ঢাকা ০২:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে দেশবাসীর প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের আহবান Logo দেশের পুনর্গঠনে তারেক রহমানের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে যুবদল: রুহুল কবির রিজভী Logo বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনকে ডা. জুবাইদার আহ্বান Logo ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১১ মৃত্যু, ১০ মাসে প্রাণ গেল ৪০০ জনের Logo জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ Logo দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা ও রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo পাকিস্তান এবার অলআউট ১১০ রানে Logo বাজারে আসতে না আসতেই আইফোন ডুওর পর্দায় ফাটল Logo খিটখিটে মেজাজের সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করতে করণীয় Logo ‘সিআইডি’র স্রষ্টা বিপি সিং মারা গেছেনব্রিজেন্দ্র পাল সিং

জীয়নকূপ আর ডুবন্ত নৌকার গল্পে আজও জীবন্ত বেহুলা-লখিন্দর

বাংলা লোকসাহিত্যের অমর প্রেমগাঁথা বেহুলা-লখিন্দর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখে ঘুরে বেড়ানো এই কিংবদন্তি আজও যেন জীবন্ত হয়ে আছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিনসাড়া গ্রামে। রহস্যময় জীয়নকূপ, কথিত ডুবন্ত সোনার নৌকা, প্রাচীন বটগাছ, পুরনো মন্দির আর লোকবিশ্বাসের নানা গল্প মিলিয়ে গ্রামটি পরিণত হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও রহস্যের এক অনন্য মিলনস্থল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, উপজেলার বস্তুল ইউনিয়নের বর্তমান বিনসাড়া গ্রামই ছিল প্রাচীন নিচানীনগর বা নিচানী বাজার। এখানেই জন্ম হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত লোককাহিনীর নায়িকা বেহুলা সুন্দরীর। ধনাঢ্য বণিক বাছোবানিয়ার একমাত্র কন্যা বেহুলার বিয়ে হয়েছিল বগুড়ার চম্পকনগরের বিখ্যাত বণিক চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দরের সঙ্গে। বিয়ের রাতেই সাপের দংশনে লখিন্দরের মৃত্যু হলে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে অসম্ভব এক যাত্রায় বের হন বেহুলা। সেই যাত্রাপথের নানা স্মৃতি ও চিহ্ন আজও বিনসাড়া গ্রামে ছড়িয়ে আছে বলে দাবি স্থানীয়দের। বিনসাড়া গ্রামের খারীর এলাকায় একটি উঁচু মাটির ঢিবি রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ডুবন্ত সোনার নৌকা’ নামে পরিচিত। স্থানীয়দের বিশ্বাস, স্বামীর প্রাণ ফেরাতে যাত্রার সময় বেহুলার সোনার নৌকাটি এখানেই ডুবে গিয়েছিল। আবার অনেকের মতে, এই স্থানেই লখিন্দর নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিলেন। বছরের পর বছর ধরে একই আকৃতিতে টিকে থাকা নৌকা সদৃশ ঢিবিটি আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্র। এলাকাবাসী জানান, একসময় নৌকাসদৃশ স্থানে মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল ঘটত বলে বিশ্বাস করা হতো। ফলে জায়গাটি এখনও বিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হয়। ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে বহুল আলোচিত জীয়নকূপ। বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনো পুরোপুরি শুকিয়ে যায় না। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে বেহুলা এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই থেকে কূপটি পবিত্র ও অলৌকিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউ মানত পূরণের বিশ্বাসে, আবার কেউ ইতিহাসের টানে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন।
