পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় জরুরি ওষুধ কিংবা প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো দুরূহ। বিপদে আটকে পড়া মানুষ খুঁজে পাওয়াও কঠিন। আছে সীমান্তে নজরদারি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। কোনো কোনো স্থানে হেঁটে যেতেই লাগে কয়েক দিন।এমন সব সমস্যার সমাধান দেবে একটি ড্রোন। আর কার্যকর এ ড্রোনটি তৈরির পেছনে রয়েছে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরের স্বপ্ন। তার নাম শেখ তাহসিন নূর। রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের এই শিক্ষার্থী তৈরি করেছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনাযোগ্য ড্রোন। এটি তৈরি করে মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রৌপ্যপদকও জিতেছে তার দল।
তাহসিনের বাবা মোহাম্মদ কামাল হোসেন শেখ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) কর্মরত। বাবার চাকরির সুবাদে পাহাড়ি এলাকায় কেটেছে বেশ কয়েক বছর। দুর্গম অঞ্চলে মানুষের চলাচল, সীমান্তরক্ষীদের চ্যালেঞ্জ ও জরুরি রসদ পৌঁছানোর সমস্যা কাছ থেকে দেখেছে তাহসিন।এসব বিরূপ অভিজ্ঞতা সমাধান খুঁজতে পথ দেখিয়েছে স্কুলপড়ুয়া এ কিশোরকে। সেই ভাবনা থেকেই ড্রোন তৈরি।তাহসিনের তৈরি ড্রোনটির বেশ কিছু বিশেষত্ব আছে। এটি আগে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া ম্যাপ অনুসরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়তে পারে। এতে রয়েছে নির্দিষ্ট স্থানে মালামাল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা, রাতের অন্ধকারে কাজ করার জন্য নাইট ভিশন ও থার্মাল ক্যামেরা। ড্রোনটি সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি ওজনের সামগ্রী বহন করতে পারে।৩২ দেশের প্রতিযোগিতায় রৌপ্যপদকমালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে অংশ নেয় তাহসিন ও তার দল। তাহসিন জানায়, প্রতিযোগিতায় ৩২টি দেশের অংশগ্রহণ ছিল। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয় ১৬টি দল। সেখানে বিভিন্ন দেশের বিচারকদের মূল্যায়নে তাদের দল দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রৌপ্যপদক জেতে।আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা এবং উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা তার কাছে বিশেষ আনন্দের।প্রতিযোগিতায় জয়ের পর শিক্ষক ও সহপাঠীর সঙ্গে তাহসিনতাহসিন বলে, আমরা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে সেখানে গিয়েছিলাম। ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীরা ছিল। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমরা যে দ্বিতীয় হতে পেরেছি, সেটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিল।পাঁচ কেজি পণ্য পৌঁছে দেবে দুর্গম এলাকায়ড্রোনটির অন্যতম লক্ষ্য দুর্যোগের সময় মানুষের কাজে আসা। বিশেষ করে পাহাড়ে এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন, যেখানে হেঁটে পৌঁছাতেও কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। এসব এলাকায় জরুরি ওষুধ, খাবার কিংবা অল্প পরিমাণ পণ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ড্রোনটি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছে তাহসিন ও তার দল।বাবার চাকরির সুবাদে পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় আড়াই বছর থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। সেখানে দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের কষ্ট এবং বিভিন্ন সীমান্তচৌকি ও ক্যাম্পে রসদ পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ কাছ থেকে দেখেছে সে।
পাহাড়ে এমন দুর্গম এলাকা রয়েছে, যেখানে যেতে সাত দিন পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়। সেখানে জরুরি কোনো ওষুধ বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাতে হলে অনেক সময় লাগে। আমার এই ড্রোন ব্যবহার করা গেলে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে,’ নিজের আবিষ্কার নিয়ে বেশ দৃঢ়ভাবে জানাচ্ছিল তাহসিন।থার্মাল ক্যামেরায় মিলবে মানুষের অবস্থানড্রোনটিতে থার্মাল ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাপ শনাক্ত করে অন্ধকারেও মানুষের উপস্থিতি খুঁজে বের করা সম্ভব হতে পারে। বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে কেউ আটকা পড়লে কিংবা রাতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হলে এই প্রযুক্তি কাজে আসতে পারে।এ বিষয়ে তাহসিন বলে, ড্রোনটি শুধু রিমোট দিয়ে পরিচালনার ওপর নির্ভরশীল নয়। ল্যাপটপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার ম্যাপিং করে দিলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত পথে চলতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে মালামাল নামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।ড্রোনটির ঘোষিত রেঞ্জ ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার বলে জানায় তাহসিন।