ঢাকা ১০:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo বোয়ালমারীতে চায়না দুয়ারির মরণফাঁদে দেশীয় মাছ, নীরব প্রশাসন Logo পাঁচবিবি সোনালী ব্যাংকের সিআরএম বুথের উদ্বোধন Logo বগুড়ায় গরিব মেধাবী শিক্ষার্থী ও হতদরিদ্রদের মাঝে বাইসাইকেল, হুইলচেয়ার ও সেলাই মেশিন বিতরণ Logo প্রেমের বিবাহের পর ২কন্যার জননী স্বামীর নির্যাতনে হাসপাতাল বেডে কাতরাচ্ছেন Logo উলিপুরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান Logo দিনাজপুরে শিক্ষার্থীদের সাইবার ও ট্রাফিক নিরাপত্তায় পুলিশ সুপারের লিফলেট বিতরণ Logo কালিয়া দুর্গাপূজা উপলক্ষে আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক আলোচনা সভা Logo সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগে এনসিপি নেতা তামিম আহমেদ বহিষ্কার Logo মধুপুরে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে কৃষকের কলা ও আনারস বাগানের বেহাল অবস্থা Logo প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাচ্ছেন হাবিপ্রবির ১৬ শিক্ষার্থী

বোয়ালমারীতে চায়না দুয়ারির মরণফাঁদে দেশীয় মাছ, নীরব প্রশাসন

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে পরিবেশ বিধ্বংসী ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের এই জালে রেণু-পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা-মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার, অন্যদিকে চরম হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। দিনের পর দিন চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়লেও এর বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কার্যকর তৎপরতা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার প্রায় প্রতিটি প্রাকৃতিক জলাধারেই ছড়িয়ে পড়েছে এই জালের ব্যবহার। চন্দনা-বারাশিয়া, কুমার ও মধুমতী নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে সারিবদ্ধভাবে এসব জাল বসানো হচ্ছে। নদীর তলদেশে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখা জালে স্রোতের উজান ও ভাটি উভয় দিক থেকে আসা মাছ আটকা পড়ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিল, গুনবহা ইউনিয়নের পুটিমারি বিল, ময়না ইউনিয়নের আষাঢ বিল, রূপাপাত ইউনিয়নের প্লাবনভূমি ও জলমহাল, বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলের খাল-বিল এবং রূপাপাত ও শেখর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী সংযোগ খালগুলোতেও এই মরণফাঁদ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, চায়না দুয়ারি এক ধরনের অতিসূক্ষ্ম ফাঁসযুক্ত রিং-ভিত্তিক টানেল ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ম্যাজিক জাল’, ‘রিং জাল’ বা ‘ঢলুক জাল’ নামেও পরিচিত। আকারভেদে এসব জালের দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ১০০ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ১ থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর লোহার ফ্রেম থাকায় পানির নিচে জালটি দীর্ঘ সময় স্থির ও বিস্তৃত অবস্থায় থাকে। ফলে মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও এতে আটকা পড়ে। চায়না দুয়ারির অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে কই, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদা, বোয়াল, আইড়, শোল, টাকি, বাইম, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ দেশীয় মাছের রেণু-পোনা পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। একই সঙ্গে ব্যাঙ, কুঁচিয়া, জলজ সাপ, শামুক, কাঁকড়া ও বিভিন্ন জলজ কীট-পতঙ্গও আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এতে জলাশয়ের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জলাশয়ে চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়লেও বাজার পর্যায়ে এর বিক্রি বন্ধে কার্যকর নজরদারি নেই। বোয়ালমারী পৌরসভা ও আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই এসব জাল বিক্রি ও গুদামজাত করা হচ্ছে। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও মনিটরিং না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন চায়না দুয়ারি জাল নদী-খাল-বিলে নামছে। পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের রামায়ণ রাজবংশী জানান, একসময় আশপাশের নদী-নালা, খাল-বিলে সাধারণ খেপলা বা টানা জাল ফেললেই পরিবারের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রির মতো প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত।
কিন্তু গত কয়েক বছরে চায়না দুয়ারির যথেচ্ছ ব্যবহারের পর থেকে বিল ও নদীতে প্রাকৃতিক মাছের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এখন পেশাদার জেলেরা সাধারণ জাল নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করেও এক কেজি দেশীয় ছোট মাছ সংগ্রহ করতে পারছেন না। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার রোধে অ্যাড. কোরবান আলীর ভাষ্য, শুধু জলাশয়ে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এসব জালের বিক্রয়কেন্দ্র ও সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস জানান, গত মাসের ৩০ তারিখ আমরা একটি অভিযান পরিচালনা করেছি। আমাদের লোকবল কম, তারপরও মা ইলিশ রক্ষায় চলমান অভিযানের পাশাপাশি চায়না দুয়ারি উদ্ধারে বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে আমাদের বিশেষ অভিযান চালানো হবে। এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম রকিবুল হাসান ভাষ্য, মৎস্য বিভাগ ইতোমধ্যেই একটি অভিযান চালিয়ে কিছু জাল জব্দ করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব দ্রুতই বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই নিষিদ্ধ জাল ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে কেউ যুক্ত থাকলে আমাদের অবহিত করুন, আমরা তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

