি?
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৮:৫৮:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 57
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