জীয়নকূপের প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন বটগাছ। স্থানীয়দের ভাষ্য, বেহুলা ও লখিন্দর নাকি এই গাছের নিচে পরিচয় হয়। পরে সেখানেই বসে তারা গল্প করতেন। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত গাছটির শত শত ঝুরি আজও অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বট গাছের মাঝে একটি শিব মন্দির রয়েছে। গ্রামবাসীর দাবি, প্রায় ৫৬০টি ঝুরি গাছটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এখানে আসেন, তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পর্যটন সুবিধার অভাবে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। স্থানীয়দের মতে, বিনসাড়া একসময় জমিদার ও ধনী বণিকদের সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এখনও মাটি খনন করলে বিভিন্ন পুরোনো স্থাপনা ও প্রাচীন নিদর্শনের চিহ্ন পাওয়া যায়। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরোনো মন্দির ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। তাদের বিশ্বাস, জীয়নকূপের আশপাশেই ছিল বেহুলার বাড়ি। বর্তমানে সেখানে বিনসাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, “বেহুলার কাহিনি আমরা বাব-দাদার কাছ থেকে শুনে আসছি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় কেউ এই ডুবন্ত নৌকার জায়গা থেকে মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল ঘটত। এজন্য মানুষ এখনো জায়গাটিকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে। গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা সুভাষ চন্দ্র বলেন, “জীয়নকূপ ও ডুবন্ত নৌকা ঘিরে বহু অলৌকিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে রহস্যময় জীয়নকূপ। বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনো সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় না। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, “লখিন্দরের প্রাণ ফেরানোর জন্য বেহুলা এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই থেকেই কূপটি মানুষের কাছে পবিত্র ও অলৌকিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কূপের পাশে বসবাসকারী শিল্পী রানী(৭৫) বলেন, “শুনে আসছি, ডুবন্ত নৌকার জায়গায় কোদাল চালালে অমঙ্গল হতো। তাই আশপাশে জমি চাষ হলেও নৌকার জায়গাটা মানুষ এড়িয়ে চলত। বর্তমানে একই অবস্থায় রয়েছে। এই জায়গা নিয়ে মানুষের মনে এখনো ভয় আর শ্রদ্ধা দুটোই আছে। জীয়নকূপে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়। কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউ আবার কৌতূহল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন।” স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন। দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যটন সুবিধা ও গবেষণামূলক কার্যক্রম এখনো সীমিত। তাদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করা হলে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং লোক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংরক্ষিত হবে। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “বেহুলার জীয়নকূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কূপের পাশাপাশি বেহুলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্থাপনাও সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনা সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, যে খালপথ দিয়ে বেহুলার নৌযাত্রার স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, সেই খাল পুনঃখননের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি প্রতœসম্পদগুলো তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতেও পরিকল্পনা রয়েছে। মাটির নিচে সত্যিই কোনো সোনার নৌকা চাপা পড়ে আছে কি না, কিংবা জীয়নকূপের পানিতে অলৌকিক কোনো ক্ষমতা রয়েছে কি না তার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি।
তবে শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে বেঁচে থাকা এই কাহিনি, বিশ্বাস ও আবেগ বিনসাড়াকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। সিরাজগঞ্জের এই জনপদ তাই শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বাংলা লোকঐতিহ্য, প্রেম, বিশ্বাস ও রহস্যের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে আজও বেহুলা-লখিন্দরের কিংবদন্তি মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতিতে সমানভাবে জেগে আছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে দেশবাসীর প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের আহবান