বোয়ালমারীতে চায়না দুয়ারির মরণফাঁদে দেশীয় মাছ, নীরব প্রশাসন

বোয়ালমারীতে চায়না দুয়ারির মরণফাঁদে দেশীয় মাছ, নীরব প্রশাসন

আপডেট সময় ০৮:৪৮:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে পরিবেশ বিধ্বংসী ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের এই জালে রেণু-পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা-মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার, অন্যদিকে চরম হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। দিনের পর দিন চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়লেও এর বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কার্যকর তৎপরতা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার প্রায় প্রতিটি প্রাকৃতিক জলাধারেই ছড়িয়ে পড়েছে এই জালের ব্যবহার। চন্দনা-বারাশিয়া, কুমার ও মধুমতী নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে সারিবদ্ধভাবে এসব জাল বসানো হচ্ছে। নদীর তলদেশে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখা জালে স্রোতের উজান ও ভাটি উভয় দিক থেকে আসা মাছ আটকা পড়ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিল, গুনবহা ইউনিয়নের পুটিমারি বিল, ময়না ইউনিয়নের আষাঢ বিল, রূপাপাত ইউনিয়নের প্লাবনভূমি ও জলমহাল, বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলের খাল-বিল এবং রূপাপাত ও শেখর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী সংযোগ খালগুলোতেও এই মরণফাঁদ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, চায়না দুয়ারি এক ধরনের অতিসূক্ষ্ম ফাঁসযুক্ত রিং-ভিত্তিক টানেল ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ম্যাজিক জাল’, ‘রিং জাল’ বা ‘ঢলুক জাল’ নামেও পরিচিত। আকারভেদে এসব জালের দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ১০০ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ১ থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর লোহার ফ্রেম থাকায় পানির নিচে জালটি দীর্ঘ সময় স্থির ও বিস্তৃত অবস্থায় থাকে। ফলে মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও এতে আটকা পড়ে। চায়না দুয়ারির অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে কই, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদা, বোয়াল, আইড়, শোল, টাকি, বাইম, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ দেশীয় মাছের রেণু-পোনা পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। একই সঙ্গে ব্যাঙ, কুঁচিয়া, জলজ সাপ, শামুক, কাঁকড়া ও বিভিন্ন জলজ কীট-পতঙ্গও আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এতে জলাশয়ের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জলাশয়ে চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়লেও বাজার পর্যায়ে এর বিক্রি বন্ধে কার্যকর নজরদারি নেই। বোয়ালমারী পৌরসভা ও আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই এসব জাল বিক্রি ও গুদামজাত করা হচ্ছে। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও মনিটরিং না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন চায়না দুয়ারি জাল নদী-খাল-বিলে নামছে। পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের রামায়ণ রাজবংশী জানান, একসময় আশপাশের নদী-নালা, খাল-বিলে সাধারণ খেপলা বা টানা জাল ফেললেই পরিবারের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রির মতো প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত।
কিন্তু গত কয়েক বছরে চায়না দুয়ারির যথেচ্ছ ব্যবহারের পর থেকে বিল ও নদীতে প্রাকৃতিক মাছের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এখন পেশাদার জেলেরা সাধারণ জাল নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করেও এক কেজি দেশীয় ছোট মাছ সংগ্রহ করতে পারছেন না। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার রোধে অ্যাড. কোরবান আলীর ভাষ্য, শুধু জলাশয়ে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এসব জালের বিক্রয়কেন্দ্র ও সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস জানান, গত মাসের ৩০ তারিখ আমরা একটি অভিযান পরিচালনা করেছি। আমাদের লোকবল কম, তারপরও মা ইলিশ রক্ষায় চলমান অভিযানের পাশাপাশি চায়না দুয়ারি উদ্ধারে বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে আমাদের বিশেষ অভিযান চালানো হবে। এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম রকিবুল হাসান ভাষ্য, মৎস্য বিভাগ ইতোমধ্যেই একটি অভিযান চালিয়ে কিছু জাল জব্দ করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব দ্রুতই বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই নিষিদ্ধ জাল ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে কেউ যুক্ত থাকলে আমাদের অবহিত করুন, আমরা তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।