তৈরি করতে খরচ দুই লাখ টাকার বেশিড্রোনটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে পিক্সহক ২.৪.৮ ফ্লাইট কন্ট্রোলার ও কার্বন ফ্রেমসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। থার্মাল ক্যামেরা, নাইট ভিশন এবং স্বয়ংক্রিয় উড্ডয়ন ব্যবস্থা যুক্ত করায় এর নির্মাণব্যয় হয়েছে দুই লাখ টাকার বেশি। তাহসিনের মতে, দেশে ড্রোন তৈরির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ফ্লাইট কন্ট্রোলার, থার্মাল ক্যামেরা ও অন্য বিশেষায়িত সরঞ্জামের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে চীন থেকে অর্ডার করে আনতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ।‘এই যন্ত্রাংশগুলো যদি দেশে সহজে পাওয়া যেত, তাহলে আমাদের মতো তরুণদের কাজ করা অনেক সহজ হতো। পাশাপাশি যন্ত্রাংশের দাম কমলে ড্রোন তৈরির খরচও কমানো সম্ভব হতো,’ জানায় তাহসিন।পরিবার ও শিক্ষকদের সহযোগিতাড্রোন তৈরির কাজে তাহসিনকে সহযোগিতা করেছে তার পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার বাবা-মা তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। পাশাপাশি কলেজের বিজ্ঞান শিক্ষক রাজেশ স্যার এবং বিজ্ঞান ক্লাবের মডারেটর মুখলেস স্যার পড়াশোনা ও প্রকল্পের কাজে সহযোগিতা করেছেন বলে জানায় সে।প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান, প্রোগ্রামিং ও ড্রোনের বিভিন্ন অংশের ক্যালিব্রেশনের ক্ষেত্রেও সহায়তা পেয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগের দিন ড্রোনে সমস্যা দেখা দিলে আলী স্যার সেটি ঠিক করতে সহযোগিতা করেন বলে জানায় তাহসিন।ড্রোনের মোটর, প্রপেলার ও উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ঠিকভাবে সমন্বয় করা ছিল প্রকল্পটির অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তাহসিন ও তার দলের জন্য বড় অভিজ্ঞতা।পাঁচ বছরে বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন শুধু একটি ড্রোন তৈরি করেই থেমে থাকতে চায় না তাহসিন। ভবিষ্যতে দেশে ড্রোন প্রযুক্তির বিকাশ ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির স্বপ্ন দেখে সে। এ লক্ষ্যে ‘নূর অ্যারোনেক্স বিডি’ নামে একটি উদ্যোগের ট্রেড লাইসেন্সও নেওয়া হয়েছে। তাহসিনের পরিকল্পনা, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে উদ্যোগটিকে একটি প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি কোম্পানিতে রূপ দেওয়া। একপর্যায়ে দেশীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বিদেশেও ছড়িয়ে দিতে চায় সে।তাহসিন বলে, আমরা চাই, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে নূর অ্যারোনেক্স বিডিকে একটি বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে গড়ে তুলতে। চীন ও তুরস্ক ড্রোন প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। আমরাও চাই, বাংলাদেশ ড্রোন প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাক এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দেশে সহজলভ্য হোক।তাহসিন বিশ্বাস করে, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও গবেষণার সুযোগ পেলে তরুণ উদ্ভাবকরা দেশের প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে পারবেন। অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর কাছে ড্রোন তাই কেবল একটি প্রযুক্তিপণ্য নয়, বরং দুর্গম মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বাংলাদেশে নতুন প্রযুক্তি শিল্প গড়ে তোলার স্বপ্নও।২০১৬ সাল থেকে রোবোলিউশন টেকনোলজিস লিমিটেড উন্নত রোবোটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস এবং এমবেডেড সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে, যা বাংলাদেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাহসিনের ড্রোন তৈরিতে সরাসরি সহযোগিতা করেছে রোবোলিউশন টেকনোলজিস লিমিটেড।প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও সিইও ইঞ্জিনিয়ার আলী বলেন, তাহসিন নূরের মধ্যে আমরা অল্প বয়স থেকেই প্রযুক্তি নিয়ে ভিন্নধর্মী চিন্তা করার সক্ষমতা দেখেছি। ড্রোন তৈরির ক্ষেত্রে তার প্রোগ্রামিং ও ক্যালিব্রেশনে আমরা কারিগরি সহায়তা দিয়েছি।তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য, আমরা গত ১০ বছর ধরে ড্রোন ও রোবটিক্স নিয়ে কাজ করছি। এ পর্যন্ত ২০০’র বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় ড্রোন ও রোবটিক্সবিষয়ক কর্মশালা আয়োজন করছি। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও ছোটবেলা থেকে এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি করাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ড্রোন ও রোবটিক্স খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং তরুণ প্রজন্মকে এই প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা।-উৎস: জাগোনিউজ২৪.কম
সংবাদ শিরোনাম
কিশোর তাহসিনের ড্রোন শুধু স্বপ্ন নয়
-
আইটি - আপডেট সময় ০৮:১৮:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- 6
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