জীয়নকূপ আর ডুবন্ত নৌকার গল্পে আজও জীবন্ত বেহুলা-লখিন্দর

আপডেট সময় ০৩:৫৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

বাংলা লোকসাহিত্যের অমর প্রেমগাঁথা বেহুলা-লখিন্দর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখে ঘুরে বেড়ানো এই কিংবদন্তি আজও যেন জীবন্ত হয়ে আছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিনসাড়া গ্রামে। রহস্যময় জীয়নকূপ, কথিত ডুবন্ত সোনার নৌকা, প্রাচীন বটগাছ, পুরনো মন্দির আর লোকবিশ্বাসের নানা গল্প মিলিয়ে গ্রামটি পরিণত হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও রহস্যের এক অনন্য মিলনস্থল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, উপজেলার বস্তুল ইউনিয়নের বর্তমান বিনসাড়া গ্রামই ছিল প্রাচীন নিচানীনগর বা নিচানী বাজার। এখানেই জন্ম হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত লোককাহিনীর নায়িকা বেহুলা সুন্দরীর। ধনাঢ্য বণিক বাছোবানিয়ার একমাত্র কন্যা বেহুলার বিয়ে হয়েছিল বগুড়ার চম্পকনগরের বিখ্যাত বণিক চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দরের সঙ্গে। বিয়ের রাতেই সাপের দংশনে লখিন্দরের মৃত্যু হলে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে অসম্ভব এক যাত্রায় বের হন বেহুলা। সেই যাত্রাপথের নানা স্মৃতি ও চিহ্ন আজও বিনসাড়া গ্রামে ছড়িয়ে আছে বলে দাবি স্থানীয়দের। বিনসাড়া গ্রামের খারীর এলাকায় একটি উঁচু মাটির ঢিবি রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ডুবন্ত সোনার নৌকা’ নামে পরিচিত। স্থানীয়দের বিশ্বাস, স্বামীর প্রাণ ফেরাতে যাত্রার সময় বেহুলার সোনার নৌকাটি এখানেই ডুবে গিয়েছিল। আবার অনেকের মতে, এই স্থানেই লখিন্দর নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিলেন। বছরের পর বছর ধরে একই আকৃতিতে টিকে থাকা নৌকা সদৃশ ঢিবিটি আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্র। এলাকাবাসী জানান, একসময় নৌকাসদৃশ স্থানে মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল ঘটত বলে বিশ্বাস করা হতো। ফলে জায়গাটি এখনও বিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হয়। ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে বহুল আলোচিত জীয়নকূপ। বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনো পুরোপুরি শুকিয়ে যায় না। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে বেহুলা এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই থেকে কূপটি পবিত্র ও অলৌকিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউ মানত পূরণের বিশ্বাসে, আবার কেউ ইতিহাসের টানে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন।
জীয়নকূপের প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন বটগাছ। স্থানীয়দের ভাষ্য, বেহুলা ও লখিন্দর নাকি এই গাছের নিচে পরিচয় হয়। পরে সেখানেই বসে তারা গল্প করতেন। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত গাছটির শত শত ঝুরি আজও অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বট গাছের মাঝে একটি শিব মন্দির রয়েছে। গ্রামবাসীর দাবি, প্রায় ৫৬০টি ঝুরি গাছটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এখানে আসেন, তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পর্যটন সুবিধার অভাবে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। স্থানীয়দের মতে, বিনসাড়া একসময় জমিদার ও ধনী বণিকদের সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এখনও মাটি খনন করলে বিভিন্ন পুরোনো স্থাপনা ও প্রাচীন নিদর্শনের চিহ্ন পাওয়া যায়। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরোনো মন্দির ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। তাদের বিশ্বাস, জীয়নকূপের আশপাশেই ছিল বেহুলার বাড়ি। বর্তমানে সেখানে বিনসাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, “বেহুলার কাহিনি আমরা বাব-দাদার কাছ থেকে শুনে আসছি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় কেউ এই ডুবন্ত নৌকার জায়গা থেকে মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল ঘটত। এজন্য মানুষ এখনো জায়গাটিকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে। গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা সুভাষ চন্দ্র বলেন, “জীয়নকূপ ও ডুবন্ত নৌকা ঘিরে বহু অলৌকিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে রহস্যময় জীয়নকূপ। বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনো সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় না। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, “লখিন্দরের প্রাণ ফেরানোর জন্য বেহুলা এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই থেকেই কূপটি মানুষের কাছে পবিত্র ও অলৌকিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কূপের পাশে বসবাসকারী শিল্পী রানী(৭৫) বলেন, “শুনে আসছি, ডুবন্ত নৌকার জায়গায় কোদাল চালালে অমঙ্গল হতো। তাই আশপাশে জমি চাষ হলেও নৌকার জায়গাটা মানুষ এড়িয়ে চলত। বর্তমানে একই অবস্থায় রয়েছে। এই জায়গা নিয়ে মানুষের মনে এখনো ভয় আর শ্রদ্ধা দুটোই আছে। জীয়নকূপে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়। কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউ আবার কৌতূহল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন।” স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন। দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যটন সুবিধা ও গবেষণামূলক কার্যক্রম এখনো সীমিত। তাদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করা হলে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং লোক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংরক্ষিত হবে। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “বেহুলার জীয়নকূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কূপের পাশাপাশি বেহুলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্থাপনাও সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনা সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, যে খালপথ দিয়ে বেহুলার নৌযাত্রার স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, সেই খাল পুনঃখননের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি প্রতœসম্পদগুলো তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতেও পরিকল্পনা রয়েছে। মাটির নিচে সত্যিই কোনো সোনার নৌকা চাপা পড়ে আছে কি না, কিংবা জীয়নকূপের পানিতে অলৌকিক কোনো ক্ষমতা রয়েছে কি না তার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি।
তবে শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে বেঁচে থাকা এই কাহিনি, বিশ্বাস ও আবেগ বিনসাড়াকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। সিরাজগঞ্জের এই জনপদ তাই শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বাংলা লোকঐতিহ্য, প্রেম, বিশ্বাস ও রহস্যের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে আজও বেহুলা-লখিন্দরের কিংবদন্তি মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতিতে সমানভাবে জেগে আছে।